বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদ : যাঁর কব্জিতে হ্যান্ডকাপ পরাতে ব্যর্থ হয়েছিল ইংরেজ !


বিপ্লবী চন্দ্রশেখর ‘আজাদ’। ১৯০৬ এর ২৩ জুলাই আলিরাজপুর এস্টেটে জন্ম। ১৯৩১ এর ২৭ ফেব্রুয়ারি এলাহাবাদের অ্যালফ্রেড পার্কে আত্মবলিদান। ভারতের জাতীয় আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার অন্যতম মুখ। কিংবদন্তী বিপ্লবী। জীবদ্দশায় যাঁর কেশাগ্র ছুঁতে পারে নি ইংরেজ সরকারের পুলিশ। জন্মদিনে চন্দ্রশেখর তিওয়ারির,চন্দ্রশেখর ‘আজাদ’ হয়ে ওঠার গল্প –

কাশী বিদ্যাপীঠে পড়তে পড়তেই মহাত্মাজির ডাকে সাড়া দিয়ে পিকেটিং করতে পথে নেমেছিল উন্নাওয়ের এক কিশোর । তখন ১৯২১ । অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল ব্রিটিশ ভারতবর্ষ । সত্যাগ্রহ করে গ্রেফতার হল বছর পনেরোর সেই কিশোর। কিশোর সত্যাগ্রহীকে আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট জিজ্ঞেস করলেন – তোমার নাম কী ? ছোটখাটো গোলগাল চেহারার কিশোর উত্তর দিল – আজাদ । পিতার নাম ? উত্তর এল –আজাদ । সাকিন ? কিশোরটির জবাব – জেলখানা । রুষ্ট হাকিম হুকুম দিল এই বেয়াদবকে বেত মারো । পনেরোর বছরের কিশোরের শাস্তি জুটল পনেরোটি বেত্রাঘাত ! টিকটিকিতে হাত-পা বেঁধে কিশোরটির শরীরে গুনে গুনে পনেরো বার বেত মারল সিপাই । হাওয়ায় হিসহিস শব্দে তুলে এক- একেকটি বেত দেহে এসে আঘাত করতেই কিশোরটি চিৎকার করে বলছে ‘মহাত্মাজিকিজয়  ‘।‌ পনেরোটি বাড়ি । পনেরোবার গান্ধীর নামে জয়ধ্বনি । কিশোরটির পিতৃদত্ত নাম চন্দ্রশেখর । পদবি তিওয়ারি । কিন্তু সেদিন থেকেই চন্দ্রশেখর হয়ে গেল ‘আজাদ ‘ ।  ইতিহাস তাঁকে চেনে চন্দ্রশেখর আজাদ নামেই । 

ভারতের কিংবদন্তি বিপ্লবীদের অন্যতম চন্দ্রশেখর আজাদ । যিনি সহযোদ্ধাদের গর্ব করে বলতেন – ‘আজাদ ছিলাম। আজাদ আছি। আজাদ হয়েই মরব।‘ পঁচিশ বছরের নাতিদীর্ঘ বিপ্লবী জীবনে চন্দ্রশেখর আজাদকে কখনও ইংরেজের জেলখানায় বন্দী হয়ে কাটাতে হয় নি। ১৯৩১ এর ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে এলাহাবাদের অ্যালফ্রেড পার্কে পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে শহিদের মৃত্যু বরণ করেন আজাদ। গুলি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই  ‘ মাউজার ‘ পিস্তলের নলটি নিজের মাথায় ঠেকিয়ে শেষ বুলেটটি খরচ করেন চন্দ্রশেখর আজাদ। ইংরেজের পুলিশ যখন তাঁকে ছুঁতে পেল তখন আজাদ ‘ লাশ ‘ মাত্র। চন্দ্রশেখর তিওয়ারির প্রাণপাখি ততক্ষণে চির আজাদ হয়ে ইংরেজের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। 

চন্দ্রশেখর আজাদ ও তাঁর ব্যবহৃত পিস্তল ।

ব্রাহ্মণ পন্ডিত বংশের ছেলে। মা জাগ্রাণী দেবী চেয়েছিলেন বড় হয়ে ছেলে হবে মস্ত বড় পন্ডিত। কিন্তু ছেলে ভিড়ল গিয়ে বিপ্লবীদের দলে। কাশী বিদ্যাপীঠে পড়তে পড়তেই বয়স ষোলো পেরোনোর আগেই বিপ্লবী মন্মথনাথ গুপ্তার সৌজন্যে রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে পরিচয়। ‘হিন্দুস্তান রিপাবলিকান  অ্যাসোসিয়েশনের ‘ অন্যতম সংগঠক রামপ্রসাদ বিসমিলের হাত ধরেই চন্দ্রশেখর আজাদের বিপ্লবী জীবনের সূত্রপাত। ১৯২৫ এ ইতিহাস বিখ্যাত কাকোরী ষড়যন্ত্র মামলায় যখন নাম উঠল তখন আজাদের বয়স মাত্র ঊনিশ। উত্তরপ্রদেশের কাকোরীর কাছে ট্রেন থামিয়ে সরকারি টাকা লুঠ করেছিলেন এইচআরএ’ র বিপ্লবীরা। সেই দলে ছিলেন চন্দ্রশেখর আজাদ‌ও। দলের সবাই ধরা পড়লেও আজাদের নাগাল পায় নি ‌পুলিশ। কাকোরী কান্ডের পর পুলিশের ধরপাকড়ে ‘হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের‘ সংগঠন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে আবার নিজেদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন ফেরার বিপ্লবীরা। সংগঠনের হাল ধরেন চন্দ্রশেখর আজাদ। সামনে এগিয়ে আসেন ভগৎ সিং। ১৯২৮ এর ৮-৯ সেপ্টেম্বর দিল্লির কাছে ফিরোজ শাহ কোটলায় মিলিত হন বাংলা, পাঞ্জাব, বিহার এবং যুক্তপ্রদেশের বিপ্লবীরা। দলের নামের সঙ্গে সোস্যালিস্ট যুক্ত করে রাখা হয় ‘হিন্দুস্তান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন‘। 

এইচএসআরএ‘ র পরবর্তী অভিযান ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম ঘটনা। ১৯২৯ এর ৮ এপ্রিল সরকারের ট্রেড ডিসপিউট বিলের প্রতিবাদে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় আইনসভায় ধোঁয়া বোমা নিক্ষেপ। ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত দর্শক গ্যালারি থেকে হাউসের ফ্লোরে বোমা ছুঁড়ে চারদিকে ছিটিয়ে দেন লাল ইস্তেহার। পালিয়ে না গিয়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলতে বলতে স্বেচ্ছায় ধরা দেন দুই বিপ্লবী। ইশতেহারে বড় বড় করে লেখা ছিল ‘বধিরকে শোনাতে হলে জোরে আওয়াজ করতে হয়।‘ এই ঘটনার অভিঘাতে উথালপাথাল হয়ে যায় গোটা দেশ। ইংরেজের অহমিকা চুপসে দেয় কয়েকজন অকুতোভয় ভারতীয় যুবক। বিপ্লবীদের কোমর ভাঙতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সরকার। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় স্যান্ডার্স খুনের দায়ে ১৯৩১-এর ২৩ মার্চ ফাঁসি হয় বিপ্লবীত্রয় ভগৎ সিং, সুখদেব , রাজগুরুর। কিন্তু মামলার অন্যতম আসামী হিন্দুস্তান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের কমান্ডার ইন চিফ চন্দ্রশেখর আজাদের টিকি পর্যন্ত ছুঁতে ব্যর্থ ব্রিটিশ পুলিশের দুঁদে গোয়েন্দারা। আটাশের  ৩০ অক্টোবর থেকে আজাদের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে পুলিশ। একে একে ধরা পড়তে থাকেন সহযোদ্ধারা। কিন্তু আজাদ আজাদ‌ই থাকেন। বিপ্লবী শিব বর্মা তাঁর ‘শহীদ স্মৃতি‘ গ্রন্থে লিখেছেন ‘পূর্বে যখন আজাদকে পন্ডিতজি বলে সম্বোধন করে বলতাম যে তাঁকে ঝোলাতে মোটা রশি লাগবে , তখন সে নিজেরপিস্তল ধরে বলত ‘ এটা থাকা পর্যন্ত কার‌ও মুরোদ নেই যে, জীবিত পন্ডিতজির শরীর স্পর্শ করে।‘ 

আজাদের নিথর দেহ আলফ্রেড পার্কে ।

পন্ডিতজির জীবিত শরীর ইংরেজের পুলিশ স্পর্শ করতে পারে নি। চন্দ্রশেখরের কব্জিতে পরানোর মতো কোন‌ও হ্যান্ডকাপ তৈরি করতে পারে নি ইংরেজ সরকার। ১৯৩১-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি এলাহাবাদের অ্যালফ্রেড পার্কে ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশের মুখোমুখি হয়ে লড়তে লড়তে প্রাণ দিলেন বছর পঁচিশের চন্দ্রশেখর ‘আজাদ ‘। গাছের আড়ালে লুটিয়ে পড়ল নিথর দেহ। আজাদের রক্ত শুষে নিল দেশের মাটি। স্বাধীনতার পর অ্যালফ্রেড মুছে দিয়ে পার্কটির নাম রাখা হয় ‘আজাদপার্ক‘।


Leave a Reply

Your email address will not be published.