উপনির্বাচনে লজ্জাজনক পরাজয় , পুরভোটের মুখে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে রাজ্য বিজেপি ?


ভবানীপুর উপনির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তারপরেও অবাঙালি প্রধান ভবানীপুরে ২২.২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল। দিনহাটা, গোসাবা এবং খড়দহের মতো বাঙালিহিন্দু অধ্যুষিত বিধানসভাতে বিশ শতাংশ ভোট‌ও কেন জোগাড় করতে ব্যর্থ হল বিজেপি ?

বিশেষ প্রতিবেদন : রাজ্য বিজেপির দীপাবলির আলোতে জল ঢেলে দিল উপনির্বাচনের ফল । দু-দুটো জেতা আসন হাতছাড়া তো হয়েইছে হারাজেতা মিলে চারটি আসনেই ভোট কমেছে মারাত্মকভাবে । দিনহাটা,গোসাবা ও খড়দহে ভোটের হার নামতে নামতে তলানিতে। ফলে‌‌ দলের প্রার্থীরা জামানত খুইয়েছেন।  শান্তিপুরের মতো শক্ত ঘাঁটিতেও  শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছে । বিধানসভা নির্বাচনে শান্তিপুরে সম্মানজনক ( ১৫৮৭৮) ব্যবধানে জিতেছিলেন রানাঘাটের  সাংসদ জগন্নাথ সরকার । বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৪৯.৯৪ শতাংশ। প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ভোট পাওয়া এই আসনে উপনির্বাচনে বিজেপির অধঃপতন রাজনৈতিক মহলকে বিস্মিত করেছে । বিজেপি প্রার্থী নিরঞ্জন বিশ্বাস ভোট পেয়েছেন সাকুল্যে ২৩.২২ শতাংশ।  অর্থাৎ ‌মাত্র ছয়মাসের ব্যবধানে বিজেপি ভোট হারিয়েছে ২৬.৭২ শতাংশ। অথচ শান্তিপুর বাঙালিহিন্দু অধ্যুষিত একটি বিধানসভা কেন্দ্র , যেখানে মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রভাব‌ও চোখে পড়ার‌ মতো ।

দিনহাটা আসনটিও বিজেপির হাতছাড়া হয়েছে । তবে দিনহাটায়‌ বিজেপির জেতার সম্ভাবনা প্রায়  ছিল না বললেই চলে ।‌ বিধানসভা নির্বাচনে রাজবংশীহিন্দু অধ্যুষিত  কোচবিহার জেলায় বিজেপি চমৎকার ফল করলেও দিনহাটা আসনে নিশীথ প্রামাণিক জিতেছিলেন মাত্র ৫৭ ভোটে । দিনহাটা ছিল বামফ্রন্ট সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী প্রয়াত কমল গুহের খাসতালুক।  ক্যারিশ্মায় বাবার ধারকাছ দিয়ে না গেলেও দিনহাটায় উদয়ন গুহের আলাদা একটা দাপট রয়েছে । বাবার ভাবমূর্তির ডিভিডেন্ড এখন‌ও পাচ্ছেন উদয়ন । কিন্তু নিশীথ‌ প্রামাণিকের প্রভাব‌ও তো কম কিছু নয় । নিশীথ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র এবং ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ  প্রতিমন্ত্রী। নিশীথ প্রামাণিকের বাড়ি যেই এলাকায় সেই  ভেটাগুড়িও দিনহাটা বিধানসভার অন্তর্গত । কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর হোম কনস্টিটিউয়েন্সিতে বিজেপি উপনির্বাচনে জামানত টুকুও রক্ষা করতে পারে নি ‌। দিনহাটায় উদয়ন গুহ জিতেছেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৮৯ ভোটের রেকর্ড মার্জিনে। উদয়ন পেয়েছেন ৮৪.১৫ শতাংশ ভোট। বিজেপির অশোক মন্ডল পেয়েছেন মাত্র ১১.৩১ শতাংশ ভোট। বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির ভোট কমেছে ৩৬.২৯ শতাংশ ! মাত্র ছয়মাসের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দাপুটে নিশীথ প্রামাণিকের ছেড়ে যাওয়া আসনে বিজেপির এমন শোচনীয় পরাজয় কীভাবে সম্ভব ?

উপনির্বাচনে জঘন্য ফল বিজেপির। বাঙালিহিন্দুর কি পদ্মে মোহভঙ্গ হচ্ছে ?

বিধানসভা নির্বাচনে গোসাবা জিততে না পারলেও বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪১.৮৮ শতাংশ। উপনির্বাচনে তা নেমেছে মাত্র ৯.৯৫ শতাংশে । খড়দহ আসনে বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়ে শীলভদ্র দত্ত পেয়েছিলেন ৩৩.৬৭ শতাংশ ভোট। উপনির্বাচনে খড়দহে বিজেপি পেয়েছে মাত্র ১৩.০৭ শতাংশ ভোট। রাজ্য বিজেপির নেতাদের জন্য সবথেকে বড় আশঙ্কার কথা হল, শান্তিপুরে বিজেপির ভোট বামেদের ঘরে ফিরে যাওয়ার চিত্র স্পষ্ট । বিধানসভা নির্বাচনে শান্তিপুর কেন্দ্রে জোটের প্রার্থী পেয়েছিলেন মাত্র ৪.৪৮ শতাংশ ভোট।‌ উপনির্বাচনে সিপিএমের ভোট বিজেপির ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। সিপিএম প্রার্থী পেয়েছেন ১৯.৫৭ শতাংশ ভোট। বামেদের ভোট বৃদ্ধির হার ১৫.০৯ শতাংশ। বাঙালিহিন্দু অধ্যুষিত শান্তিপুরে এই ১৫ শতাংশ ভোট সিপিএম ভাঙিয়ে এনেছে বিজেপির ঘর থেকে। হাইভোল্টেজ ভবানীপুর উপনির্বাচনে বিজেপির প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল পেয়েছিলেন ২২ শতাংশের বেশি ভোট ‌। ভবানীপুর বিধানসভায়  অবাঙালিহিন্দুদের প্রাধান্য । ভবানীপুরে ভোটদানের হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তারপরেও ২২.২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। দিনহাটা, গোসাবা এবং খড়দহের মতো বাঙালিহিন্দু অধ্যুষিত বিধানসভাতে বিশ শতাংশ ভোট‌ও কেন জোগাড় করতে ব্যর্থ হল বিজেপি ?

কর্মী-সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ বিজেপি নেতৃত্বের সামনে।

উপনির্বাচনে শাসকদলের অ্যাডভান্টেজ থাকে , সত্যি কথা। প্রশাসন নিরপেক্ষ ছিল না , এটাও মিথ্যে নয় । শাসকদল গায়ের জোর খাটিয়েছে , অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তারপরেও রাজ্যের প্রধান ও একমাত্র বিরোধী দলের ফল এতটা শোচনীয় হয় কীভাবে ? যেই দলটা ছয়মাস আগেও গোটা রাজ্যে ৭৭ টি আসন ও ৩৮.১৩ শতাংশ ভোট হাসিল করেছিল সেই দলটা ছয়মাস পরে তিনতিনটা আসনে জামানত পর্যন্ত রক্ষা করতে পারল না ! বিধানসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর থেকেই রাজ্য বিজেপির সংগঠন ছন্নছাড়া । নেতৃত্ব দিশেহারা । তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের নিত্য ঘর ওয়াপসি। কখন কোন বিধায়ক পদ্মফুল ছেড়ে জোড়াফুল ধরেন কেউ বলতে পারেন না। বুথস্তরে কর্মীরা হতোদ্যম হয়ে‌ বসে পড়েছেন। দলবেঁধে তৃণমূলের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে চার উপনির্বাচনে শোচনীয় ব্যর্থতা বিজেপির জন্য যে একটা বিরাট আঘাত , তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সামনেই কলকাতা কর্পোরেশন সহ শতাধিক পুরসভায় ভোট । হারজিত পরের কথা । পুরভোটে লড়াইয়ের মতো লড়াই দিতে চাইলে  রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বকে আগামীকাল থেকেই গাঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে হবে ।

Photo Credit – BJP FB page.


Leave a Reply

Your email address will not be published.