রহস্যে ঘেরা জলপাইগুড়ি জেলার বৈকুণ্ঠপুর রাজ এস্টেটের ৫১২ বছরের দুর্গাপুজো


রাজা নেই । রাজত্ব‌ও নেই । কিন্তু রাজার পুজো আছে । জলপাইগুড়ির বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গা পুজো ৫১২ বছরের প্রাচীন । বড় রহস্যে ঘেরা এই পুজো । এক সময় হত নরবলিও । বিস্তারিত জানুন অরুণকুমারের প্রতিবেদনে –

রাজা নেই ।‌ রাজত্ব নেই । জীর্ণ রাজবাড়ি আছে । আর আছে রাজার পুজো । ৫১২ বছরের প্রাচীন পুজোর গল্প শোনাই  আপনাদের । জলপাইগুড়ির বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো এবার পাঁচশ বারো বছরে পড়ল । নানা তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দে রাজা  শিষ্য সিংহ  এই পুজোর প্রচলন করেন । শিষ্য সিংহের জেষ্ঠ্যভ্রাতা  বিশ্ব সিংহ ( যাঁকে কোচ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়ে থাকে ) ১৫১০ খ্রিষ্টাব্দে কোচবিহার রাজবাড়ির বড়দেবীর ( কোচবিহার রাজবাড়ির দেবী দুর্গাকে এই নামেই ডাকা হয়। ) পুজোর প্রচলন করেন বলে জানা যায় । এই হিসেব মেনে নিলে বলতে হয় বৈকুণ্ঠপুর রাজ এস্টেটের দুর্গাপুজোর বয়স কোচবিহার রাজবাড়ির বড়দেবীর পুজোর থেকেও এক বছর বেশি । বাংলার প্রাচীনতম দুর্গাপুজো গুলির মধ্যে বৈকুণ্ঠপুর এবং কোচবিহার রাজবাড়ি – দুটোই উল্লেখযোগ্য ।

বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমা।

রাজার পুজো মানেই রহস্যে মোড়া । কোচবিহার রাজাদের বড়দেবীর পুজো থেকে বৈকুন্ঠপুর রাজ এস্টেটের পুজোয় রহস্য কিছু কম নয় । পুজোর সূত্রপাত থেকেই নরবলি ছিল । এই প্রথা নাকি পরবর্তী একশ বছর যাবৎ চালু ছিল ! নিখুঁত এবং সর্ব সুলক্ষণযুক্ত দেহের অধিকারী অনূর্ধ্ব দ্বাদশ বর্ষীয় ব্রাহ্মণ বালককে দেবী মূর্তির সামনে বলি দেওয়া হত সপ্তমীর গভীর নিশীথে সংগোপনে। বলিকৃত বালকের কলিজা ( হৃদপিন্ড ) দেবীর উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করা হত । চারশ বছর আগে এই নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধ হয়ে গেলেও নরবলির কথা পরিবারের বড়দের মুখে শুনেছেন রাজবাড়ির সকল সদস্য‌ই । এখনও হিমালয় সংলগ্ন উত্তরবঙ্গের তরাই-ডুয়ার্সে  পুজো এলেই লোকের মুখে মুখে ‌ফেরে বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়িতে ‌নরবলির গল্প । সপ্তমী তিথিতে রাত বারোটার পর অনুষ্ঠিত অর্ধরাত্রি  পুজোয় প্রতীকি নরবলি কিন্তু আজ‌ও হয় রাজবাড়িতে । চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো মনুষ্য আকৃতির পুতুল  বলি দেওয়া হয় । পুজোর রীতিনীতি আগে যেমন ছিল তেমনটিই আছে এখনও ।‌ বৈকুণ্ঠপুর  রাজবাড়িতে মায়ের পুজো হয় কালিকা পুরাণ মতে । এই পুজোয় বলি সিদ্ধ । সপ্তমীর অর্ধরাত্রি পুজোয় আটটি পায়রা বলি দেওয়া হয়। জলপাইগুড়ি জেলার রাজবংশী সমাজের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈকুণ্ঠপুরের দুর্গা পুজো । নবমীতে যজ্ঞের আগে মনোস্কামনা পূরণে পুজো প্রাঙ্গণে  পাঁঠা , হাঁস , চালকুমড়ো এবং আখ বলি দেন‌ স্থানীয়রা ।

পুজোর আচার পালনে রত রাজ পরিবারের সদস্য প্রণত বসু। পাশে কুল পুরোহিত শিবু ঘোষাল।

বৈকুণ্ঠপুর রাজ এস্টেটের দুর্গা প্রতিমার পৃথক কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।মহামায়া এখানে তপ্ত কাঞ্চন বর্ণা । এবং তিনি সর্বাঙ্গে সালংকারা। দেবীর মস্তকে স্বর্ণ মুকুট এবং গন্ডদেশে শোভা পায় নবরত্ন হার । দেবীর দশ হস্ত ও কর্ণকুন্তলে বিরাজ করে সোনা-রূপার গহনা । দেবী পরিধান করেন লাল বেনারসি শাড়ি । প্রতিমার উচ্চতা ১৫ ফিট । একচালা একটি রথের উপর দেবী উপবেশন করেন । সিংহবাহিনী দেবীর সঙ্গে থাকে ব্যাঘ্র‌ও । সিংহের গাত্রবর্ণ শুভ্র । অসুর দলনী দেবী দুর্গার দুই পাশে তাঁর চার পুত্রকন্যা কার্তিক-গণেশ , লক্ষ্মী-সরস্বতী তো থাকেন‌ই বিগ্রহ রূপে চালায় বিরাজ করেন মহামায়া , দেবী চন্ডী, দেবাদিদেব মহেশ্বর‌ , ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুও। এমনকি মায়ের পাশে স্থান পেয়েছেন কৈলাশে ভোলানাথের চ্যালা নন্দীর স্ত্রী জয়া এবং তাঁর সখী বিজয়াও । বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ির নাটমন্দিরে পুজো হয় । স্থায়ী কাঠামোর উপর  প্রতিমা নির্মাণের কাজ‌ও চলে সেখানেই ।‌‌ মহালয়ার সকালে তর্পণান্তে রাজ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে মায়ের চক্ষুদান করেন রাজবাড়ির মৃৎশিল্পী । কার্যত মহালয়া থেকেই বৈকুন্ঠপুর রাজ পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয়ে যায় ।‌ মহালয়ার অমাবস্যায় কালীপুজো এখানে দুর্গাপুজোর‌ই অঙ্গ ।

বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়িতে মহালয়ায় দেবীর চক্ষুদান।

বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির পুজোয় নবপত্রিকার স্নানের জল আসে হরিদ্বারের গঙ্গা , মথুরা ও বৃন্দাবনের যমুনা নদী এবং কৈলাশ মানস সরোবর থেকে । রাজা নেই । রাজত্ব‌ও নেই ।‌ রাজ পরিবারের সদস্যরা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে । কিন্তু ষষ্ঠীর বোধন থেকে দশমীতে নিরঞ্জন – ঐতিহ্য , পরম্পরা ও নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম নেই রাজবাড়ির পুজোয় । পুজোর ভোগে আমিষের প্রাধান্য । সপ্তমী , মহাষ্টমী এবং নবমী – তিনদিন‌ই দেবীর ভোগে থাকে রুই-কাতলা, ইলিশ, বোয়াল এবং চিতল মাছ। থাকে পাঁঠার মাংস‌ও । এক সময় বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ির পুজো মানেই ছিল বিরাট উৎসব । এস্টেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ আসতেন পুজো দেখতে । রাজবাড়ি চত্বর জুড়ে শত শত তাঁবু পড়ত । পুজো উপলক্ষে বিশাল মেলা বসত । কালের গ্রাসে অতীত দিনের জৌলুস অনেকটাই ফিকে । তারপরেও পুজো উপলক্ষে রাজবাড়ি সংলগ্ন রাস্তার দু’পাশে আজ‌ও মেলা বসে ।

নিরঞ্জনের পথে বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমা।

রাজবাড়ির দশমী ও সিঁদুর খেলা আজ‌ও জলপাইগুড়ির দুর্গা পুজোর অন্যতম আকর্ষণ । দশমীর পুজো সমাপান্তে সধবারা দেবী বরণ ও সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন । রাজ পরিবারের সদস্যরা তো বটেই দলে দলে সাধারণ মানুষ‌ও এতে অংশগ্রহণ করে। বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে দেবী নিত্য পূজিতা । দেবী দুর্গার দশমী বিহিত পুজো সমাপান্তে মৃৎ প্রতিমার  নিরঞ্জন হয় মাত্র । ঢাক-ঢোল-কাশি-বাঁশির  প্রবল বাদ্যের মধ্যে রথে আসীন দেবী প্রতিমা টানতে টানতে রাজবাড়ির দিঘির ঘাটে নিয়ে যান ভক্তরা । এই দৃশ্য দেখতে রাজবাড়ি চত্বরে উপস্থিত হন হাজার হাজার মানুষ । প্রতিমা নিরঞ্জনের সাথে সাথেই কাঠামো জল থেকে তুলে ফেলা‌ই নিয়ম । এই কাঠামোর উপরেই নির্মিত হবে পরের বছরের দেবী প্রতিমা । রাজবাড়ির দুর্গা পুজোর পুরো দায়িত্ব  কুল পুরোহিত শিবু ঘোষালের কাঁধে । শিববাবুর পিতৃপুরুষেরা‌ও এক‌ই কাজ করে এসেছেন । রাজ পরিবারের তরফে পুজোর মূল দায়িত্ব সামলান প্রণত বসু । লোকে তাঁকে পুচুবাবু বলে চেনে। কোভিড অতিমারির কারণে বিশ থেকেই বাঙালির প্রাণের পুজো আড়ম্বরহীন । অতিমারির  ছাপ পড়েছে জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোতেও । এখন রাজবাড়িতে জোরকদমে চলছে ৫১২ তম দুর্গাপুজোর আয়োজন পর্ব । মড়ক-মন্বন্তরে‌ও এই মহাপুজোয় ছেদ পড়ে না ।

  • প্রতিবেদনটি রচনায় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জলপাইগুড়ির বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক উমেশ শর্মা । ছবি প্রতিবেদক দ্বারা সংগৃহীত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *