কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন বিস্ময় ভয়েস ক্লোনিং ! জাগাচ্ছে আশা এবং আশঙ্কা দু’ই


মানুষের জীবনযাত্রার সবখানেই এখন নাক গলাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা । আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স । এখন আপনার ভয়েসের ক্লোন‌ও তৈরি হয়ে যাবে সফটওয়্যারে । অঘটন পটিয়সীর নাম সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ! ভয়েস ক্লোনিং জাঁকিয়ে বসলে আশা যতটা ,আশঙ্কাও ঠিক ততটাই । ভয়েস ক্লোনিং নিয়ে একটি প্রতিবেদন

নারী কি পুরুষ প্রত্যেক মানুষের কন্ঠস্বরের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে । তাই না দেখেও আওয়াজ শুনে‌ই কাউকে শনাক্ত করতে পারি আমরা । একজনের কন্ঠস্বর আরেকজন নকল‌ও করতে পারে । সেই বিদ্যাকে ইংরেজিতে মিমিক্রি বলে । কিন্তু প্রযুক্তি যখন আপনার কন্ঠস্বরকে ক্লোন করে আপনাকেই শোনাবে তখন আপনার অনুভূতি কেমন হবে ? কন্ঠস্বর বা ভয়েসকে নকল করার প্রযুক্তি কিন্তু বাজারে এসে গেছে এবং তার বাণিজ্যিক প্রয়োগ‌ও শুরু হয়েছে । সমস্তটাই হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা artificial intelligence এর দৌলতে । অন্তর্জাল বা ইন্টারনেট , তথ্যপ্রযুক্তি এবং কম্পিউটারের পুরো জগতটাই দাঁড়িয়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতাকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে অথবা এটা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন জাতীয় কিছুতে পরিণত হয়ে মানুষকেই তার দাস বানিয়ে ফেলবে কিনা , তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়ে গেছে পৃথিবীতে ।

ভয়েস ক্লোনিং শুরু হতেই আশার পাশাপাশি আশঙ্কায় দুলছে সাইবার জগৎ । ভয়েস ক্লোনিং এমন একটি সফটওয়্যার , যা কয়েক মুহুর্তের মধ্যে আমার কন্ঠস্বরের যাবতীয় নাড়িনক্ষত্র টুকে নিয়ে আপনি ঠিক যেই স্বরে , যেই বাচনভঙ্গিতে বাক্য এবং শব্দ উপস্থাপন করে থাকেন ঠিক সেইভাবেই কোন‌ও টেক্সট পড়ে আপনাকে শুনিয়ে দেবে । নিজের কন্ঠস্বরের এই নকল শুনে আপনি টাস্কি না খেয়ে পারবেন না । যে ক‌’জন বাচিক শিল্পী বা ভয়েস আর্টিস্ট এখনও পর্যন্ত নিজের কন্ঠের ক্লোন শুনেছেন তাঁদের প্রত্যেকের‌ই এক‌ই অনুভূতি হয়েছে । আমেরিকার টেক্সাসের ভয়েস‌ আর্টিস্ট টিম হেলার তেমন‌ই একজন ।

ভয়েস ক্লোনিং বা কন্ঠস্বরের প্রতিলিপি তৈরি হচ্ছে একটি বিশেষ সফটওয়্যারের সাহায্যে । এই সফটওয়্যারটি প্রথমে আপনার কন্ঠস্বরের কিছুটা অংশ রেকর্ড করে নেবে । সেটা মিনিট খানেকের বেশি নয় । এবার আপনার কন্ঠস্বরটিকে স্ক্যান করতে করতে আপনার আওয়াজের নিজস্বতা , বাচনভঙ্গি এবং উচ্চারণের বৈশিষ্ট্য , যে লয়ে আপনি কথা বলছেন , আপনার স্বরের ওঠানামা এমনকি শ্বাস ছাড়ার ধরণটিও হুবহু সফটওয়্যারে টুকে নেবে । এর পরের ধাপটি আরও বিস্ময়কর । আপনি যদি ভয়েস‌ওভার আর্টিস্ট হন এই সফটওয়্যারটি নিজের ডিভাইসে আপলোড করে আপনাকে আর কষ্ট করে স্ক্রিপ্ট পড়ে ভয়েস রেকর্ড করতে হবে না । আপনি কিপ্যাডে যেমন যেমন লিখবেন তেমন তেমন আপনার গলায় পাঠ করে শুনিয়ে দেবে । এই করে‌ই কথা না বলে স্ক্রিপ্ট লিখে লিখেই ভয়েস দিয়ে দিতে পারবেন আপনি । শব্দ ও বাক্যের চরিত্র বুঝে বুঝে রাগ , ভয় , আনন্দ , বিরক্তি এবং প্রেম কিংবা বিরহের অনুভূতি‌ও প্রকাশ করতে সক্ষম এই সফটওয়্যার ।

কন্ঠস্বরের যে সব সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য মানুষের কানে ধরা পড়ে না , সেসবও অনায়াসে শনাক্ত করতে পারে সফটওয়্যার ।

ইতিমধ্যে‌ই নকল কন্ঠস্বর তৈরির ব্যবসা জমে উঠেছে আমেরিকায় । পেশাদার ভয়েস আর্টিস্টরা নিজেদের কন্ঠস্বর বেচে দিচ্ছেন কোন‌ও সংস্থার হাতে , যারা সেই কন্ঠস্বরের ক্লোন বানিয়ে তা থেকেই অসংখ্য ভয়েস‌ওভার তৈরি করে ফিল্ম , অ্যানিমেশন বা বিজ্ঞাপনে কাজে লাগাচ্ছে । এর ফলে যিনি ভয়েস আর্টিস্ট , তার পরিশ্রম কমে যাচ্ছে কিন্তু পারিশ্রমিকটা ঠিক‌ই থাকছে । আমেরিকায় নকল কন্ঠস্বর বা ভয়েস ক্লোনিং এর ব্যবসা করে যাঁরা সাফল্য পেয়েছেন তাঁদের একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত রূপাল প্যাটেল । ভয়েস ক্লোনিং করতে ভোকাল আইডি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন রূপাল । তিনি নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশন সায়েন্সের অধ্যাপক ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি এই ভয়েস ক্লোনিং অদূর ভবিষ্যতে ফিল্ম , বিজ্ঞাপন , অ্যানিমেশন , টেলিভিশন এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা । ভয়েস ক্লোনিং সফটওয়্যারের যে কোনও ভয়েসকে যে কোনও ভাষায় অনুবাদ করার সক্ষমতা রয়েছে । অর্থাৎ একজন বাঙালি বাচিক শিল্পীর ভয়েস ক্লোন করে তাঁর কন্ঠস্বরেই কোনও ইংরেজি বা হিন্দি স্ক্রিপ্ট ‘ ডাব ‘ করা যাবে এই সফটওয়্যারের সাহায্যে । যে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভয়েস ক্লোন করা চলছে তা একজন মানুষের কন্ঠস্বর সংক্রান্ত যাবতীয় বৈশিষ্ট্য নিরীক্ষণে এতটাই পটু যে আমাদের কান‌ও তার কাছে হার মানবে । মানুষের কানে ধরা পড়ে না এমন অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য‌ও শনাক্ত করতে পারে সফটওয়্যারটি ।

বাণিজ্যিক ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে শিল্পীদের আসল কন্ঠের কদর কমবে না তো ?

ভয়েস ক্লোনিং এর সুবিধা এবং বাণিজ্যিক ভবিষ্যত চিন্তা করে যেমন একটি মহল উল্লসিত তেমনি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা উদ্বিগ্ন এর অপব্যবহার নিয়ে । সাইবার ক্রাইম ঠেকাতে এমনিতেই দেশে দেশে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ , গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা এজেন্সি গুলি । তার উপর এই ভয়েস ক্লোনিং অপরাধীদের হাতে গিয়ে পড়লে তো ভারী বিপদের কথা । কন্ঠস্বর নকল করে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার সুযোগ যে অপরাধ মনস্করা ছাড়বে না সেই ব্যাপারে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই বিশেষজ্ঞ মহলে । যে কোনও বিখ্যাত ব্যক্তির কন্ঠস্বর নকল করে ভুয়ো ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে । পরিচিত কারও কন্ঠস্বর নকল করে আপনাকে যে কোন‌‌ও ধরণের বিপদ বা হয়রানির মধ্যে ফেলতে বেগ পেতে হবে না অপরাধীদের । বড় কোনও নেতা-মন্ত্রী-আমলার গলা নকল করে চিটিংবাজির ঘটনা বেড়ে যাবে সমাজে । পরিস্থিতি এই রকম দাঁড়ালে দূরে থাকা একান্ত প্রিয়জনের কন্ঠস্বর‌ ফোনে শুনলেও বিনা সংশয়ে বিশ্বাস করতে পারবে না মানুষ ।

আর‌ও একটা কথা । একজন শিল্পীর আসল কন্ঠস্বর যদি প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি নকল কন্ঠস্বরের ভেতরে হারিয়ে যেতে থাকে । যদি শিল্পীর আসল কন্ঠস্বর‌ই আদর এবং কদর হারাতে থাকে তবে কেমন হবে ব্যাপারটা ? ভয়েস ক্লোনিং বাজারে জাঁকিয়ে বসলে শেষ পর্যন্ত তা কন্ঠশিল্পীদের কর্মনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না তো ?

  • ফিচারটিতে ব্যবহৃত তিনটি ছবিই প্রতীকি ।
  • Photo Credit – ID/R &D , lastpen.com and smallbiz daily

One thought on “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন বিস্ময় ভয়েস ক্লোনিং ! জাগাচ্ছে আশা এবং আশঙ্কা দু’ই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *