ভাঙা কোমর ফের ভেঙেছে ‘ ইয়াস ‘, সমুদ্রে সমাধিই কি সুন্দরবনের অনিবার্য নিয়তি ?


বিশের ২০মে আমফান । একুশের ২৬ মে ইয়াস । ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস কি বাৎসরিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে সুন্দরবনে ? ২০০৯ এর আয়লার ক্ষতই কাটিয়ে উঠতে পারে নি সুন্দরবনের অর্থনীতি ।‌ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দুটি ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে বাঁধের পর বাঁধ ভেঙে চৌচির । নোনাজলে ডুবে গিয়েছে বিঘার পর বিঘা চাষের ‌জমি , মাছের পুকুর । আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাসযোগ্যতা হারাবে না তো সুন্দরবন ? ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত সুন্দরবন ঘুরে এসে লিখলেন নব্যেন্দু মৌলিক

সুন্দরবন। প্রকৃতির এক অনুপম, অনবদ্য সৃষ্টি। সুন্দরবন এক‌ই সঙ্গে সুন্দর এবং ভয়ঙ্কর ! সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, হোগলা, গোলপাতার ম্যানগ্রোভ অরণ্য । সমুদ্রগামী অসংখ্য নদীর জাল আর সমুদ্রের মাঝে অজস্র ছোট-বড়-মাঝারি ব-দ্বীপ। ছিন্নবিচ্ছিন্ন দ্বীপভূমি। সুন্দরবন মানে জঙ্গলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, জলে কুমির , গাছে গাছে মধুর চাক আর নদী-খাল-বিল-খাড়িতে মীনের ঝাঁক । সুন্দরবন মানে এ বেলায় জোয়ারে ভরা নদী তো ও বেলায় ভাঁটায় মজা খাল । সুন্দরবন মানে বনবিবি আর দক্ষিণ রায়ের থান আর মানুষের কঠিন জীবন সংগ্রাম । প্রতি মুহুর্তে প্রকৃতি আর হিংস্র জন্তুর সঙ্গে বোঝাপড়া করে বেঁচে থাকতে হয় সুন্দরবনের পরিশ্রমী মানুষকে । সঙ্গে উপরি পাওনা সরকারের উপেক্ষা । যুগ থেকে যুগান্তর ধরে এমনি করেই টিকে আছেন সুন্দরবনের মানুষ । কিন্তু আর কতদিন ? বছর বছর সামুদ্রিক ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঝাঁপটার মুখে আর কতদিন মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারবে সুন্দরবনের লড়াকু জনগোষ্ঠী ?

সুন্দরবনের একটি বড় অংশ বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অধীন। বাকিটা ভারতের। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার বড় অংশ সুন্দরবনের ভৌগোলিক সীমায় অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণের নামখানা, কাকদ্বীপ, বকখালি, ফ্রেজারগঞ্জ, পাথরপ্রতিমা, সাগরদ্বীপ, ঘোড়ামারা দ্বীপ থেকে উত্তরের হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি সবই সুন্দরবন। নৈসর্গিক শোভা আর বাঘ দর্শনে প্রতি বছর অনেক পর্যটক আসেন‌ সুন্দরবনে। বাঘের সন্ধানে নদীবক্ষে লঞ্চে রাত কাটিয়ে ফিরে যান তারা। পর্যটনের সূত্রে স্থানীয় মানুষের হাতে দুটো পয়সা এলেও অতিমারির জেরে দুই মরশুম ধরে সেই রোজগার বন্ধ । সুন্দরবনের মানুষের আয়ের মূল ও স্থায়ী উৎস চাষাবাদ , মৎস্য আহরণ এবং মধু সংগ্রহ । দুই চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত এই দুর্গম অঞ্চলের মানুষের একটা সুবিধা হল হাতের কাছেই রাজধানী কলকাতা ।তিলোত্তমার বিরাট বাজারে মাছ এবং সবজির একটা বড় জোগান আসে সুন্দরবন থেকে । কিন্তু কলকাতার রসদদার সুন্দরবন বাঁচবে তো ? বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াইটা যে দিন কে দিন অসম হয়ে উঠছে ।

সুন্দরবন : পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ , প্রকৃতির অনবদ্য দান ।

সুন্দরবনের মানুষের সামনে উদ্ভুত সমস্যার আশু প্রতিকার করতে ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতেই ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হ‌ওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের । যা কলকাতাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করবে । আমি হিমালয় সংলগ্ন উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স-তরাইয়ের মানুষ । একটু একটু করে একবারে উল্টোদিকের সাগর সন্নিহিত সুন্দরবনের ভালবাসাতে‌ও জড়িয়ে পড়ছি আমি। বছর তিনেক হল সংগঠনের সূত্রে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে আমার যাতায়াত । মানুষকে না জানলে সমাজের জন্য কাজ করতে যাওয়া বৃথা চেষ্টা মাত্র । সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রা , সেখানে প্রকৃতি ও মানুষের নিত্য দ্বৈরথ এবং সুন্দরবনের মানুষের প্রতি প্রশাসনের উপেক্ষা আমার চোখে যেভাবে ধরা পড়েছে তা তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক মনে করছি ।

কাজ নেই । বেঁচে থাকতে ত্রাণই ভরসা সুন্দরবনের মানুষের কাছে ।

সুন্দরবনের মানুষের দুর্ভোগময় জীবনযাত্রা উপলব্ধি করতে গেলে সুন্দরবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে একটু চলাফেরা করা দরকার। সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান ‘সাগরদ্বীপ’। সাগরদ্বীপের ‘গঙ্গাসাগর’ মেলায় প্রতিবছর ১৯-২০ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। মেলায় এত মানুষের সমাগম হয় দেখে কলকাতা থেকে মেলা প্রান্ত পর্যন্ত উন্নয়নে কোনো ত্রুটি রাখেনি রাজ্য সরকার। ঝকঝকে বড় রাস্তা তৈরী হয়েছে । নানাবিধ নাগরিক পরিষেবা, পানীয়জল, বিদ্যুৎ সবই কপিলমুনির আশ্রম পর্যন্ত পৌঁছেছে সেই রাস্তা ধরে । কিন্তু এটা সমগ্র সুন্দরবনের চিত্র নয় । এমনকি কপিলমুনির আশ্রম যে সাগর ব্লকের অন্তর্গত সেই ব্লকের অন্যত্র‌ই অবহেলার ছাপ সুস্পষ্ট। একজন পঞ্চায়েত প্রতিনিধির চলাফেরার গল্প শোনাই । পরিকাঠামোর অভাবে সুন্দরবনের মানুষের দিনযাপনের কষ্টটা বুঝতে সুবিধা হবে ।

‘গঙ্গাসাগর’ গ্রাম পঞ্চায়েতের পঞ্চায়েত সদস্য খোকন মাইতি। সাগরে সবার পরিচিত খোকা বাবু। সাদামাটা লোক। হাঁটুর উপরে ধুতি। পায়ে প্ল্যাস্টিকের চপ্পল। পঞ্চায়েতের মেম্বার বলে আলাদা করে চেনার উপায় নেই । গ্রাম বাংলার আর পাঁচজন কৃষিজীবীর বেশভূষা যেমন হয় তেমন‌ই । বাইরে পা দিলেই সঙ্গে একটি থলি রাখেন খোকাবাবু । তাতে গামছা মাস্ট । যে পথ পেরিয়ে ওনাকে গঙ্গাসাগর বা সাগরদ্বীপের মূল প্রান্তে আসতে হয় সেই ইট বিছানো ভাঙাচোরা খানাখন্দে ভরা সেই পথের স্থানে স্থানে হাঁটু সমান জলকাদা । বর্ষায় পরিস্থিতি কহতব্য নয় । জলের তোড়ে রাস্তায় পাতা ইট হামেশাই ভেসে যায় । ওই দুর্গম প্রান্তে সামান্য একজন গ্রামীণ জনপ্রতিনিধির ডাকে ব্লক অফিস থেকে লোক পাঠিয়ে রাস্তা মেরামত করা হবে সেই চিন্তাও বাতুলতার সামিল । অগত্যা অকুস্থলেই ধুতি ছেড়ে গামছা পরে রাস্তা সারাইয়ে নেমে পড়েন খোকাবাবু । এভাবেই পথ চলতে চলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন পঞ্চায়েতের এই মেম্বার । ভাঙা রাস্তা নিজ হাতে মেরামতি করতে করতেই গঞ্জে চলে আসেন তিনি।

সাগর ব্লক হল বাংলার সবথেকে ‘আইসোলেটেড’ একটি ‘আইল্যাণ্ড’ বা দ্বীপভূমি । কলকাতা থেকে সাগরদ্বীপের সরাসরি কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। কাকদ্বীপ অবধি সড়ক পথে এসে ‘লট-৮’ ঘাট থেকে নৌকা, ভেসেল বা লঞ্চে চেপে যেতে হবে কচুবেড়িয়া। এই কচুবেড়িয়া হল সাগরদ্বীপের প্রবেশ পথে সাগরের উপর একটি জেটি ঘাট। এছাড়াও আরও একটি পথে সাগরদ্বীপ যাওয়া যায়। সড়ক পথে কাকদ্বীপ ছাড়িয়ে নামখানা, সেখান থেকে জলপথে বেনুবন জেটিঘাট। অথবা একইভাবে চেমাগুড়ি জেটিঘাট। এরমধ্যে প্রথমটিই সবথেকে প্রচলিত। মাথায় রাখতে হবে এই রাস্তায় চলাচল সমুদ্র স্রোতের উপর নির্ভরশীল। জোয়ার এবং ভাঁটার মহাজাগতিক নিয়মের সাথে সম্পৃক্ত। জোয়ার হলে জলযান চলবে। ভাঁটা হলে জলযান স্থবির হয়ে থাকবে। অত‌এব বুঝতেই পারছেন সাগরদ্বীপের সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ কতটা কঠিন এবং প্রকৃতির মর্জির ওপর নির্ভরশীল । আয়েস-আলসেমি সুন্দরবনের মানুষের কাছে অতি দুর্লভ বিলাসিতা মাত্র । রাত ভোর হ‌ওয়ার আগেই বিছানা ছেড়ে জীবনযুদ্ধ শুরু করতে হয় তাঁদের । ঘর থেকে বেরিয়ে সামান্য দূরত্ব পেরোতেই বেলা কাবার । ঘাটে পৌঁছে দেখলেন জোয়ারের জল থিতোতে শুরু করেছে । শুরু হয়েছে ভাঁটা । নদী শুকিয়ে কাদা । জেটিতে বসে হা পিত্যেস করতে করতে সময় গুণতে হয় কখন আবার আসবে জোয়ার । জোয়ারের সাথে সাথে মানুষ গুলোর জীবনে জোয়ার আসে । ভাঁটার টানে ভাঁটা ।

জলের তোড়ে গুড়িয়ে গেছে সরকারি পরিকাঠামোর পাকা প্রাচীরও ।

২০২০ সালের গঙ্গাসাগর মেলায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । মেলার মাঠে এক ঘুগনি বিক্রেতার কাছে জানতে চাই ‘ বাড়ি কোথায় আপনার ‘ ? ঘুগনি বিক্রেতা জবাব দিয়েছিলেন ‘গোসাবা’। শুনে বলি , সামনেই তো ! কয়েকটি ব্লক দূরে এক‌ই জেলার মধ্যে । যাতায়াতে বেশি সময় লাগার কথা না। ঘুগনিওয়ালা বললেন ‘হ্যাঁ ! মাত্র ১০ ঘন্টা লাগে ‘ । মানুষটির ছোট্ট জবাব আমার শরীরে সেদিন ৪৪০ ভোল্ট কারেন্টের ঝটকা দিয়েছিল । জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতা ট্রেনে শুয়ে বসে ১০ ঘন্টা পার করতেই টায়ার্ড হয়ে যাই । আর পাশাপাশি এক দ্বীপ পেরিয়ে আরেক দ্বীপে নিজের ঘরে পা দিতেই এঁদের সকাল গড়িয়ে রাত্রি নেমে যায় ! অসংখ্য নদী বেষ্টিত বদ্বীপভূমি গুলিতে জীবনযাত্রা এতটাই কঠিন ।

‘ ইয়াস’ বিধ্বস্ত সুন্দরবন থেকে ছোট্ট একটি ত্রাণ কার্যক্রম সেরে সদ্য ফিরেছি । রিলিফ টিম নিয়ে গিয়েছিলাম কাকদ্বীপ ব্লকের কয়েকটি এলাকায়। কাকদ্বীপ শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিমি দূরে রবীন্দ্র গ্রাম পঞ্চায়েতের আলিপুর বুথের ১৩ নং পালট নামে একটি এলাকার কথা বলছি । যার ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ছোট্ট কালনাগিনী নদী। রয়েছে ম্যানগ্রোভ বনরাজি। নদী পেরোলেই পাথরপ্রতিমা ব্লক। কিন্তু পেরোনোর উপায় কই ! সেতু নেই। জলে কুমিরের ভয় । ফলে চোখের সামনে দেখা গেলেও বহু পথ ঘুরে ৮০ কিমি অতিক্রম করে গ্রামের মানুষ পৌঁছান পাথরপ্রতিমা। নদী পেরোলে পথ মাত্র ১ কিলোমিটারের । নদী পথ যে কেউ ব্যবহার করে না তা নয় । কিন্তু সেই পথ বিপদসংকুল ও কষ্টের । কাকদ্বীপ শহরের সাথে কাকদ্বীপ ব্লকের এই এলাকার যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে । অসুখ-বিসুখ , আপদ-বিপদে মানুষের কাছে ওপর‌ওয়ালাই ভরসা।

সুন্দরবনের মানুষের সিংহভাগ মৎস্যজীবী । মৎস্য আহরণ ও চাষ করেই তাঁদের জীবনধারণ । এখানে মূলতঃ তিন রকম ভাবে মৎস্য আহরণ হয় । প্রথমতঃ গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ। ট্রলার নিয়ে মাঝ সমুদ্রে গিয়ে দিনের পর দিন থেকে মাছ নিয়ে ডাঙ্গায় ফেরে মৎস্যজীবীরা । ঘূর্ণিঝড় উঠলে কাজ ফেলেই ট্রলার নিয়ে ঘরে ফিরে আসতে হয় । সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বিপদ ডেকে আনেন কেউ কেউ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফের সমুদ্রে পাড়ি দেয় তারা । দ্বিতীয়তঃ নদীতে জাল ফেলে মৎস্য সংগ্রহ করেন আরেক শ্রেণীর মৎস্যজীবী । ছোটো ছোটো ডিঙি নৌকা নিয়ে মাতলা, বিদ্যাধরী, কালনাগিনী, গৌড়েশ্বর, ইছামতী, ডাসা, রায়মঙ্গল প্রভৃতি নদীতে ভাসতে ভাসতে মৎস্য আহরণ এদের পেশা। জঙ্গল সংলগ্ন নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের পেটে যান এই জেলেরা । কুমিরেও খায় । এদের কাছে জীবনটা আক্ষরিক অর্থেই জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ । ইয়াস ঝড়ে অনেকেরই ছোট ছোট ডিঙি গুলো উড়িয়ে নিয়ে চুরমার করেছে । আরও এক জাতের মৎস্যজীবী আছেন , যারা এলাকার পুকুর বা খাঁড়িতে মৎস্য চাষ করেন। এঁরা কিছুটা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করেন । কিন্তু ইয়াসের ধাক্কায় খালবিল নোনা জলে ডুবে তাঁদের জীবিকাও বন্ধ । সুন্দরবনের মানুষের জন্য সবথেকে বিপজ্জনক জীবিকা মধু , কাঁকড়া ও কাঠ সংগ্রহ । বনের ভেতরে ঢুকে মৌমাছির চাক ভাঙতে গিয়ে কিম্বা বন সংলগ্ন নদীর ধারে কাদায় নেমে কাঁকড়া কুড়োতে গিয়ে অসাবধানতায় বাঘের খাদ্য হয় তারা । বনে গিয়ে আর ঘরে ফেরে না মরদ । সুন্দরবনের সাগর থেকে কাকদ্বীপ, নামখানা থেকে কুলতলি, হাসনাবাদ থেকে হিঙ্গলগঞ্জ, পাথরপ্রতিমা থেকে বকখালি – সর্বত্রই বিধবা গ্রামের দেখা মেলে। যে গ্রাম গুলোতে প্রতি ঘরেই কোন‌ও না কোন‌ও পুরুষ বাঘের হামলায় মারা গেছে ।

ইয়াসের এক পক্ষকাল পরেও নোনাজল সরে নি জমি থেকে ।

সামুদ্রিক ঝড় উপকূলবর্তী সুন্দরবনের জন্য কোনও নতুন উপদ্রব নয় । বাপ-ঠাকুরদার মুখে ঝড়ের গল্প শুনতে শুনতে সুন্দরবনের শিশুরা বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু যে ঝড় দশ বছরে একবার হ‌ওয়ার কথা সেই ঝড় যদি বছর বছর মাথার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে মানুষ গুলো কোথায় যাবে। ঝড়ে উড়ে বাড়িঘর , গোয়াল । উপড়ে যায় বড় বড় গাছ । আগাম সতর্কতার কারণে আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে উঠে যাওয়ায় প্রাণহানি এড়ানো গেলেও ঝড়ের পরে জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে মানুষের। ঝড়ের দোসর জলোচ্ছ্বাস । বাঁধ ভেঙে সমুদ্রের জল উপচে পড়ে ডাঙ্গায় । নোনা জলে প্লাবিত হয় নদী । সেই জলে ভেসে যায় চাষের জমি , পুকুর , খাড়ি সবকিছু । সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে থাকেন যারা , তারা বুঝবেন না সুন্দরবনের অর্থনীতিতে , সুন্দরবনের মানুষের জীবন-জীবিকায় কী মারাত্মক স্থায়ী ক্ষতি করে দিচ্ছে এই লবণাক্ত জল !

২০০৯ সালে প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘আয়লা’ সুন্দরবনের ব-দ্বীপ অঞ্চলের বিরাট ক্ষতি করে । নদী বাঁধ গুলো ভেঙে মাটিতে মিশে যায়। নোনাজল ঢুকে প্লাবিত হয় বিঘার পর বিঘা চাষের জমি । মিষ্টি জলের পুকুর । একবার জমিতে নোনাজল ঢুকলে মাটি কার্যত বন্ধ্যা হয়ে যায় । লবণাক্ত জমিতে ফসল ফলে না প্রায় ছয় বছর । পুকুরে নোনাজল মিশলে মিষ্টি জলের একটি মাছ‌ও আর বেঁচে থাকে না । মিষ্টি জলের পুকুরকে লবণ জলের প্রভাব মুক্ত করতে বছর পেরিয়ে যায়। ততদিন পর্যন্ত পুকুরে মিষ্টি জলের মাছের আবাদ বন্ধ রাখতে হয় । আয়লা পরবর্তী সুন্দরবনে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ শস্য ও খাদ্য উৎপাদনকারী থেকে পরিনত হয়েছিলেন সরকারি রেশন ও ত্রাণ প্রাপকে। ধীরে ধীরে এই ক্ষত কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন মাছ , মধু , চিংড়ি ও কাঁকড়া সম্পদে সমৃদ্ধ এই এলাকার মানুষেরা। আয়লার ক্ষত সামলে সামান্য উঠে দাঁড়াতেই ২০২০ এর ২০ মে রাতে ফের তাদের কোমর ভেঙে দিল ‘ আমফান ‘ ।

ঘূর্ণিঝড় আমফান যখন সুন্দরবনকে আঘাত করেছিল তখন গোটা পৃথিবী করোনা কাঁটায় বিদ্ধ । করোনার জেরে লকডাউন । আর লকডাউনের জেরে অর্থনৈতিক বিপর্যয় । রোজগার কমে যাওয়ায় সারা রাজ্যের মতো লকডাউন সুন্দরবনের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য‌ও অর্থাভাবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু করোনা কিম্বা লকডাউন কোনোটাই তাদের রোজগারের উৎস গুলো ধ্বংস করে দেয় নি , যা করে দিয়েছে আমফান । ‘ আমফান ‘ এর তান্ডবে তছনছ হয়ে যায় ম্যানগ্রোভ ভূমি । ভেঙে পড়ে অধিকাংশ নদী বাঁধ । সমুদ্রের নোনা জলে ভেসে যায় চাষের জমি, খাল, বিল, পুকুর । মাটিতে মিশে যায় অসংখ্য কাঁচাবাড়ি । মারা যায় অসংখ্য গবাদিপশু ও প্রাণীসম্পদ । ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ম্যানগ্রোভের প্রাকৃতিক প্রাচীর । মৃত্যু হয়েছিল অনেক বন্যপ্রাণের‌ও । আমফান সুন্দরবনের অর্থনীতি , জীবিকা ব্যবস্থার কোমর ভেঙে দেয় । ২০২০ এর মে মাস থেকে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় বহু মানুষ জীবিকা হারিয়ে সপরিবারে ত্রাণশিবিরে দিন অতিবাহিত করছেন । জমি লবণাক্ত । কৃষকের কৃষিকাজ বন্ধ । লোনা জল ঢুকে পুকুরের মাছ মরে গেছে । পুকুর মাছ চাষের অনুপযুক্ত । মাছ ধরার নৌকা হারিয়ে গেছে জলোচ্ছ্বাসে । ত্রাণশিবিরে ‌সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের ওপরেই কোন‌ও রকমে কাটছিল দিন । সুদিনের প্রতীক্ষায় যখন দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট সহ্য করছিল মানুষ গুলি তখনই আবার আঘাত করল ‘ ইয়াস ‘ । যাকে বলে মরার ওপরে খাড়ার ঘা , এ যেন ঠিক তাই ‌। সুন্দরবনের ভাঙা কোমর আবার ভেঙে দিল প্রকৃতি ।

আমফানের পর থেকেই ঘরে ফেরা হয় নি অনেক পরিবারের । পলিথিনের ছাউনির তলায় আশ্রয় ।

২০২০ এর ২০ মে আমফান । ২০২১ এর ২৬ শে মে ইয়াস । ওড়িশার বালেশ্বরে আছড়ে পড়া ইয়াস তেমনভাবে ছাপ ফেলেনি বদ্বীপভূমিতে । কিন্তু সুন্দরবনে বিপর্যয় ডেকে এনেছে জলোচ্ছ্বাস । পূর্ণিমার ভরা কোটাল আর তার সাথে ঘূর্ণিঝড় – দুইয়ের রাজযোটকে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি ! প্রবল জলচ্ছাসের জেরে একের পর এক বিরাট ঢেউ ভাসিয়ে দিলো সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আমফানের পর পর নতুন করে তৈরি হ‌ওয়া নদী বাঁধ গুলি আবার গেল গুড়িয়ে । এমনকি যে কটি ‘আমফান’ থেকে রক্ষা পেয়েছিল , এবার ভাঙল সেসব‌ও । ফের নোনাজলে ভাসল চাষের জমি, মাছের পুকুর । আবার ত্রাণ শিবিরে ছুটলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণেই তাদের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি আর প্রশাসনের দেওয়া পলিথিনের নিচেই তাদের সংসার ।

দুর্যোগের যেন বিরাম নেই সুন্দরবনে । ইয়াস গেল ২৬ মে । এরই মধ্যে আরও একটি জলোচ্ছ্বাস বা কোটালের ভ্রুকুটি। স্থানীয় মানুষের ভাষায় ‘ বান ‘। আগামী ২৬ জুন ফের ভরা কোটালে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় এখন দিনগুজরান করছে সুন্দরবনের মানুষ । শঙ্কিত প্রশাসনও। ‘একই বছরে দুবার বান হলে সুন্দরবনের আর কিছুই থাকবে না ‘ – এমনটাই আশঙ্কা গঙ্গাসাগর গ্রাম পঞ্চায়েতের বর্তমান উপপ্রধান হরিপদ মণ্ডলের। হরিপদবাবু একটানা দীর্ঘদিন গঙ্গাসাগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের দায়িত্ব‌‌ও সামলেছেন। তিনি জানালেন ,’ সমুদ্র ক্রমাগত এগিয়ে আসছে। আগে পাঁচ-দশ বছর পরপর একটি করে ঝড় হত । যতদিন যাচ্ছে তত সামুদ্রিক ঝড়ের সংখ্যা বাড়ছে। এখন যেন প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে । শেষ দুটি ঝড় সবচেয়ে ক্ষতি করেছে। ‘ হরিপদবাবুর কাছ থেকে জানলাম, ‘ আমফান ঝড়ে , বাতাসের গতি বেশি থাকলেও এতবড় জলোচ্ছ্বাস হয়নি। কিন্তু . ‘ ইয়াস ‘ এ যে জলোচ্ছ্বাস হয়েছে তা গত ৫০ বছরেও দেখেনি সাগরের মানুষ। উঁচু জায়গাতেও কোমর বা বুক সমান জল ছিল। সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকাগুলিতে একতলা বাড়ি সমান জল দাঁড়িয়ে ছিল। ‘ ‘এমন ভাবে লবন জল ঢুকে গিয়েছে যে সব জমি পুকুর নষ্ট হয়ে গিয়েছে । আগামীতে আমরা আর অন্ন-জল পাব না । ‘ আশঙ্কা হরিপদ বাবুর।একই আশঙ্কায় দিন কাটচ্ছেন উত্তর ২৪ পরগণার হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জের হাজার হাজার মানুষ ।

মাটির বাঁধ মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে নোনা জল ঢুকেছে জমিতে ।

সাগরে জোয়ার-ভাঁটার নিয়মেই জল কমে-বাড়ে সুন্দরবনের নদীগুলিতে৷ ফলে জলোচ্ছ্বাস সময় নোনা জলে প্লাবিত হয় সুন্দরবনকে বেষ্টিত করে রাখা মাতলা, বিদ্যাধরী, কালনাগিনী, রায়মঙ্গল, ডাসা, গৌড়েশ্বর, ইছামতী প্রভৃতি নদী। সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে নদীতে বান আসে। ভাসিয়ে দেয় নদীর পাড়ে থাকা গ্রামকেও। হিঙ্গলগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির শিক্ষা কর্মাধক্ষ্য তথা টাকি মিশন হাইস্কুলের শিক্ষক তুষার মণ্ডল। ‘ ইয়াস ‘ আছড়ে পড়ার তিনদিন আগে থেকেই ঘড়ছাড়া তিনি। ঠিক যেমন ঘর ছাড়া সাগরের খোকন মাইতি, হরিপদ মণ্ডলেরা। রাত দিন এক করে ত্রাণ শিবির চালাচ্ছেন তাঁরা। একটি লোকও যাতে অনাহারে না থাকে তার ব্যবস্থা করছেন। তুষারবাবুর‌ও আশঙ্কা ‘ আগামীতে এইসব এলাকা আর থাকবে না ‘ ! আমার বিস্ময়ের জবাব দিলেন বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যায় । তুষারবাবু বললেন , ‘নদীর জলরাশির নিচে পুরু চড়। সারাবছর জল থাকে খুবই কম। কিন্তু জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ভরাট সেই নদীগর্ভ উপচে পড়ে বিপুল নোনা জলে । বিরাট উচ্চতার প্রবল জলস্রোতে ভেসে যায় নদী । নদীপৃষ্ঠ ( river bed ) থেকে তুলনায় নিচে থাকা গ্রামগুলি খুব স্বাভাবিকভাবেই প্লাবিত হয়ে যায় জলে । ‘ ‘বেশিরভাগ নদী বাঁধ মাটির। ফলে জলোচ্ছ্বাসের চাপে তা ভাঙতে সময় লাগে না। নদীগর্ভে যত চড় পড়ছে নদী তত নিজের প্রস্থ বাড়াচ্ছে। নদী ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের দিকে। সুন্দরবনের বেশিরভাগ জনপদের ভৌগোলিক অবস্থান তিনদিকে নদী একদিকে সাগর। এরফলে নদী যদি তার প্রস্থ বাড়াতে থাকে, তাহলে অচিরেই স্থলভূমি চলে আসবে নদীর গ্রাসে। দুই নদী মিলে তৈরি হবে মহানদী । আর নদী মধ্যস্থ গ্রামের মানুষ হারাবে তাদের সবকিছু। ‘ এমনটাই ব্যাখ্যা তুষারবাবুর।

কিন্তু এই ভয়ঙ্কর পরিণতি থেকে সুন্দরবনের মানুষকে রক্ষা করার কোন‌ও উপায়‌ই কি আমাদের হাতে নেই ? হাত গুটিয়ে বসে থেকে নিয়তির হাতে সুন্দরবনের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে ছেড়ে দেবো কি আমরা ? রাষ্ট্রের পরিকল্পনাবিদেরা কি সুন্দরবনের মানুষের জন্য কোনও সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি তৈরি করবেন না ? হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের ঠিক উলটো পাশেই বাংলাদেশ। একই নদী দুই দেশেই প্লাবন ঘটিয়েছে । কিন্তু বাংলাদেশের দিকে নাকি ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে । এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা । একের পর এক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে বাংলাদেশের সরকার এক সময় বুঝতে পেরেছে জলোচ্ছ্বাসের আঘাত স‌ইতে সক্ষম এমন শক্তিশালী নদী বাঁধ তৈরি করা দরকার । এর পরেই সুন্দরবন অঞ্চলের নদীগুলিতে পাকা কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ সরকার । বাংলাদেশের সুন্দরবনে কংক্রিটের বাঁধ কিন্তু জলোচ্ছ্বাস জনিত ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে সামাল দিতে সক্ষম বলে প্রমাণিত হয়েছে ।

একটা কথা মনে রাখা দরকার ভৌগলিক ভাবে কলকাতাও কিন্তু বৃহত্তর সুন্দরবনের অংশ । সুন্দরবন ডুবে গেলে কলকাতা বাঁচবে এই কুহকে থাকবেন না । কলকাতা সহ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিরাট অংশকে বাঁচাতে চাইলে যে কোনও মূল্যে এর পশ্চাদভূমি প্রাচীরতুল্য সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে । উপর চালাকি কাজকর্ম দিয়ে সুন্দরবনকে বাঁচানো সম্ভব নয় ।

সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণের কাজ কিছু হয় নি বললেই চলে । অধিকাংশ এলাকায় বাঁধ কাঁচা মাটির এবং উচ্চতায় স্বল্প ও কাঠামোগত ভাবে দুর্বল । সুন্দরবন ডেল্টার যা ভৌগলিক জটিলতা তাতে একটা ‌দুটো নদীতে পাকা বাঁধ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না । প্রয়োজনে কংক্রিটের বাঁধের জাল তৈরি করে সুন্দরবনকে আশু বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হবে । জানি এই ধরণের মেগা প্রোজেক্টের পেছনে হাজার হাজার ‌কোটি টাকার ধাক্কা । কিন্তু সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল যদি অদূর ভবিষ্যতেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে দাঁড়ায় আর তার জেরে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষ সুন্দরবন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে কলকাতার চারপাশে ভিড় জমায় , তখন কী হবে ? একটা কথা মনে রাখা দরকার ভৌগলিক ভাবে কলকাতাও কিন্তু বৃহত্তর সুন্দরবনের অংশ । সুন্দরবন ডুবে গেলে কলকাতা বাঁচবে এই কুহকে থাকবেন না । কলকাতা সহ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিরাট অংশকে বাঁচাতে চাইলে যে কোনও মূল্যে এর পশ্চাদভূমি প্রাচীরতুল্য সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে । উপর চালাকি কাজকর্ম দিয়ে সুন্দরবনকে বাঁচানো সম্ভব নয় । আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘ জাগ্রত নিদ্রা ‘ যদি অগত্যা না‌ই ভাঙে তবে সুন্দরবনের মানুষের জন্য একমাত্র বনবিবি‌ই ভরসা ।

ছবি – হুমাইপুর প্রকাশ ফাউন্ডেশন সূত্রে প্রাপ্ত ।

  • লেখক পরিচিতি : নব্যেন্দু মৌলিক । সমাজকর্মী । হুমাইপুর প্রকাশ ফাউন্ডেশনের রাজ্য কমিটির সভাপতি । উত্তরের ডুয়ার্স থেকে দক্ষিণের সুন্দরবন – রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় পীড়িত-দুর্গত মানুষের কল্যাণে কাজ করে চলেছে তাঁর সংগঠনটি ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *