সুদীপ-অভিষেকের পর মমতার মুখেও কংগ্রেস বিদ্বেষ , অন্য গন্ধ পাচ্ছে হাত শিবির


মমতাকে কাছে টানতে উদগ্রীব সোনিয়া-রাহুল । কিন্তু কংগ্রেসের জন্য ক্রমেই বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তৃণমূল । কোন খেলা চলছে পর্দার পেছনে ?

পলিটিক্যাল ডেস্ক : কংগ্রেসকে বেকায়দায় ফেলানোই কি তৃণমূলের রাজনৈতিক অভিসন্ধি ? যদি তাই হয়ে থাকে তবে দিনের শেষে লাভ কার ? জাতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে চাইছে তৃণমূল । কিন্তু তাতে বিজেপির চাইতে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা তাদের – এমন‌ই মনে করছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব । বিরোধী ঐক্যের জন্য তৃণমূলের সহযোগিতা অপরিহার্য – এই বাধ্যবাধকতা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কে যথেষ্ট‌ই নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন সোনিয়া-রাহুল । ভবানীপুর উপনির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী‌ই দেয় নি কংগ্রেস । বাকি দুই আসনেও কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নমঃ নমঃ । কিন্তু তারপরেও কংগ্রেসকে কটাক্ষ করা নিত্যকর্ম বানিয়ে ফেলেছে তৃণমূল । পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের উত্থান ও কংগ্রেসের পতন – সামানুপাতিক হারে ঘটেছে । এগারোতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠনের পরেও শরিক কংগ্রেস থেকে বিধায়ক ভাগিয়ে আনতে কুন্ঠাবোধ করে নি তৃণমূল । দু’বছরের মাথায় ভেস্তে যায় জোট ।তারপরের ঘটনাপ্রবাহ সকলের‌ই জানা । আজকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামেরা নিঃশেষিত । সেই সঙ্গে কংগ্রেস‌ও । বাম-কংগ্রেসের জায়গা নিয়েছে বিজেপি। বিধানসভার ভেতরে তারা হয়েছে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র বিরোধীদল ।

জাতীয় রাজনীতির খাতির পশ্চিমবঙ্গে দলের আশা একপ্রকার জলাঞ্জলি দিয়েই তৃণমূলের সঙ্গে সখ্যতা পাতাতে চাইছেন কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব । কিন্তু কংগ্রেস সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোভাব বেশ রহস্যময় ঠেকছে রাজনৈতিক মহলের কাছে । বাংলায় দুর্বল কংগ্রেসকে আরও দুর্বলতর করাই যেন তৃণমূলের লক্ষ্য । কিন্তু জাতীয় স্তরেও কংগ্রেস সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোভাবের মধ্যে খুব একটা ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না কেউ । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এখনও পর্যন্ত মৌন । কিন্তু তাঁর টিম মাঠে নেমে পড়েছে দলনেত্রীকে মোদীর বিকল্প মুখ হিসেবে তুলে ধরতে । এবার পশ্চিমবঙ্গের মাঠ ছেড়ে গোটা দেশে খেলতে চায় তৃণমূল । জাতীয় রাজনীতিতে বড় শক্তি হয়ে উঠতে বিভিন্ন রাজ্যে জমি খুঁজছে তৃণমূল । আগামী বছর উত্তরপ্রদেশ , উত্তরাখণ্ড , পাঞ্জাব , মণিপুর এবং গোয়ায় নির্বাচন । পরের বছর ত্রিপুরায় । চব্বিশে লোকসভা নির্বাচন । বাইশে উত্তরপ্রদেশ , পাঞ্জাব এবং উত্তরাখণ্ডের ফলের দিকে সবার নজর । উত্তরপ্রদেশ বরাবরই জাতীয় রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারক । কোনও সন্দেহ নেই যে আপ , সমাজবাদী পার্টি এবং তৃণমূলের মতো আঞ্চলিক শক্তির উত্থানে সবথেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে কংগ্রেসের । কেজরিওয়ালের আপ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল উভয়েই এখন জাতীয় রাজনীতির বড় খিলাড়ি হয়ে উঠতে চাইছে ।

রাহুল-প্রিয়াঙ্কাকে মুখ করে লড়তে তৈরি হচ্ছে কংগ্রেস ।

জাতীয় রাজনীতিতে এক সময় কংগ্রেস যে জায়গায় ছিল সেই জায়গাটা নিয়ে ফেলেছে বিজেপি । ৮৯ এর আগে জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ভার্সেস বিরোধীদের লড়াই হত । বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে গেলে ফায়দা হত কংগ্রেসের । চব্বিশে মোদীকে উৎখাত করতে এক ছাতার তলায় আসতে চাইছে বিজেপি বিরোধীরা । কিন্তু সেই ছাতার মাথা কে হবে এই নিয়ে গোল বাঁধার সম্ভাবনা প্রবল । রাহুল-প্রিয়াঙ্কার হাতে নেতৃত্ব দিয়ে লড়াইয়ে এগোতে চাইছে কংগ্রেস । কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ দশ বছর কেন্দ্রে সরকার চালিয়েছে । মোদী বিরোধী কোনও মহাজোট তৈরি হলে তার নেতৃত্ব স্বাভাবিক ভাবেই কংগ্রেসের হাতে থাকার কথা । কিন্তু বিরোধীদের কোন‌ও কোন‌ও শিবির যখন এই জায়গা থেকে কংগ্রেসকে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে তখন বিরোধী ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ থেকে যায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদীর বিকল্প মুখ হয়ে উঠলে স্বাভাবিক ভাবেই পেছনের বেঞ্চে বসা ছাড়া রাহুল-প্রিয়াঙ্কার আর কোনও রাস্তা থাকে না । জাতীয় রাজনীতির স্বাভাবিক পাটিগণিত অনুযায়ী তৃণমূলের প্রধান বিরোধী দল হয়ে ওঠার কোনও সম্ভাবনা‌ই দেখা যাচ্ছে না । জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূল প্রধান বিরোধী দল না হলে মমতা কীভাবে জোটের প্রধানমন্ত্রী মুখ হয়ে উঠবেন ? আর হয়ে উঠতে চাইলেও কংগ্রেস মানবে কেন ?

অভিষেকের পর কংগ্রেসকে কটাক্ষে মমতাও ।

রাহুল-সোনিয়া অপমানিত হন এমন কথার ঝাঁঝ হঠাৎ করেই যেন বাড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল । দিল্লিতে রাহুল গান্ধী কোনও কর্মসূচি নিলে দীর্ঘদিন ধরেই তা এড়িয়ে চলে অথবা নাম কা ওয়াস্তে অংশ গ্রহণ করে তৃণমূল । সম্প্রতি দলীয় মুখপত্রে রাহুলকে জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার অযোগ্য বলে কটাক্ষ করেছেন তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় । সুদীপের মতে একমাত্র মমতাই মোদীর যোগ্য বিকল্প । এর পরেই কংগ্রেসকে কার্যত বিদ্রুপে ভরিয়ে দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় , যিনি তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড । মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জে ভোটের প্রচারে গিয়ে অভিষেক বলেছেন, ” কংগ্রেস ও তৃণমূল দুই দ‌ল‌ই বিজেপিকে হারাতে চায় । কিন্তু তফাত একটাই । কংগ্রেস সব জায়গায় বিজেপির কাছে হারে । তৃণমূল বিজেপিকে হারায় । ” অভিষেকের মোদ্দা কথা – কংগ্রেসকে দিয়ে কিস্যু হবে না । বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে পারে একমাত্র তৃণমূল‌ই । যেই ভবানীপুর আসনে মমতার বিরুদ্ধে নিজেরা প্রার্থীই দেয় নি এমনকি সিপিএম প্রার্থীকেও সমর্থন করে নি কংগ্রেস , সেই ভবানীপুরে প্রচারে গিয়ে ভাইপোর মতো চড়া গলায় না হলেও কংগ্রেসকে ঠুকতে ছাড়েন নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । সিবিআই-ইডি কংগ্রেসের মেইন লোকদের গায়ে হাত দেয় না , কিন্তু তৃণমূলের মাথাদের টার্গেট করে বলে মমতার অভিযোগ । তিনি বিজেপির সামনে মাথা নত করেন না বলেই কেন্দ্রীয় সরকার এজেন্সি লেলিয়ে দেয় বলে দাবি করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো ।‌ অর্থাৎ ঘুরিয়ে কংগ্রেসকেই খাঁটো করলেন মমতা । কংগ্রেসে সবাই মমতার কটাক্ষ চুপ করে সয়ে গেলেও মৌন থাকার বান্দা নন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী । জবাবে অধীর বলেছেন , বিজেপির সুপারি নেওয়ার পর থেকেই হঠাৎ করে কংগ্রেসের প্রতি বিষোদগার বাড়িয়ে দিয়েছেন পিসি-ভাইপো ।‌ অধীর চৌধুরীর ইঙ্গিত খুব পরিস্কার – বিজেপির ইন্ধনেই মমতার কংগ্রেস বিদ্বেষ ।

মঞ্চের পিছনে বিজেপি-তৃণমূলের কেমিস্ট্রি কেউ জানে না । জনগণ মঞ্চের সামনের দৃশ্য দেখতে পায় মাত্র ‌। তবে যে কোনও কারণেই হোক বিরোধী শিবিরের ‌ঐক্যে ফাটল ধরলে মোদী-শাহের জন্য তা খুশির খবর । লড়াইটা যখন মোদী ভার্সেস আদার্স , তখন আদার্সের ঘরে চেয়ার নিয়ে চুলোচুলি বাঁধলে আখেরে লাভ কার তা বুঝতে রাজনীতির সাধারণ জ্ঞান‌ই যথেষ্ট । চব্বিশের ট্রফি ঘিরে রাজনীতির জাতীয় লিগে খেলা তো একটা হচ্ছেই ‌। কিন্তু কে কার হয়ে খেলছে কিম্বা কে কার খেলা সহজ করে দিচ্ছে , তা বুঝতে আর‌ও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে । সব ম্যাচ‌ই আসল ম্যাচ নয় ম্যাচ কিন্তু গড়াপেটা‌ও হয় ।

Photo Credit – Official FB page of Cong and TMC.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *