ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পাকিস্তানে কর্মরত শ্রীলঙ্কার নাগরিককে খুন করে পোড়াল ইসলামিক কট্টরপন্থীরা


ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ভিন্নধর্মীকে খুন করা পাকিস্তানে একটি উৎসবের মতো ব্যাপার । এইবার বিদেশি নাগরিককেও ধর্ম অবমাননার বলি হতে হল । শেষ পর্যন্ত একটি ঘটনার‌ও বিচার হয় না বলে অভিযোগ । এবার‌ও কি হবে বিচার ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পাকিস্তানে কাজ করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ গেল এক শ্রীলঙ্কার নাগরিকের । শুক্রবার সকালে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটে প্রিয়ন্থা কুমারা নামে ওই বছর চল্লিশের শ্রীলঙ্কান নাগরিককে ধর্ম অবমনার অভিযোগে গণধোলাই দিয়ে খুন করে দেহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয় । প্রিয়ন্থা কুমারা শিয়ালকোটের ওয়াজিরাবাদ রোডে অবস্থিত একটি কারখানায় এক্সপোর্ট ম্যানেজারের কাজ করতেন। ” তেহেরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান ” নামে একটি ইসলামিক মৌলবাদী সংগঠনের সদস্যরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।

প্রিয়ন্থা কুমারা : পাকিস্তানে নিহত শ্রীলঙ্কান নাগরিক।

প্রিয়ন্থা কুমারা যে কারখানার কাজ করতেন তার দেওয়ালে পোস্টার সেঁটে ছিল তেহেরিক-ই-লাব্বাইক। প্রিয়ন্থা পোস্টারটি ছিঁড়ে রাস্তার পাশে রাখা ডাস্টবিনে ফেলে দেন বলে অভিযোগ। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই কট্টরপন্থী দলটির শত শত সদস্য কারখানাটিতে হামলা চালায়। শ্রীলঙ্কার নাগরিককে কারখানা চত্বর থেকে টেনে বের করে পিটিয়ে খুন করে উন্মত্ত জনতা। পোস্টারটিতে আরবি ভাষায় কোরানের উদ্ধৃতি লেখা ছিল । কোরানের উদ্ধৃতি লেখা পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে কারখানাটিতে কর্মরত শ্রীলঙ্কান নাগরিক ধর্ম অবমাননা করেছেন – এই ছিল উন্মত্ত জনতার অভিযোগ। প্রিয়ন্থা কুমারাকে খুন করেই রাগ মেটে নি তেহেরিক-ই-লাব্বাইকের সদস্যদের, কারখানায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেই আগুনে মৃতদেহটি ছুঁড়ে ফেলে তারা।

শ্রীলঙ্কান নাগরিককে পিটিয়ে খুন করার উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া জনতা।

ঘটনার সময় ধারেকাছে কেন পুলিশের দেখা মেলে নি এই প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশী কর্মীকে মেরে খুন করে দেহ আগুনে নিক্ষেপের অনেক পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বলে জানা গেছে । স্লোগান দিতে দিতে দলে‌ দলে উন্মত্ত ‌জনতার কারখানার দিকে ছোটার খবর নিকটবর্তী থানায় পৌঁছায় নি‌ , পুলিশের এই দাবি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয় বলেই মনে করছেন পাকিস্তানের নাগরিক সমাজের একাংশ। ঘটনাটিকে মর্মান্তিক বলে‌ বর্ণনা ‌করেছেন পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী উসমান বুজদার।‌ পাঞ্জাব পুলিশের আইজি রাও সর্দার আলি খানকে অবিলম্বে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত ‌ও জড়িতদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিজেদের নাগরিকের এমন নির্মম মৃত্যু শ্রীলঙ্কার সরকার এবং জনগণ সহজভাবে নেবে না তা বলাই বাহুল্য। নিজের সরকারের মান বাঁচাতে তড়িঘড়ি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ট্যুইট করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ট্যুইটারে ইমরান লেখেন, ” ভয়ঙ্কর অতর্কিত আক্রমণ ঘটেছে শিয়ালকোটের কারখানাটিতে। শ্রীলঙ্কান কারখানা ম্যানেজারকে‌ পুড়িয়ে মারার ঘটনা পাকিস্তানের ‌জন্য একটা লজ্জার দিন। ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকে আমি নিজে নজর রাখছি। ভুল করেও‌ কাউকে ছাড়া চলবে না। জড়িত সকলকে আইন অনুযায়ী কঠোর সাজা দেওয়া হবেই ।‌ অভিযুক্তদের গ্রেফতারের কাজ জোরকদমে চলছে। “

ঘটনার পর ইমরান খানের ট্যুইট।

রাজনৈতিক মহল যদিও বলছে , ইমরান খানের হুমকিই সার । ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের হত্যা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। জনরোষের ভয়ে‌ কোন‌ও হত্যাকান্ডের বিচার হয় না।‌ এবার বিদেশি নাগরিককেও ধর্মোন্মাদদের রোষের‌ বলি হতে হল । তেহেরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তানের জঙ্গি আন্দোলনের জেরে কিছু দিন আগেই টলমল করে উঠেছিল ইমরান খানের গদি । আপোষ করে এই কট্টরপন্থী সংগঠনের ক্ষোভ ঠান্ডা করেন ইমরান। এই পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কান নাগরিককের খুনে জড়িতদের বিচার করার সাহস ইমরান খান কতটা দেখাতে পারবেন, তা নিয়ে যথেষ্টই সংশয়ে আন্তর্জাতিক মহল ।‌ তবে সিংহলি সমাজে এই ঘটনার যে তীব্র প্রভাব পড়বে তাতে কোন‌ও সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যেই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাকিস্তানের কাছে অবিলম্বে ঘটনায় জড়িত সকলকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে কলম্বো।

Photo Credit – DAWN.COM.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *