টোকিও অলিম্পিক্স ২০২০ : অলিম্পিক্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পদক ভারতের


অলিম্পিক্সে এক লপ্তে সাতটি পদক পেতে ১২১ বছর লাগল ভারতের ! এবারেই সর্বোচ্চ পদক আমাদের । টোকিও অলিম্পিক্স-২০২০ থেকেই শুরু করতে হবে আরও এগিয়ে যাওয়ার অভিযান । পরের অলিম্পিক্স প্যারিস-২০২৪ । টোকিওর সাফল্যকে প্যারিসে ছাপিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে এখন থেকেই

টোকিও সামার অলিম্পিক্স ২০২০ শেষ হল । পরের সামার অলিম্পিক্সের আসর বসবে প্যারিসে ২০২৪ সালে । করোনা অতিমারির কারণে বিশের অলিম্পিক্স পেছাতে হয়েছে একুশে । একুশেও করোনা ছাড়ে নি মানুষকে । শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত টোকিও অলিম্পিক্স নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল । যদিও শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় মিটল টোকিও অলিম্পিক্স । করোনার কারণে অবশ্যই অনেকটা জৌলুস হারিয়েছে টোকিও অলিম্পিক্স । হাজারো বিধি নিষেধের বেড়াজালে প্রায় ফাঁকা গ্যালারিতে আয়োজন করতে হয়েছে ইভেন্ট গুলি । সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে অলিম্পিক্স দেখতে । আয়োজন স্থলের ধারেকাছে কোন‌ও হোটেলে একটি ঘর পর্যন্ত ফাঁকা পাওয়া যায় না । প্যান্ডেমিকের ভয়ে এইবার প্রতিযোগী , কর্মকর্তা , কর্মীএবং সাংবাদিক ছাড়া আর কাউকেই অলিম্পিক্সে আসার অনুমতি দেওয়া হয় নি । সামার বা গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্সের পাশাপাশি উইন্টার বা শীতকালীন অলিম্পিক্স থাকলেও অলিম্পিক্স বলতে সবাই সামার অলিম্পিক্সকেই বোঝে । ঐতিহ্যে , আভিজাত্যে , জৌলুসে , বৈচিত্র্যে এবং আকারে-প্রকারে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্সের ধারেকাছে অন্য কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নেই । এই জন্য সামার অলিম্পিক্সকে বলা হয় গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ ।

টোকিও অলিম্পিক্স-২০২০: সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বাজির রোশনাই ।

টোকিও অলিম্পিক্সে ২০৫টি দেশের মোট ১১ হাজার ৯০ জন প্রতিযোগী ৩৩টি খেলার ৫০ টি ডিসিপ্লিনে ৩৩৯টি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেন । টোকিওতে পদকপ্রাপ্তি ঘটেছে ৮৬টি দেশের । ৩৯টি সোনা , ৪১টি রুপা এবং ৩৩ টি ব্রোঞ্জ সহ ১১৩টি পদক নিয়ে শীর্ষে আমেরিকা । ৩৮ টি সোনা , ৩২ টি রুপা এবং ১৮টি ব্রোঞ্জ সহ ৮৮টি পদক জিতে দ্বিতীয় চিন । আয়োজক জাপান তৃতীয় । জাপান পেয়েছে ২৭টি সোনা , ১৪টি রুপা এবং ১৭টি ব্রোঞ্জ । গ্রেট ব্রিটেন চতুর্থ । ২২টি সোনা , ২১টি রুপা এবং ২২টি ব্রোঞ্জ সহ ব্রিটেনের প্রাপ্তি মোট ৬৫টি পদক । ডোপিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ২০২২ পর্যন্ত সমস্ত ধরণের আন্তর্জাতিক স্পোর্টস থেকে নির্বাসিত রাশিয়া । টোকিও অলিম্পিক্সে রুশিয়ান অলিম্পিক কমিটির ব্যানারে অংশগ্রহণ করতে রুশ প্রতিযোগীরা । মেডেল তালিকায় রুশ অলিম্পিক কমিটির স্থান পঞ্চমে । অস্ট্রেলিয়া ষষ্ঠ । নেদারল্যান্ডস সপ্তম । ফ্রান্স অষ্টম । জার্মানি নবম এবং ইতালি দশম স্থানে । টোকিও অলিম্পিক্সে ১টি সোনা , ২টি রুপা এবং ৪টি ব্রোঞ্জ সহ ভারত ৪৮ তম স্থানে । একটি ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে সর্বশেষ ৮৬তম স্থানে যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়া ।

সোনা জয়ী নীরজ চোপড়া

ভারত অলিম্পিক্সে প্রথম অংশগ্রহণ করে ১৯০০ সালে । ১২১ বছরের ইতিহাসে টোকিও অলিম্পিক্স ২০২০ তেই সর্বোচ্চ পদক লাভ ভারতের ।‌ পুরুষদের জ্যাভলিন থ্রোতে সর্বোচ্চ ৮৭.৫৮ মিটার ছুঁড়ে সোনা জিতে নিয়েছেন নীরজ চোপড়া । নীরজের আগে অলিম্পিক্সে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্টে সোনা তো দূরের কথা কোন‌ও পদক পর্যন্ত জিততে পারে নি ভারত । এর আগে পর্যন্ত ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে ভারতের সেরা পারফর্মেন্স ছিল ১৯৬০ এর রোম অলিম্পিক্সে পুরুষদের ৪০০ মিটার দৌড়ে মিলখা সিং এবং ১৯৮৪র লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সে মেয়েদের ৪০০ মিটার হার্ডলসে পিটি উষার চতুর্থ স্থান লাভ । অলিম্পিক্সে ব্যক্তিগত ইভেন্টে ভারতের হয়ে প্রথম সোনাটি আনেন অভিনব বিন্দ্রা । ২০০৮ এর বেজিং অলিম্পিক্সে পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টে সোনা জিতেছিলেন অভিনব ।

ব্রোঞ্জ জয়ী ভারতীয় পুরুষ হকি দল ।

অলিম্পিক্সে ভারতের সিংহভাগ পদক এসেছে একমাত্র হকি থেকে । এই পর্যন্ত হকিতে ভারত ৮টি সোনা , ১টি রুপা এবং ৩টি ব্রোঞ্জ সহ মোট ১২টি পদক জিতেছে অলিম্পিক্সে । ১৯২৮ এর লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্স থেকে ১৯৫৬ র হেলসিংকি অলিম্পিক্স পর্যন্ত টানা ছটি অলিম্পিক্সে সোনা জেতে ভারতীয় হকি দল । এই রেকর্ড এখনও পর্যন্ত ভাঙতে পারে নি কেউ । ১৯৮০ র মস্কো অলিম্পিক্সে শেষবারের মতো সোনা জেতে ভারতীয় হকি টিম । টানা একচল্লিশ বছর অলিম্পিক্সে পদক বর্জিত ছিল ধ্যানচাঁদের দেশ । যাঁকে বলা হত হকির জাদুকর । একচল্লিশ বছরের খরা কাটল ২০২০র টোকিও অলিম্পিক্সে । শক্তিশালী জার্মানিকে হারিয়ে পুরুষদের হকিতে ব্রোঞ্জ জিতল ভারত । মেয়েদের হকিতেও টোকিও অলিম্পিক্সে নজরকাড়া সাফল্য ভারতের । হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর গ্রেট ব্রিটেনের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে ব্রোঞ্জ থেকে ছিটকে গেলেও ১৩০ কোটি দেশবাসীর হৃদয় জিতে নিয়েছেন ভারতের লড়াকু মেয়েরা। অলিম্পিক্সের ইতিহাসে এইবার‌ই প্রথম বারের মতো সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছে ভারতের মহিলা হকি দল ।

ব্রোঞ্জ হাতছাড়া হলেও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে ভারতীয় মহিলা হকি দল ।

পৃথিবীতে জনসংখ্যায় দ্বিতীয় হয়েও অলিম্পিক্সে ভারতের পারফরম্যান্স এত হতাশাজনক কেন ? ১৯৮৪র লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্স থেকে কার্যত চিনের অলিম্পিক্স অভিযানের সূত্রপাত । টোকিও অলিম্পিক্সে পদক প্রাপ্তিতে চিনের স্থান দ্বিতীয় । ভারত আটচল্লিশ । নীরজ চোপড়া -মীরাবাই চানু-পিভি সিন্ধু- বজরং পুনিয়া- মনপ্রীত-সিমরনজিৎরা ১৩০ কোটি ভারতবাসীর মুখ রক্ষা করেছেন । তাঁদের জন্য আমাদের গর্বের শেষ নেই । টোকিও অলিম্পিক্স ২০২০ থেকে ভারত যে ইতিহাস তৈরি করল এখান থেকে শুরু করতে হবে । কীভাবে পরিকল্পনা নিলে অলিম্পিক্সের বিভিন্ন ইভেন্ট থেকে আরও বেশি বেশি করে পদক প্রাপ্তি নিশ্চিত হয় সেই পরিকল্পনা গ্রহণের দায়িত্ব সরকারের ।

Pictures credit – AP ( for feature image ) and twitter .


Leave a Reply

Your email address will not be published.