এবার কি ভারতকে নিয়ে অন্য খেলা চিনা ড্রাগনের ?


উত্তরবঙ্গে একের পর চিনা এজেন্ট গোয়েন্দাদের জালে ! কী উদ্দেশ্য চিনা অনুপ্রবেশকারীদের ?

অরুণ কুমার , শিলিগুড়ি : উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ি,ভারত-নেপাল সীমান্ত ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এলাকা , যাকে ভূ‌-রাজনৈতিকগত ভাবে চিকেন নেক করিডোর‌ও বলা হয় – বরাবরই স্পর্শকাতর এই অঞ্চল দেশের প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মাথাব্যথার কারণ। এতদিন পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশ ও নেপাল হয়ে আইএস‌আই এজেন্টদের যাতায়াতের করিডোর হিসেবেই ভাবা হত চিকেন নেক করিডোরকে । কিন্তু সাম্প্রতিক ছয় মাসে শিলিগুড়ি থেকে মালদহ পর্যন্ত এলাকায় ছয়জন সন্দেহভাজন চিনা এজেন্ট ধরা পড়ার ঘটনায় এই এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে অন্য রকম ভাবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন দেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা । হিমালয় সংলগ্ন উত্তরবঙ্গে চিনা সিক্রেট সার্ভিসের নজর পড়েছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পেয়েছে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা এজেন্সি গুলি ।

ধৃত চিনা এজেন্টদের জেরা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ভারতের গোয়েন্দাদের হাতে । মালদহের মালিক সুলতানপুর এলাকায় বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকার সময় বিএসএফের হাতে ধরা পড়া চিনা নাগরিক হান চুন‌ওয়েইয়ের পরিচয় ও গতিবিধি জানার পর গোয়েন্দা আধিকারিকেরা নিশ্চিত যে, এই এলাকায় রীতিমতো সক্রিয় হয়ে উঠেছে চিনা সার্ভিস । চিনের সেনা পরিচালিত চুন শি গং চেং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক চুন‌ওয়েই । বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রে চিনা সেনা বাহিনীর সঙ্গে সংযোগ থাকায় চুন‌ওয়েইকে চিনের একজন সাধারণ নাগরিক বলে মনে করছেন না তদন্তকারী আধিকারিকেরা । প্রতিবেশী বাংলাদেশে চুন‌ওয়েইয়ের একাধিক সোর্স আছে বলে মনে করা হচ্ছে ।

মালদহের সীমান্ত থেকে ধৃত চিনা অনুপ্রবেশকারী হান জুন বে ।
চিনা এজেন্ট হান জুন বে ।
চিনা অনুপ্রবেশকারীর কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া নানা সামগ্রী ।

চুন‌ওয়েইয়ের কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ উদ্ধার হয়েছে । ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করে ভেতরের তথ্য জানার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা । পাশাপাশি বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে চুন‌ওয়েইয়ের বন্ধুর ব্যাপারেও খোঁজ খবর শুরু করেছেন নিরাপত্তা আধিকারিকেরা । বাংলাদেশে ধৃতের কী ধরণের নেটওয়ার্ক রয়েছে তা জানার‌ও চেষ্টা করা হচ্ছে । শনিবার চুন‌ওয়েইকে মালদহ জেলা আদালতে তোলা হলে ধৃতকে ১৮ জুন পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে ধৃত দুই চিনা অনুপ্রবেশকারী

মার্চে বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে জা নুন এবং হাই ল্যাং নামে দুই চিনা নাগরিককে গ্রেফতার করেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা । দু’জনের‌ই ভারত ভ্রমণের কোনও বৈধ ভিসা ছিল না । এদের কাছ থেকে আধার কার্ড উদ্ধার হ‌ওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয় । চিনের সিচুয়ান প্রদেশের দুই নাগরিকের কাছে কীভাবে ভারতের আধার কার্ড এল তা ভেবে পাচ্ছেন না গোয়েন্দারা । তবে নেপালকেই চিনা এজেন্টদের বেস বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে । চিন থেকে অবাধে নেপালে যাতায়াত করা যায় । ধৃত চিনা নাগরিকেরা নেপাল হয়ে উত্তরবঙ্গে ঢুকছে বলে গোয়েন্দাদের অনুমান । নেপালের বাসিন্দাদের সঙ্গে চেহারায় সাদৃশ্য থাকার সুযোগ নিচ্ছে চিনা এজেন্টরা । নেপালে তাদের বড় নেটওয়ার্ক‌ও থাকতে পারে । নেপাল থেকে ভারতে প্রবেশের সাথে সাথেই কোন‌ও না কোনও কৌশলে ভারতীয় ভোটার কার্ড ও আধার কার্ড বানিয়ে নিচ্ছে চিনারা । নেপালে ঢোকার পর পশ্চিমবঙ্গের পানিট্যাঙ্কি-খড়িবাড়ি এলাকা এবং বিহার ও ইউপির নেপাল-ভারত সীমান্ত দিয়েও চিনাদের ভারতে অনুপ্রবেশ করার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে ।

চিনা এজেন্টদের কাছ থেকে যত আধার কার্ড বাজেয়াপ্ত হয়েছে তার সব গুলিতেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন ঠিকানায় ব্যবহার করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের দৃষ্টি ফাঁকি দিতে কিছুদিন পরেই আধার কার্ডে ঠিকানা পরিবর্তন করেছে চিনারা ।ওলি সরকারের আমলে নেপাল চিনের কাছে খোলা হাট হয়ে গেছে । নেপাল জুড়ে এখন চিনা সিক্রেট সার্ভিসের লোকেরা জাল পেতেছে । লক্ষ্য ভারতের ওপর নজরদারি চালানো । নেপাল-ভারত সীমান্তের ‌নেপাল ভূখন্ডে চিন ৩০-৪০টি স্টাডি সেন্টার চালাচ্ছে বলে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা গুলি খবর পেয়েছে । এইসব সেন্টারে মান্দারিন ভাষার পাশাপাশি হিন্দি , ভোজপুরি , বাংলা, নেপালি এবং ইংরেজি ভাষার প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে ।‌ ১৮ থেকে ৩৬ বছরের নেপালি যুবকযুবতীদের মান্দারিন ভাষা শিখিয়ে পড়িয়ে চিনের এজেন্ট বানানোর প্রকল্প চালানো হচ্ছে বলে পাকা খবর আছে ভারতের নিরাপত্তা এজেন্সি গুলির হাতে ।

ষাটের দশকের সূচনা থেকেই চিনের সঙ্গে ভারতের গুরুতর সীমান্ত বিবাদ থাকলেও এতদিন ভারতের ভেতরে এজেন্ট ঢুকিয়ে তৎপরতা চালানোর তেমন কোনও ট্র্যাক রেকর্ড ছিল না চিনের । একের পর এক অবৈধ চিনা অনুপ্রবেশকারীর গ্রেফতারের পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তবে কি এবার আইএসআইয়ের মতোই ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে অন্তর্ঘাত মূলক কাজ শুরু করে দিল চিন‌ও ?

মালদহ জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে পরপর কয়েকজন চিনা নাগরিক ধরা পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের। প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ করে চিনারা মালদহ সীমান্তকে ব্যবহার করতে শুরু করল কেন ? বাংলাদেশকে ব্যবহার করে চিনা সিক্রেট সার্ভিস ভারতের ওপর নজরদারি শুরু করল না তো ? মালদহের মহদিপুর সীমান্তে ধরা পড়া চিনা নাগরিক বছর ৩৬ এর হান জুন বে ‘র কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিন ডিভাইস উদ্ধার করে বিএসএফ । জেরার মুখে গোয়েন্দাদের কাছে হান জুন বে স্বীকার করেছে, ইতিমধ্যেই জাল নথি ব্যবহার করে ১৩০০ ভারতীয় সিম কার্ড চিনে নিয়ে গিয়েছে সে । অন্যের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয় সিম গুলো । এর আগে একাধিক অভিযোগে হান জুন বে’র আরেক সাগরেদ সান জিয়াং কে গ্রেফতার করে এটিএস ( Anti Terrorists Squad ) লখনৌ । সান জিয়াংকে জেরা করেই হান জুন বে ‘র নাম জানতে পারে তদন্তকারীরা । তার বিরুদ্ধে ব্লু কর্নার নোটিশ জারির প্রক্রিয়াও শুরু করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি । তার আগেই ঘটনাচক্রে গোয়েন্দাদের জালে এই চিনা দুষ্কৃতী ।

পশ্চিমে ভারতের শত্রু পাকিস্তান । মাথার ওপর উত্তরে বৃহৎ শক্তি চিন ভারতকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে চায় । ভারতের ক্ষতি সাধনে চিন-পাকিস্তান দোস্তির কথা কার‌ও অজানা নয় । ষাটের দশকের সূচনা থেকেই চিনের সঙ্গে ভারতের গুরুতর সীমান্ত বিবাদ থাকলেও এতদিন ভারতের ভেতরে এজেন্ট ঢুকিয়ে তৎপরতা চালানোর তেমন কোনও ট্র্যাক রেকর্ড ছিল না চিনের । একের পর এক অবৈধ চিনা অনুপ্রবেশকারীর গ্রেফতারের পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তবে কি এবার আইএসআইয়ের মতোই ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে অন্তর্ঘাত মূলক কাজ শুরু করে দিল চিন‌ও ?

নিজস্ব ফটো ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *