ভাড়া না বাড়লে বাসমালিক , পরিবহণ শ্রমিক এবং যাত্রী , ক্ষতি কিন্তু সবার‌ই


উত্তম দেব
লোকাল ট্রেন – মেট্রো বন্ধ । বাসে অপরিবর্তিত ভাড়ায় অর্ধেক যাত্রী । পথে নামানোর চেয়ে ঘরে বাস বসিয়ে রাখায় লোকসান কম মনে করছেন মালিকেরা । গুটিকয়েক সরকারি বাস ভরসা । ক্যাব,অটো চালকেরা ভাড়ার নামে গলা কাটছে যাত্রীদের । পপুলিজমের গুঁতোয় জনগণের এখন সত্যিই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা !

পপুলিজম জিনিসটা মন্দ না । কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে অতি ব্যবহারে যে কোনও ভাল জিনিস‌‌ও কার্যকারিতা হারাতে বাধ্য। শর্টকাটে পাবলিককে খুশি করতে সরকার নানা পপুলার দাওয়াই ঝাড়ে । তাতে কাজ‌‌ও হয় বটে কিন্তু পপুলিজম চরমে উঠলে তা পাবলিকের ভালর চাইতে খারাপ করে বেশি । বাম আমলে দেখতাম পৌনে এক টাকা ভাড়া বাড়লেই একটি ছোট বাম দলের কর্মীরা রাস্তায় বাসের সামনে শুয়ে পড়ে পিঠে পুলিশের লাঠির বাড়ি ডেকে আনত । এটা ছিল তাদের বাৎসরিক আন্দোলন । আমাদের দেশের মানুষ কোনও কিছুর দাম বাড়া পছন্দ করে না । গণতন্ত্রে মানুষ যা পছন্দ করে না তেমন কাজ করতে দশবার ভাবতে হয় মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে । পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারে আসে ২০১১ সালে । এই দশ বছরে অনেক কাকুতি মিনতির পর বোধ হয় একবার কি দু’বার খুব সামান্য ভাড়া সরকারকে দিয়ে বাড়াতে পেরেছিল বেসরকারি বাসের মালিকেরা ।

বাম আমলে ভাড়া বাড়ানোর ঝোঁক উঠলেই সংঘবদ্ধ ভাবে আন্দোলন-ধর্মঘটে নেমে সরকারকে নাকানিচুবানি খাইয়ে ভাড়া বাড়িয়েই ছাড়ত বাস মালিকদের সংগঠন গুলো । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে জাদু জানেন । তাঁর আমলে কী এক রহস্যময় কারণে বাস মালিকদের গলার আওয়াজ সর্বদা মিহি ও মোলায়েম থাকে । ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে বারে বারে ধর্মঘটে যাওয়ার তড়পানি দিয়েও দেখা যায় শেষমেশ পিছিয়ে আসেন তাঁরা । দিনের পর দিন ভাড়া না বাড়ায় বাসে চড়তে যাত্রীদের যে ভাল লাগত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সমস্ত ভালর‌ই একটা শেষ থাকে । পশ্চিমবঙ্গে বাস ভাড়া হচ্ছে সেই জিনিস যা না বাড়ালে বাস মালিক , কয়েক লক্ষ পরিবহণ শ্রমিক এবং যাত্রী – খারাপ সবার ।

বাস চালানোর থেকে বসিয়ে রাখায় এখন লোকসান কম মালিকদের ।

কিন্তু ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে পপুলিজমের বাঘের পিঠে একবার স‌ওয়ারি হলে নামা কঠিন । ভাড়া বাড়াইলে যদি বাঘে ধরে । এই যদির ভয় এড়ানো সরকারের পক্ষে কঠিন । ভাড়া বাড়ানোর প্রশ্ন উঠলেই সরকার গড়িমসি করে । সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গেলে পাছে লাঞ্ছনা জোটে কপালে এই ভয়ে বাস মালিকেরা চুপসে আছেন বটে কিন্তু তলে তলে ব্যবসাটাকে বসিয়ে দিচ্ছেন তারা । প্যান্ডেমিক পিরিয়ডে যে সব সেক্টর শোচনীয় ক্ষতির সম্মুখীন তার মধ্যে পরিবহণ একটি। সোওয়া এক বছর হয়ে গেল গণপরিবহণে অচলাবস্থা চলছে । পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে পরিবহণ আর পর্যটনের পক্ষে মাজা সোজা করে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব নয় । সাম্প্রতিক সরকারের থেকে যে ব্যবস্থাপত্র পরিবহণ মালিকদের জন্য দেওয়া হয়েছে এটা যে মালিকদের পেটে পরিপাক হবে না তা সরকার প্রধানের থেকে আর কেউ ভাল জানেন বলে মনে হয় না। কিন্তু ভাড়া বাড়ালে যদি ভাবমূর্তিতে টান লাগে তাই ভাড়া না বাড়ানোর পণ তিনি সহজে ভাঙবেন বলে মালুম হচ্ছে না ।

এদিকে জনগণের এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা । লোকাল ট্রেন – মেট্রো বন্ধ । বাসে অপরিবর্তিত ভাড়ায় অর্ধেক যাত্রী । বেসরকারি বাস মালিকদের জন্য পথে গাড়ি নামানো আত্মহত্যার নামান্তর । ফলে রাজপথ বেসরকারি বাস শূন্য । গুটিকয়েক সরকারি বাস ভরসা । তাতে দূরত্ব বিধি কী মানা হচ্ছে সবাই চাক্ষুষ করছেন । ম‌ওকা পেয়ে ট্যাক্সি ক্যাব আর অটো চালকেরা ভাড়ার নামে যেটা করছেন সেটা জুলুম ছাড়া আর কিছু না । মানুষ ঠেকায় পড়ে তাই স‌ইছেন । পপুলিজমের গুঁতোয় জনগণের এখন সত্যিই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা । এরপর দু’চার টাকা বাস ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে সরকারের পায়ে ধরে কান্নাকাটি করা ছাড়া আর কোন‌ও রাস্তা খোলা নেই জনগণের সামনে ।

Photo Credit – pinterest.com / flicker.com ,shutterstock.com for copyright free photos


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *