অনেক হিসেব কষেই গেরুয়া ছেড়ে ফের নীলসাদা জার্সি ধরলেন মুকুল রায়


বিশেষ প্রতিবেদন : মুকুল রায়ের ঘর ওয়াপসি । সপুত্র তৃণমূলে ফিরলেন চাণক্য । বিধায়ক হিসেবে শপথ নেওয়ার দিন থেকেই জল্পনা । অনেকেই ভেবেছিলেন আর‌ও একটু সময় পার করে ফুল বদল করবেন মুকুল । কিন্তু বিজেপির পরাজয়ের দেড় মাস পেরোনোর আগেই গেরুয়া খোলস ছেড়ে ফের নীলসাদা জার্সি গায়ে তুলে নিলেন তিনি । সঙ্গে ছেলে শুভ্রাংশুও । ২০১৭র ৩ নভেম্বর বিজেপিতে নাম লিখিয়েছিলেন মুকুল রায় । তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন ২০২১ এর ১১ জুন । ফের পাল্টি মারার সময় মুকুল বিজেপির বিধায়ক ও সর্বভারতীয় সহসভাপতি । বিধায়ক পদ , দলীয় পদ এবং প্রাথমিক সদস্যতা ত্যাগ না করেই সরাসরি পুরোনো দলে ঢুকে পড়লেন তিনি ।

ঘরে ফিরলেন মুকুল রায়। সাড়ে তিন বছর পর আবার এক ফ্রেমে মমতা-মুকুল-শুভ্রাংশু ।

তৃণমূলের দফতরে পিতাপুত্রের দলবদল পর্ব চলার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল । বিজেপিতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল মুকুল । তৃণমূল মুকুলের রাজনৈতিক ঘর তো বটেই । জন্মলগ্ন থেকেই তৃণমূলের সঙ্গে মুকুল রায় । নির্বাচন কমিশনে তৃণমূলের রেজিস্ট্রেশনের সময় দলের হয়ে যাবতীয় নথিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন মুকুল রায়‌ই । মুকুলকে বলা হত তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড । সংগঠন গড়া , ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট এবং দল ভাঙানোয় মুকুল রায়ের হাতযশ নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই । তৃণমূলের রাজনীতিতে অভিষেকের অভিষেক হ‌ওয়ার আগে পর্যন্ত দলের সংগঠনের এ টু জেড দেখতেন মুকুল রায়‌ই । তৃণমূলের অন্দরে অভিষেকের উত্থান আর মুকুলের পতনটা খুব সুস্পষ্ট । কোনও আদর্শের কারণে নয় মমতার পরেই দলের রাশ ভাইপোর হাতে চলে যেতে দেখে ক্ষমতা হারিয়ে বেসুরো বাজতে থাকেন মুকুল রায় । এছাড়াও ২০১৪র লোকসভা নির্বাচনের পরে সারদা স্ক্যামের ডামাডোলে যখন সিবিআইয়ের ধরপাকড় শুরু হল তখন থেকেই তৃণমূলের ভেতরে মুকুল জামানার অবসানের শুরুয়াৎ । মদন মিত্র সিবিআইয়ের জালে ধরা পড়ার পর তৃণমূল সুপ্রিমো পর্যন্ত ধরে নিয়েছিলেন যে সিবিআইয়ের পরের শিকার মুকুল । কিন্তু কী করে চাণক্য সিবিআইয়ের খপ্পর থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হলেন , সেটা আজ‌ও একটা রহস্য ।

অবশেষে বিজেপির খোলস ছাড়লেন মুকুল ।

২০১৫ থেকেই মমতার সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে মুকুল রায়ের । এক সময় সর্বভারতীয় সহসভাপতির পদটিও খোয়া যায় । সেই সময় তৃণমূল না ছাড়লে একটা বড় সময় জুড়ে তৃণমূলের অন্দরে মুকুলের কোনও সাড়াশব্দ ছিল না । ২০১৬র বিধানসভা নির্বাচনের আগে আবার মুকুলের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । মুকুল তৃণমূলে ফের সক্রিয় হয়ে উঠলেও আগের জায়গা আর ফিরে পান নি । তৃণমূলে মমতার একমাত্র রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ততদিনে তা স্পষ্ট । এই তিক্ত বাস্তব মেনে নিতে বাধ্য হলেও নিজের ইগোকে ঠান্ডা করতে পারেন নি তৃণমূলের প্রাক্তন সেকেন্ড ইন কমান্ড । তাই ফের দলের ভেতরে সুপ্রিমোর সঙ্গে দূরত্ব এবং এক সময় তা বাড়তে বাড়তে বিচ্ছেদ । ২০১৭র ৩ নভেম্বর দিল্লিতে বিজেপিতে যোগ দেন মুকুল রায় । তার আগে ১১ অক্টোবর রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি ।

ছবিই যখন কথা বলে…

প্রথম দিন থেকেই রাজ্য বিজেপির অন্দরে মুকুল-দিলীপ ঠান্ডা লড়াই । তারপরেও বিজেপি মুকুলকে মুকুল‌ও বিজেপিকে ব্যবহার করেছে । মুকুল রায় ভালো বক্তা নন । জনমোহিনী ক্ষমতার লেশ মাত্র‌ও তাঁর নেই । কিন্তু রাজনীতিতে ঘোড়েল বলতে যা বোঝায় মুকুল ঠিক তাই । বেফাঁস কথা বলার রোগ তাঁর নেই । কিন্তু পর্দার আড়ালে কলকাঠি নাড়িয়ে অন্যের ঘরে ভাঙতে জুড়ি নেই কাঁচরাপাড়ার রায়বাবুর । তৃণমূল ভাঙিয়ে দলে দলে লোক এনে দল ভারি করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করেছিল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব । মুকুল বিজেপির ভেতরে খুব একটা স্বস্তিতে না থাকলেও সাধ্য অনুযায়ী তৃণমূল ভেঙে বিজেপির কলেবর বৃদ্ধি করেছেন তিন বছরে । হিসেব বুঝে ২০২০ থেকেই তলে তলে মুকুলের সঙ্গে ফের বোঝাপড়ায় আসার চেষ্টা শুরু করে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুকুল হিসেবি মানুষ। মুখ বন্ধ কিন্তু পেটে পেটে বুদ্ধি । গত বছরের মাঝামাঝি একবার ফুল বদলের পরিকল্পনা করেও বিজেপির সর্বভারতীয় সহসভাপতির পদ পেতেই পিছু হটেন মুকুল রায় । ভোটের প্রাক্কালে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মুকুলকে একপ্রকার নিষ্ক্রিয় করে ফেলতেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন ধুরন্ধর এই রাজনীতিক । ২রা মে বিজেপি ক্ষমতায় এলে ১১ জুন সপুত্র মুকুলের ঘর ওয়াপসি যে ঘটত না তা দুধের শিশুর‌ও অজানা নয় । রাজনীতিতে যো জিতা ওহি সিকান্দার । অনেক হিসেব কষেই পুরোনো দলে ফিরলেন বছর ৬৭র মুকুল । পোড় খাওয়া মুকুল রায় ভালোই জানেন, তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড মুকুল রায় এখন নেহাতই অতীত । অনেক ভেবে চিন্তে তৃণমূলের ভবিষ্যতের হাতে ছেলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে সঁপে দেওয়াই আশু কর্তব্য বলে মনে করেছেন চানক্য ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *