১৬ ডিসেম্বর ,১৯৭১: স্বাধীন ভারতের সামরিক ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গৌরবোজ্জ্বল দিন


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তী। স্বাধীন ভারতের সামরিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সব থেকে বড় সাফল্য একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত ও বিভাজিত করে উপমহাদেশে পৃথক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি। সেই সময় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে ইন্দিরা গান্ধীর পরিবর্তে অন্য কেউ থাকলে এত বড় ঝুঁকি কখনওই নিতেন‌ না। লিখলেন উত্তম‌ দেব-

স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্ববৃহৎ সামরিক বিজয়টি এসেছিল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে – ১৯৭১‘এর ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা রেসকোর্সের মাঠে। মূল যুদ্ধটির আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ১৩ দিন।  কিন্তু যুদ্ধের ফল ছিল  শত্রু পক্ষের উপর নিরঙ্কুশ বিজয়। অথচ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ভারত যে কয়টি যুদ্ধে জড়িয়েছে তন্মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক চরিত্রে সবথেকে জটিল ও আন্তর্জাতিক ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে ঘিরে একাত্তরের ভারত-পাক যুদ্ধ। ভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে নিজের ঘরে যুদ্ধ ডেকে আনার আগে সাতপাঁচ ভাবতে লাগে  রাষ্ট্রের বিচক্ষণ কান্ডারীকে । কারণ যুদ্ধের ফল অনুকূলে না গেলে ঘরে-বাইরে ভরাডুবি অনিবার্য। ইতিহাসের ‌একটা পূর্ব নির্ধারিত নিয়তি নিশ্চয়  আছে । সময় এবং ইতিহাস সহায় না হলে এত জটিল পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে রচিত কঠিন যুদ্ধে এত সহজ এবং দ্রুত জয় পেলো কী করে ভারত ? যুদ্ধটা কঠিন ছিল অধিকন্তু যুদ্ধটা দ্রুত শেষ করার তাগিদ‌ ছিল। কারণ যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে পরিস্থিতি ও পরিণতি ঘেঁটে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা ছিল। ইন্দিরা গান্ধী ও জেনারেল স্যাম মানেকশ ভালই জানতেন, ঝটতি আক্রমণে পূর্ব সীমান্তে তথা পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করতে না পারলে আন্তর্জাতিক চাপে ম্যাচ শেষ পর্যন্ত টাই হতে বাধ্য, যেমনটি হয়েছিল পঁয়ষট্টির যুদ্ধে ।

সেনা প্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী : ইন্দিরা যেন বাংলাদেশের ধাত্রী।

পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে রাজনৈতিক বিবাদ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ছিল অবশ্যম্ভাবী। পাকিস্তানের ‌দুই অংশের মধ্যে ভৌগলিক দূরত্ব ছিল ১২০০ মাইলের‌ও বেশি। ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিলে দুই তরফের মধ্যে ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ভাবগত একাত্মতার কো‌ন‌ও সুযোগ ছিল না। অখন্ড ভারত ভেঙে পাকিস্তানের জন্ম ছিল একটি রাজনৈতিক দুর্ঘটনা মাত্র। পাকিস্তানের জন্ম কোনও পিতৃপরিচয়হীন শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত জন্মের সঙ্গে তুলনীয়। এহেন জারজ রাষ্ট্রের পক্ষে ১২০০ মাইল দূরের একটি পৃথক অঞ্চলকে শাসন করা আদপেই সহজ ব্যাপার ছিল না। যদিও পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হ‌ওয়ার বেদনা এখনও ভুলতে পারেন না পাকিস্তানের ঐতিহাসিকেরা। পাকিস্তানের বিভাজনের জন্য ভারতের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেন তাঁরা। এক ভারত ভেঙে পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি । এবং জন্মলগ্ন ‌থেকেই ভারত-পাকিস্তানে শত্রুতা। শত্রুকে দুর্বল করা রাষ্ট্রনীতির সহজাত ধর্ম। পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অসন্তোষ ধূমায়িত হলে কিম্বা স্বায়ত্বশাসনের দাবি উঠলে ভারতের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক মহল যে আগ্রহের সঙ্গে ঘটনাক্রমের দিকে লক্ষ্য রাখত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে ভারত  পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধী নেতাদের ইন্ধন জোগালেও একাত্তরের আগে পর্যন্ত ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের কথা কখনও গুরুত্ব দিয়ে ভাবে নি। সেই সময়  ভারতে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে ইন্দিরা গান্ধী থাকতেন কিম্বা নাই থাকতেন‌ পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্রতর হত‌ই। পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অশান্তি তীব্র হলে ভারতে তার প্রতিক্রিয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু ইন্দিরার জায়গায় অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকলে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়ার সাহস আদৌ দেখাতো কিনা সন্দেহ । ইন্দিরার পিতৃদেব তো নয়‌ই এমনকি তাসখন্দে আকস্মিক প্রয়াত লালবাহাদুর শাস্ত্রীর‌ও এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার ধক ছিল না। শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর নেতৃত্বের প্রশ্নে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় । কংগ্রেস প্রায় আড়াআড়ি বিভাজিত হয়ে পড়ে। কংগ্রেসের গৃহযুদ্ধে সিন্ডিকেটের জয় হলে ৬৯-৭০ নাগাদ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের সবথেকে বড় দাবিদার ছিলেন মোরারজি দেশাই। রক্ষণশীল দেশাই প্রধানমন্ত্রী হলে যুদ্ধ তো দূরের কথা  পূর্ব পাকিস্তানের এক কোটি শরণার্থীকে ভারতে ঢুকতে দিতে রাজি হতেন বলেও মনে হয় না।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পৃথক হতে মুসলমান আত্মপরিচয়ের রাজনীতি ছেড়ে ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদকেই হাতিয়ার করেন শেখ মুজিব।

পাকিস্তানের বিভাজনের বীজ পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই প্রোথিত হয়েছিল। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ১৯৪৮-য়ে মহম্মদ আলি জিন্নাহ বেঁচে থাকতেই। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিমুসলমানের  মননে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিপ্রতীপে একটা ভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের ধারণা নির্মাণে সক্ষম হয়েছিল । পূর্ব পাকিস্তানের যে নেতারা ১৯৪৬-৪৭য়ে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের দাবিতে সরব হয়েছিলেন ৪৮-৪৯‘এই তাঁদের অধিকাংশের মোহভঙ্গ ঘটে ।  পাকিস্তানের মানচিত্রের দিকে মনোযোগ দিতেই তাঁরা বুঝতে পারেন পাকিস্তান কার্যত একটা অলীক রাষ্ট্র এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনতা থেকে মুক্তি লাভের অজস্র সুযোগ আছে তাঁদের সামনে। ততদিনে তাঁদের কাছে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রয়োজন‌ও ফুরিয়ে গেছে। আওয়ামি লিগের তরুণনেতা  শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পারেন, ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ‌ই পারবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব ভূখন্ডকে বিচ্ছিন্ন করতে।

ছেষট্টির ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে ছয় দফা দাবি রাখেন বঙ্গবন্ধু। ছয় দফাকেই পাকিস্তান বিভাজনের সূচনা ধরা হয়।

পাকিস্তান বিভাজনের ইতিহাসে ১৯৬৬ সাল দিক নির্ণায়ক । ছেষট্টির ফেব্রুয়ারিতে লাহোর সম্মেলনে পাকিস্তান সরকারের সামনে ছয় দফা প্রস্তাব রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় দফার মূল কথা আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন । পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা ব্যতীত আর সবকিছুই প্রাদেশিক সরকারের হাতে সোপর্দ করার দাবি তুললেন শেখ মুজিব। এই জন্য ছয় দফাকেই বলা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত । মুজিবের ছয় দফার কথায় জেনারেল আয়ুব খানের মাথায় বাজ পড়ে। ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিব ছয় দফা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ‌জুড়ে আন্দোলন শুরু করতেই তাঁকে আর জেলের বাইরে থাকতে দিলেন না আয়ুব। ৬৬ থেকে ৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দফায় দফায় এবং শেষ দফায় টানা তিন বছরের বেশি কারাবাসে কাটে শেখ মুজিবুর রহমানের। ছয় দফার দফারফা করতে মুজিব জেলে থাকতেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার জাল পাততে শুরু করল পাকিস্তান সরকার। ১৯৬৮-র ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সহ ৩৫ জন বাঙালি সামরিক ও‌ সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের প্রশাসন। পাকিস্তান সরকার অভিযোগ করে, আগরতলায় বসে ভারতের মদতে পাকিস্তানকে ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন মুজিব সহ বাকিরা।

ছয় দফা দাবি,আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং তাতে মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারির সূত্র ‌ধরেই  ঊনসত্তরের জানুয়ারিতে আসে প্রবল গণ আন্দোলন। যা কার্যত গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয় পূর্ব পাকিস্তান ‌জুড়ে। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়া খানের হাতে দায়িত্বভার তুলে দিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন জেনারেল আয়ুব খান। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দিলে শান্ত হয় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের বিশাল সমাবেশে গণসংবর্ধনা প্রদান করা হয় কারামুক্ত মুজিবকে । মুজিবের মাথায় উঠে জনতার দেওয়া “বঙ্গবন্ধু” শিরোপা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবরণ ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের জেরে মুক্তি লাভের পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। সমগ্র পাকিস্তানের রাজনীতিতে তখন মুজিবকে মোকাবেলা করার মতো নেতা ছিল না । জেনারেল আয়ুব খানের বদলে ইসলামাবাদের তখতে তখন আরেক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে জেনারেল ইয়াহিয়া‌ই সবথেকে মাথামোটা শাসক । ক্যান্টনমেন্টের বাইরে রাজনৈতিক পরিসরে পিপিপি প্রধান বাস্তুঘুঘু জুলফিকার আলি ভুট্টো তখন ঘোলা জলে সুযোগের অপেক্ষায়।

রেডিওতে সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের ফল ঘোষণা শুনছেন শেখ মুজিবুর রহমান।

ছয়দফা যদি হয় বাংলাদেশ সৃষ্টির সূত্রপাত তবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তার প্রবেশিকা ধাপ। গণঅভ্যুত্থান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিণত করেছিল‌ পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদী জননায়কে । সত্তরে সাধারণ নির্বাচন ডাকতে বাধ্য হলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। গণঅভ্যুত্থানের পুঁজি পাঞ্জাবির পকেটে ভরে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে লড়তে নামলেন শেখ মুজিব। অনেক টালবাহানার পর ডিসেম্বরের শেষে অনুষ্ঠিত হল নির্বাচন। ভোটের ফল বেরোনোর পর দেখা গেল  তিনশ আসনের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৬০টি আসন‌ই ( পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টির মধ্যে ) দখল করে নিয়েছে মুজিবের আওয়ামি লিগ। ভুট্টোর পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলেও সব মিলিয়ে জিতেছে মাত্র ৮১টি। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আর‌ও একবার প্রমাণিত হল পাকিস্তান কতটা আজব রাষ্ট্র ! পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত দেশটির পশ্চিম ভূখন্ডে অথচ পার্লামেন্টের ৫৪ শতাংশ আসন ১২০০ মাইল দূরে পূর্ব ভূখন্ডের দখলে! ভোটের ফল মেনে নিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করতে হয় । মুজিব চেয়েও ছিলেন তাই। কিন্তু বেঁকে বসেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। মহাকালের লিখন খন্ডাবে কে ! মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে না দেওয়াটাই ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট। শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমরা যেমনটি দেখছি তেমনটিই লেখা হত কিনা  সন্দেহ। মুজিবর রহমান নির্বাচনে গিয়েছিলেন স্বায়ত্বশাসনের দাবি নিয়ে। ভোটে জয়লাভের পর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাঁকে সম্পূর্ণ বিমুখ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন, স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত লড়াইয়ের ডাক দেন নি বঙ্গবন্ধু।

ঢাকার রাজপথে নিরীহ রিক্সাচালকদের লাশ। পূর্ব পাকিস্তানে নৃশংসতায় নাৎসিদেরও ছাপিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান।

১৯৭১-এর মার্চ মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে সবথেকে ঘটনাবহুল  ও নির্ণায়ক । ৭ মার্চ  থেকে ২৬ মার্চের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ‌ই পাকিস্তানের ভবিতব্য। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ – ” এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম “। ২৫ মার্চ ভোর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আর্মির ক্র্যাকডাউন শুরু। গভীর রাতে শেখ মুজিব গ্রেফতার ও পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তর। ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। এরপর বাংলাদেশে নির্মম গণহত্যা, গণধর্ষণ পর্ব শুরু করে পাকিস্তান আর্মি, যা চলেছিল ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এপ্রিল থেকে ভারতে শরণার্থীদের ঢল নামল । সীমান্ত খুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে আর নিষ্ক্রিয় থাকা সম্ভব হল না ভারতের পক্ষে। ইন্দিরা বুঝলেন, আজ না হয়  কাল যুদ্ধে নামতেই হবে তাঁকে। নিজের রাজনৈতিক জীবনে ইন্দিরা যদি সবথেকে ধৈর্য্য, সাহস,বিচক্ষণতা এবং অনবদ্য কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় কোনও ঘটনায় দিয়ে থাকেন তবে নিঃসন্দেহে তা ১৯৭১-এর এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর – নয় মাসের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্বে । নির্ণায়ক যুদ্ধটা তো ছিল তেরো দিনের। কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রাক যুদ্ধ পর্বটাই ছিল সবথেকে জটিল এবং কঠিন। এক কোটির বেশি শরণার্থীকে ঠাঁই দিয়েছিল ভারত। কার‌ও কাছে হাত না পেতেই আট-নয় মাস শরণার্থীদের খাইয়েছে ভারত সরকার। আওয়ামি লিগের পুরো নেতৃত্ব ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। একদিকে পূর্ব পাকিস্তানের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর হয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও সহায়তার সুচারু বন্দোবস্তও করেন ইন্দিরা গান্ধী।

জেনারেল স্যাম মানেকশর মতো চৌকস সেনাপতির পরামর্শ না পেলে একাত্তরের যুদ্ধে তালগোল পাকিয়ে ফেলার যথেষ্টই ঝুঁকিতে ছিলেন ইন্দিরা। নিজের সেনাবাহিনীর সীমাবদ্ধতা,অস্ত্রশস্ত্র,গোলাবারুদ, রসদের হালহকিকত ভালোই জানতেন মানেকশ ।

এত কিছুর পরেও একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ভারতের জন্য সহজ ছিল না। প্রথমতঃ সেই সময় ভারতের সামরিক শক্তি আহামরি কিছু ভাল জায়গায় ছিল না। বাষট্টিতে চিনের আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে গিয়ে পিছুহটা। পঁয়ষট্টিতে পাকিস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের আগেই আন্তর্জাতিক চাপে সমঝোতায় আসা এবং আটষট্টি-ঊনসত্তর জুড়ে উত্তর সীমান্তে চিনের সঙ্গে হামেশাই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া। ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো‌ পর্যাপ্ত সময়টুকুও  পাচ্ছিল না দেশের তিন বাহিনী। আবার প্রতিরক্ষা খাতে সরকারের বরাদ্দ‌ও ছিল প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে আরও একটা পুরো দস্তুর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে অনেকবার ভাবতে হয়েছে ভারতের সমর বিশারদদের। জেনারেল স্যাম মানেকশর মতো চৌকস সেনাপতির পরামর্শ না পেলে একাত্তরের যুদ্ধে তালগোল পাকিয়ে ফেলার যথেষ্টই ঝুঁকিতে ছিলেন ইন্দিরা। নিজের সেনাবাহিনীর সীমাবদ্ধতা, অস্ত্রশস্ত্র , গোলাবারুদ , রসদের হালহকিকত ভালোই জানতেন মানেকশ । একাত্তরের জুন  থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্ততঃ দু’বার যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরাকে বুঝিয়ে নিরস্ত করেন সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ। প্রধানমন্ত্রীকে নদীমাতৃক পূর্ব পাকিস্তানের ভয়ঙ্কর বর্ষায় যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন মানেকশ। যুদ্ধ অযথা দীর্ঘায়িত হলে‌ সেনাবাহিনীর গোলাবারুদে টান পড়তে পারে বলেও ইন্দিরাকে সতর্ক করে দেন তিনি। সেনাপ্রধানের সুপরামর্শ মেনে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌ-বহর পাঠাই পাঠাই করেও শেষ পর্যন্ত পাঠানোর সাহস পায় নি আমেরিকা।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সমকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে ভারতের অনুকূলে গিয়েছিল। মিত্র পাকিস্তানের বিভাজনের বিরোধী ছিল আমেরিকা। পূর্ব পাকিস্তানের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলতে আমেরিকা সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে রীতিমতো অপমানিত হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু যুদ্ধ যখন সত্যিই বাঁধল তখন পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর ফুরসত পেলো না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আসলে তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে নাকানিচুবানি ‌খাচ্ছিল আমেরিকা। দক্ষিণ এশিয়ায় নাক গলিয়ে আর ঝামেলা বাড়াতে চান নি নিক্সন। পরিত্রাণ পেতে চিনের হাত পা ধরেছিল পাকিস্তান। কিন্তু মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধাক্কায় চিনের কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে তখনও নিত্য খুনোখুনি চলছে। পাকিস্তানের দুঃখে সমব্যথী হ‌য়ে পাশে দাঁড়ানোর সময় ছিল না বেজিংয়ের। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় পাকিস্তান তার দুই মিত্রকে পাশে না পেলেও ভারত কিন্তু বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধে । ১৯৭১-এর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ভারত। ৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে ভেটো না দিলে মাঝ পথেই রণেভঙ্গ দিতে হত ইন্দিরাকে। যুদ্ধের প্রায় শেষ দিকে মিত্র বাহিনী যখন ঢাকার দোর গোড়ায় তখনও একবার নিরাপত্তা পরিষদকে থামিয়ে দেয় সোভিয়েত রাশিয়া। বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠাই পাঠাই করেও সাতপাঁচ ভেবে শেষ পর্যন্ত আর ঝুঁকি নেয় নি পেন্টাগন।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর: আত্মসমপর্ণের নথিতে স্বাক্ষর করার আগে লেঃ জেনারেল অরোরার কাছ থেকে কলম চেয়ে নিচ্ছেন পরাজিত নিয়াজি।

১৩ ডিসেম্বর‌ই ইয়াহিয়া খান বুঝে যান পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হচ্ছেই। ছাড়ার আগে স্বাধীন হতে চলা দেশকে মেধাশূন্য করতে ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনা করে  পূর্ব পাকিস্তান ‌জুড়ে বেছে বেছে শুধু অধ্যাপকদের নৃশংস হত্যা করল পাকিস্তান আর্মি। সূর্য পূর্বে ওঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা নামার আগেই পাকিস্তানের সূর্য পূর্বে চিরদিনের মতো অস্ত গেল। কোনও সন্দেহ নেই, ঢাকায় রেসকোর্সের মাঠে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়ী সেনানায়ক, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার পাশে বসে নতমুখে পরাভূত পাক আর্মির পরাজিত সেনাপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির আত্মসমর্পণের কাগজে স্বাক্ষর করার দৃশ্য‌ই স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের সামরিক ইতিহাসে সব থেকে বড় সাফল্যের স্মারক ।

Pictures Sources- Collected.

কনটেন্টটি পড়ে আপনার ভাল লাগলে পোর্টালটির উন্নয়নে সাহায্য করতে চাইলে donate now অপশনে যান-


One thought on “১৬ ডিসেম্বর ,১৯৭১: স্বাধীন ভারতের সামরিক ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গৌরবোজ্জ্বল দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *