স্বামী বিবেকানন্দের আরেক নাম ‘ শক্তি ‘, শক্তির কখনও মৃত্যু হয় না


১৯০২ এর ৪ জুলাই রাত ৯ টা ১০ মিনিটে বেলুড় মঠে শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলেন তিনি । দেহ ছাড়লেন বটে কিন্তু আলো হয়ে বেঁচে র‌ইলেন আমাদের মধ্যে …

ভারতীয় দর্শনে মৃত্যু মানে জীবনের রূপান্তর মাত্র । রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলতেন এ ঘর থেকে ও ঘরে যাওয়া । তাই মহামানবদের তিরোধান দিবস পালনে আমাদের তেমন আগ্রহ নেই । তাঁদের আবির্ভাব ক্ষণটিকে নিয়েই গুণগ্রাহীদের যাবতীয় উৎসাহ । আজকের দিনটিতে যিনি শরীর ত্যাগ করেছিলেন তিনি চল্লিশ পেরোন‌ নি। চল্লিশের অনেক আগেই শিষ্যা এমা কালভেকে জানিয়েছিলেন , ‘ আমি চল্লিশ পেরুবো না । ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই বেলুড় মঠে নিজের শয়ন কক্ষে  রাত ৯ টা বেজে ১০ মিনিটে স্বামী বিবেকানন্দ যখন তাঁর পরম আকাঙ্খিত মহাসমাধিতে ডুব দিলেন তখন স্বামীজির বয়স মাত্র ৩৯ বছর মাস ২৪ দিন । যাঁর জিহ্বাগ্রে দেবী সরস্বতীর বাস তিনি তাঁর কথা রেখেছেন ।‌ চল্লিশ দেখার আগেই থুথুর মতো শরীরটাকে ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন , যেমনটি তিনি বলতেন ।

মহাপ্রস্থানের ৯৪ দিন আগে ভগিনী নিবেদিতাকে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘ আমার যা দেবার ছিল তা দিয়ে ফেলেছি , এখন আমাকে যেতেই হবে । ‘ তিনি দেশকে কী দিয়েছেন সমকালীন সমাজ তার মূল্যায়ণ করতে পারে নি । তাঁর স্বজাতি বাঙালি তো নয়‌ই ।‌ ৫ জুলাই  কলকাতার কোন‌ও সংবাদপত্রে স্বামী বিবেকানন্দের দেহাবসানের সংবাদ বের হয় নি । স্বামীজির স্মরণসভায় সভাপতিত্বের প্রস্তাব পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের দু’জন বিচারপতি । ভাবা যায় ! সমকালীন  লোকসমাজের স্থূলচক্ষে বোধ হয় এমনি করেই বিপ্লবী যুগপুরুষদের উপেক্ষা জোটে  ।

সমাধি প্রিয় নরেনকে আমৃত্যু কর্মমুখর করে রেখেছিল মহাকাল !

জীর্ণ-জড়-অচলকে  যুগধর্মের প্লাবনে ভাসিয়ে নিয়ে সমাজে নতুনের আবাহন করেন যে যুগপুরুষেরা তাঁরা ছক ভাঙেন ।‌ বাঁধা গত ভাঙেন । ছক না ভাঙলে  বন্ধ্যা সমাজের অন্ধকার গর্ভে আলোর বিপ্লব হয় না । স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন প্র্যাক্টিকাল বেদান্তের বিপ্লবী সন্ন্যাসী । তাঁর মধ্যে পাই সূর্যের সাত রঙ । গৃহী , যোগী , ভক্ত , বিপ্লবী , দেশপ্রেমিক , সমাজসেবক ,  রাষ্ট্রনেতা, খেলোয়াড় ,  যোদ্ধা , ছাত্র , যুবক – উত্তাল জীবন সমুদ্রে সবার জন্য‌ই লাইট হাউস হয়ে দেখা দেন স্বামী বিবেকানন্দ । স্বামীজির  জীবনচরিতে বিরোধাভাস আছে । কিন্তু এই বিরোধাভাস বিবেকানন্দের নাতিদীর্ঘ জীবনকে আরও বেশি অনবদ্য , অনুপম , বর্ণময় করে তুলেছে ।

বিবেকানন্দের জীবনী পাঠ করলেই আমরা বুঝতে পারব রক্তমাংসের মানুষটার আরেক নাম সাইক্লোন । মর্ত্যে ডাউনফল হ‌ওয়ার পর   ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন ছিল সাইক্লোনটির পরমায়ু  !

কর্ম থেকে পালিয়ে অনন্তে লীন হ‌ওয়ার বাসনা বিবেকানন্দের মধ্যে শৈশব থেকেই প্রবল । গুরুর কাছে চাইতেন‌‌ও তেমন । কিন্তু কর্মের থেকে যত পিছন ফিরতে গিয়েছেন কর্ম তত‌ই টেনে ধরেছে স্বামীজিকে । গুরুভ্রাতা-শিষ্য-ভক্তদের কাছে আক্ষেপ করেছেন কিন্তু কাজ শেষ না করে বিশ্রাম নেন নি । বিবেকানন্দের জীবনী পাঠ করলেই আমরা বুঝতে পারব রক্তমাংসের মানুষটার আরেক নাম সাইক্লোন । মর্ত্যে ডাউনফল হ‌ওয়ার পর   ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন ছিল সাইক্লোনটির পরমায়ু  । শরীর ছাড়ার দু’দিন আগেও বলেছেন , ‘ এই বেলুড়ে যে আধ্যাত্মিক শক্তির ক্রিয়া শুরু হয়েছে , তা দেড় হাজার বছর ধরে চলবে – তা একটা বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নেবে । ‘ এই সেই সন্ন্যাসী  যিনি মানুষকে ডেকে বলেছেন, ‘ তোমার মধ্যেই অনন্ত শক্তি । তুমি চাইলে সব কিছুই করতে পার । ‘  বিবেকানন্দকে আবিষ্কার করতে পারলে জগতের চরম দুর্বল মানুষ‌ও হতাশ হবে না । বিবেকানন্দের আরেক নাম তাই শক্তি । শক্তির কখনও মৃত্যু হয় না ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *