পদের থেকে মানসম্মান বড়,‌ঝানু মুকুল কি তা বুঝছেন না ?


শরীরে সোডিয়ামে-পটাশিয়ামের ঘাটতি ? নাকি ইচ্ছা করেই বেফাঁস বলছেন মুকুল রায় ? মানসম্মানের থেকেও বিধায়ক পদ বড় ! চাণক্য এখন হাসির খোরাক। বাংলার রাজনীতি কি এখন হাসি-মস্করার জায়গা ?

মুকুল কী ছিলেন ! মুকুল‌ কী হ‌ইলেন ! মুখ খুললেই খিল্লির বস্তু বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য। বিধানসভা ভোটের রেজাল্ট আউটের‌ পর থেকেই মুকুল রায় আড়ালে-আবডালে। দেড় মাসের মাথায় ফুল বদল – টুক করে ছেলেকে বগলে নিয়ে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন। কিন্তু তারপরেও চেনা মুকুলকে আর ফিরে পায় নি বাংলার রাজনৈতিক মহল। ভোটের আগেই অবশ্য মিইয়ে গিয়েছিলেন রায় সাহেব। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই কৃষ্ণনগরে বিজেপির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। গোটা প্রচার পর্বে নিজের নির্বাচনী চৌহদ্দির বাইরে পা দেন নি মুকুল, ছেলের কেন্দ্র বীজপুর ব্যতিক্রম। রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবার ভোটে জিতলেও সুখে নেই চাণক্য। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রীকে হারিয়েছেন। নিজে করোনা থেকে পার পেলেও‌ শরীর গেছে ভেঙে। ছেলে শুভ্রাংশু ভোটে হেরেছে। মাথা হেঁট করে যখন তৃণমূলে ফিরলেন ততক্ষণে বাংলার রাজনীতিতে মুকুলের ম্যাজিক শেষ। রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষো মাতৃহারা পুত্রের মন রাখতেই নাকি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি চাণক্যের ঘর ওয়াপসি।

বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর মমতা ও অভিষেকের পাশে বসে মুকুল রায়। মুকুলের আইনজীবী এখন বলছেন তাঁর মক্কেল এখনও বিজেপিতেই!

তৃণমূলে ফিরলেও যে পুরোনো দলে আর আগের কল্কে পাবেন না ঝানু মুকুল তা ভাল‌ই জানতেন। নাকে খত দিয়ে ঘরে ফিরলে ঘরে আর আগের‌ সম্মান ফিরে পায় না বিদ্রোহী ছেলে। পরিষদীয় রীতিনীতির বাইরে গিয়ে বিধানসভার পিএসি’র চেয়ারম্যান পদে মুকুল রায়কে বসিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওদিকে ততক্ষণে মুকুলের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা সারা বিজেপির। রাজনীতিতে মুকুল কী পারেন আর কী পারেন না তা মুকুল নিজে এবং মুকুলের শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই ভাল জানেন। পরিষদীয় রাজনীতির লোক‌ই নন রায় সাহেব। তিনি স্বচ্ছন্দ্য দলের সংগঠনে, প্রশাসনের অন্দরে এবং অবশ্যই পর্দার আড়ালে বসে কলকাঠি নাড়ানোতে। অভিষেকের উত্থান হতেই তৃণমূলে মুকুলের পতনের শুরু । ধীরে ধীরে সেকেন্ড ইন কমান্ডের পদ হাতছাড়া। অনেক জল ঘোলা করে বিজেপিতে যোগদানের পরেও ব‌ঙ্গ বিজেপির চালকের আসনে বসার সুযোগ পান নি মুকুল রায়। মুরলীধর সেন লেনের গেরুয়া বাড়িতে প্রথম প্রবেশের দিন থেকেই দিলীপ ঘোষের সঙ্গে মুকুল রায়ের ঠান্ডা লড়াই।

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির অপ্রত্যাশিত সাফল্যের পেছনে যে মুকুল রায়ের হাতযশ ছিল তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যদিও রাজ্য বিজেপির অন্দরে মুকুলের দর তাতে খুব একটা বাড়ে নি। একটা পর্যায়ে হতাশ মুকুল তৃণমূলে ফেরার কথা ভাবতে শুরু করেন। সেই গুঞ্জন কানে যেতেই‌ মুকুলকে বিজেপির সর্বভারতীয় সহসভাপতির পদে বসিয়ে দেন অমিত শাহ। জাতীয় স্তরে সান্ত্বনা পুরস্কার জুটলেও রাজ্যে মুকুলকে হাত খুলে খেলতে দেয় নি বিজেপি। অনেকেরই ধারণা,সেই সুযোগ পেলে একুশের ফাইনালে বিজেপির ফল উনিশের মতোই চমকপ্রদ হ‌তে পারত। নীতি-আদর্শের রাজনীতির ধার কোনও দিনই ধারেন নি কাঁচরাপাড়ার চাণক্য। তবে তিনি ভাল বোঝেন সংগঠন ও ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট। ইগোর কারণেই ভোটে মমতা-অভিষেককে পর্যুদস্ত করা দরকার ছিল মুকুলের । একুশের ভোটের দোর গোড়ায় যখন বুঝলেন বিজেপি যেভাবে চলছে তাতে নবান্নে পৌঁছানো সম্ভব নয় তখন থেকেই নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করেন ঝানু এই রাজনীতিক। এবং তখন থেকেই তলে তলে প্ল্যান বি‌’র প্রয়োগ‌ অর্থাৎ তৃণমূলে ফেরার রাস্তা খোঁজা শুরু করে দেন মুকুল রায়। গোটা প্রচার পর্বে মুকুল রায়ের বিরুদ্ধে কোনও শব্দ খরচ করেন নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্টে প্রচ্ছন্ন প্রশংসাই করেছেন কয়েকবার।

ভাইরাল ভিডিও - বীরভূমে অনুব্রতর পাশে দাঁড়িয়ে মুকুলের মন্তব্য পুর নির্বাচনে সারা পশ্চিমবঙ্গে বিপুলভাবে জয়ী হবে বিজেপি !

মুকুল রায়ের প্ল্যান ছিল বিজেপি জিতলে এক রকম আর হারলে আরেক রকম । দ্বিতীয়টি ঘটতেই মুকুল বুঝে যান, এবার বশ্যতা স্বীকার করেই কালীঘাটে ফিরতে হবে। রাজনীতির শতরঞ্জে দান চালার প্রশ্নে ধীরে সুস্থে চলাই মুকুল রায়ের আদত । বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফেরার সময় নিজের স্বভাবের ব্যতিক্রমটি ঘটিয়েছেন মুকুল। পারিবারিক জীবনে বিপর্যয়‌ই এর কারণ বলে অনেকে মনে করেন। এবং এর পর থেকেই মুকুল ছন্দহারা। তৃণমূলে এখন মুকুলের কার্যত কোন‌ও রোল‌ই নেই। তিনি তৃণমূলে আছেন এই কথা সরকারিভাবে স্বীকার করলে মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ থাকে না। মুকুল রায় নামক চাণক্যকে গ্যারেজে রাখতে পারলেই এখন তৃণমূলের স্বস্তি। তারপরেও মধ্যে মধ্যে বাইরে বেরিয়ে এদিক সেদিক যান কৃষ্ণনগরের বিধায়ক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বলেন তা ভাইরাল হয়ে যায় মুহুর্তেই। কেউ বলেন শরীরে সোডিয়াম- পটাশিয়ামের ঘাটতির কারণেই মুকুলের মুখে বেফাঁস কথা। কার‌ও আবার দৃঢ় বিশ্বাস, পুরোটাই খলের ছল। বিধায়ক পদ আর পিএসি’র চেয়ারম্যান পদ ধরে রাখতে ইচ্ছে করেই ভাট বকছেন রায় সাহেব। একমাত্র মুকুল‌ই জানেন তিনি সচেতন , অচেতন নাকি অবচেতনে মুখ খুলছেন। মুকুল রায়ের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কার‌ও কোন‌ও সংশয় নেই। মুকুল কি বুঝতে পারছেন না তিনি যা বলছেন , তিনি যা করছেন তাঁর মাপের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তা মানায় না ? মানসম্মান বলে তো মানুষের একটা জিনিস আছে। বিধায়ক পথটা তার থেকে বড় নয়। অবশ্য বাংলার রাজনীতিতে মানসম্মান বলে আর কোনও বস্তু অবশিষ্ট আছে কিনা এটাই এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন।

Photo Credit- Official FB page of Mukul Roy. Video collected.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *