অতিমারি কাল : ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষক সমাজ ও অভিভাবকদের করণীয়


শুধু অর্থনীতি , ব্যবসা-বাণিজ্য , কর্মসংস্থান‌ই নয় ভয়ঙ্কর অতিমারি স্থবির করে দিয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও । কিন্ডারগার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় – সব বন্ধ । পর পর দু’বছর মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের মতো প্রবেশিকা পরীক্ষা বন্ধ । ছাত্রছাত্রীরা হতাশ । আত্মঘাতী কেউ কেউ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনোবল অটুট রাখতে অভিভাবককুল থেকে শিক্ষকমহল – করণীয় কি কিছুই নেই ? উত্তর খুঁজলেন ডঃ সুকান্ত ঘোষ

সরকার ও শিক্ষা দপ্তরের পূর্ববর্তী ঘোষণা অনুযায়ী ছাত্র-ছাত্রী , অভিভাবক এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মনে এই ধারণা হয়েছিল যে এবার হয়তো মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। কিন্তু আট জুন সরকার জানিয়ে দিল যে এবারের মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হবে না। পরবর্তীতে মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলো জানিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পাশ ফেল এবং মূল্যায়নের পদ্ধতি কী হবে । মূল্যায়ন পদ্ধতি যাই হোক , তা যে গড়পড়তা সবাইকেই উচ্চ নম্বর দিয়ে পাশ করিয়ে দেওয়ার মতো একটা সহজ রাস্তা হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে এ কূল , ও কূল দু কূল‌ই রক্ষা করতে চাইলে এই জাতীয় পদক্ষেপ ব্যতিরেকে সরকারের সামনে আর কী ভালো বিকল্প থাকতে পারে ? নিঃসন্দেহে যারা মেধাবী , উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও পরীক্ষায় অধিক নম্বর লাভের প্রত্যাশী এবং যোগ্য এতে তাদের মন খারাপ হ‌ওয়ার কথা । কিন্তু সেই মন খারাপ যাতে তাদের আত্মহত্যার কারণ না হয়ে ওঠে তা দেখার দায়িত্ব কার ?

করোনার জেরে থমকে শিক্ষা : হতাশা যেন আমাদের বাচ্চাদের আত্মঘাতের কারণ না হয়ে দাঁড়ায় ।

একজন মেধাবী ছাত্রী ইতিমধ্যেই ঝরে গেছে । ছাত্রীটি এক থেকে দশের মধ্যে র‌্যাঙ্ক করার ব্যাপারে নাকি নিশ্চিত ছিল । র‌্যাঙ্ক করা খুবই ভাল । কিন্তু জীবনে র‌্যাঙ্ক করাটাই কি সব ? বাচ্চা একটা মেয়ে । দুম করে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল । তাকে ধরে রাখতে পারলাম কেন আমরা ? এই ‘ আমরা ‘র মধ্যে মেয়েটির বাবা-মা , শিক্ষক-শিক্ষিকা, গণমাধ্যম এবং সমাজ – আমরা সবাই অন্তর্ভুক্ত । একটি আত্মহত্যা কিন্তু অনেক গুলো প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে । প্রশ্ন হল পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক নিয়ে প্রয়োজনের অধিক লাফালাফি করা হয় কি ? এই লকডাউনে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে অভিভাবক, শিক্ষক- শিক্ষিকাদের যতটা পাশে থাকা উচিত, ততটা তাঁরা থাকছেন কি ? ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ যাতে হতাশা থেকে চরম কোনও সিদ্ধান্ত না নেয় তা প্রতিরোধে অভিভাবক ও শিক্ষক মহলের যতটা সচেষ্ট থাকা উচিত ততটাই সচেষ্ট তাঁরা আছেন কি ? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সকলের‌ই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আরও দায়িত্বশীল হ‌ওয়া প্রয়োজন নয় কি ? গণমাধ্যম‌ও তো‌ ঢাকের বাওয়া । এ’দিকেও বাজে । ও’দিকেও বাজে । এই করোনা পরিস্থিতিতে ছাত্র সমাজকে দিশা দেখাতে কোন দায়িত্বশীল ভূমিকা তারা নিয়েছে ? আর সামাজিক মাধ্যমের তো ভালোর চেয়ে মন্দ‌ দিক‌ই বেশি । এই শাঁখের করাতটি কীভাবে ব্যবহার করে সাইড এফেক্টস গুলো কম করা যায়, সে ব্যাপারে অভিভাবকেরা তাঁদের করণীয় টুকু করছেন কি ?

দুনিয়া জুড়েই সমাজের ওপর অতিমারির ধাক্কাটা সর্বাত্মক । অর্থনীতি , ব্যবসা-বাণিজ্য , কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাও তছনছ হয়ে গেছে । প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব বন্ধ । সেই বিশের মার্চ থেকে । আমরা ভেবেছিলাম বিশ ফুরোলেই করোনার বিষ নামবে । আবার সব ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে । ছেলেমেয়েরা আবার স্কুল-কলেজের যেতে শুরু করবে । ক্লাসরুম গুলি আবার ছাত্রছাত্রীদের কলকাকলিতে ভরে উঠবে । কিন্তু আমাদের সব আশায় জল ঢেলে বিপুল বেগে ফিরে এল করোনা । যাকে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় ঢেউ । এবং কবে করোনা মুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরব আমরা ,‌ সেই নিশ্চয়তা টুকুই আর দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই বিশেষজ্ঞরা । শিক্ষা তো এখন শুধু গুরু গৃহে অধ্যয়ণ‌ই নয় । শিক্ষা হল সভ্যতার সেই ম্যারাথন রেস যা একটা প্রজন্মের হাত থেকে আরেকটা প্রজন্মের হাতে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মশাল তুলে দেয়। করোনা কিন্তু এই ম্যারাথনটিকেই থামিয়ে দিয়েছে প্রায় । দু-দুটি শিক্ষাবর্ষ জুড়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমিক – উচ্চমাধ্যমিক‌ই দুটি কেন্দ্রীয় বোর্ড ও অন্যান্য সমস্ত রাজ্যের বোর্ডের পরীক্ষা বন্ধ । উচ্চ শিক্ষা এবং উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও এক‌ই অবস্থা । কাজেই পরীক্ষা বন্ধ হ‌ওয়ার কষ্টটা কোন‌ও দু-একজন মেধাবী ছাত্রছাত্রীর একার নয় ।‌ কেউ পরীক্ষা নেওয়ার সাহস পাচ্ছে না । স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি গুলো খোলার সাহস পাচ্ছে না । এই পরিস্থিতিতে আমাদের রাজ্য সরকার স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার ঝুঁকি নেবে এই আশা ছিল খুবই ক্ষীণ । এবং ঘটল‌ও তাই । এই পরিস্থিতিতে একটি বাচ্চাটাও যখন নিজের অমূল্য জীবনটাকে শেষ করে দিচ্ছে খবর পাই তখন একজন শিক্ষাব্রতী হিসেবে আমার মনে অসংখ্য প্রশ্ন হাজির করে ।

এই অভিশপ্ত সময়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হতাশা দূর করার দায়িত্ব অভিভাবক থেকে শিক্ষক সমাজ,সকলের

বড়ই কষ্টের বাচ্চা মেয়েটির চলে যাওয়াটা। বাবা-মায়ের মনের অবস্থাটার কথা ভাবা যাচ্ছে না । মানুষ বেঁচে থাকে সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে । সেই সন্তান‌ই অকালে চলে গেলে জীবনটাই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে । মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট আউটের আগে-পরে এই ধরণের প্রতিটি মৃত্যুই সমাজের সামনে কিছু প্রশ্ন রেখে যায় । সমাজ সেইসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে ব্যর্থ হলে এই আত্মহত্যার ঘটনা কিন্তু চলতেই থাকবে । যতটুকু সংবাদপত্র এবং নিউজ চ্যানেল দেখে মনে হয়েছে মেয়েটি বাবা-মা ইচ্ছের মর্যাদা দিতে পারল না বলে আত্মহত্যা করেছে। নিঃসন্দেহে মেধাবী ছাত্রী এবং অবশ্যই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল সে । মাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম দশের মধ্যে র‌্যাঙ্ক করার ইচ্ছে ছিল তার । উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা খুব ভাল । র‌্যাঙ্ক করার উচ্ছা তো মেধাবী ছেলেমেয়েদের থাকবেই । কিন্তু প্রশ্ন হল রেজাল্ট আউটের দিন চ্যানেলে চ্যানেলে মুখ দেখানো ছাড়া মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকে র‌্যাঙ্ক দিয়ে শেষ পর্যন্ত কী হয় ? বিষয়টি হল নিজেকে যোগ্য করে তোলা । আর এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া । একটি দুটো পরীক্ষায় র‌্যাঙ্ক প্রথম দশ কেন প্রথম হাজারের মধ্যে থাকলেও তাতে তেমন কোনও হেরফের হয় না । বরং একটু পিছিয়ে থেকে নানান বাধাবিপত্তি জয় করে ধাপে ধাপে যারা সাফল্যের সোপানে চড়ে সমাজকে তাঁরাই কিছু দিতে পেরেছে এমন নজির‌ই বেশি ।

বলিউডের বিখ্যাত সিনেমা- থ্রি ইডিয়টস। উঠতি প্রজন্মের কাছে সিনেমাটির মেসেজ‌ই হচ্ছে ‘যোগ্য হও, দেখবে সফলতা তোমার হাতের নাগালে চলে আসবে ‘। কবি মোহাম্মদ ইকবাল তো অনেক আগেই বলে গিয়েছিলেন- ‘ খুদি কর বুলন্দ ইতনা কি হর তকদির সে পেহেলে খুদা আপনে বান্দে সে খুদ পুছে বাতা তেরি রজা কেয়া হে ‘। প্রশ্ন হল বর্তমান প্রজন্ম কি ভোগবাদের কুহকে সত্যকে গ্রহণ করবার ইচ্ছে শক্তি হারিয়ে ফেলছে ? ধৈর্য্য ধরার সুপ্রবৃত্তি হারিয়ে ফেলেছে ‌? জীবনে সাফল্য আর শুভ এক জিনিস নয় । তাৎক্ষণিক সাফল্য মধুর নিঃসন্দেহে কিন্তু জীবনে শুভর স্থান অনেক সাফল্যের অনেক ওপরে । মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক বড় প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে কিন্তু জীবনের থেকে বড় প্রতিযোগিতা নেই । অর্থাৎ জীবনের থেকে কোনও পরীক্ষাই বড় নয় । পরীক্ষায় র‌্যাঙ্ক করাটাই জীবনে শেষ কথা এটা যদি অভিভাবকেরা উত্তরাধিকারীদের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেন তবে তাঁরা শুধু নিজের সন্তানদের‌ই ক্ষতি করছেন না ক্ষতি করে চলেছেন সমাজের‌ও ।

মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে র‌্যাঙ্ক করতে পারলে তিন-চার দিনের জন্য পরীক্ষার্থীরা তো এখন সেলিব্রিটি । চ্যানেলে চ্যানেলে ফার্স্ট , সেকেন্ড , থার্ড , ফোর্থদের নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় । ভেবে দেখবেন সাময়িক তৃপ্তি ছাড়া ছাত্রদের জীবনে‌ এইসবের আর কোনও ভূমিকা নেই । তিনদিন পার হলে সেলিব্রিটিদের কথা সবাই ভুলে যায় । জীবন একটা লম্বা হার্ডল রেস । মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকে র‌্যাঙ্কট্যাঙ্ক না করেও এমনকি খারাপ নম্বর পাওয়ার পরেও যে জীবনে কৃতী হ‌ওয়া যায় , সার্থক হ‌ওয়া যায় সমাজে সেই উদাহরণ‌ই অধিক । এখন এই করোনা কালে ছাত্রছাত্রীদের মনোবল অটুট রাখতে আমাদের কী করা উচিত ?

অতিমারি কালে শুধু অনলাইন ক্লাসই যথেষ্ট নয়, দরকার অনলাইন গ্রুপ কাউন্সেলিংও ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিমাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অনুষ্ঠান করা যেতে পারে অনলাইনে । এই সব অনুষ্ঠানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের , মনস্তাত্ত্বিকদের অংশগ্রহণ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে । অভিবাবকদের‌ও বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করতে হবে এই ধরণের কাউন্সেলিং অনুষ্ঠানে। গৃহের থেকে বড় ইনষ্টিটিউশন আর নেই । গৃহের পরিবেশ যদি পজিটিভ হয় ছেলেমেয়েদের মানসিকতাতেও তার ছাপ পড়তে বাধ্য । অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব তো এখন মারাত্মক । সু এবং কু দুই অর্থেই । মাঝেমাঝে মনে হয় কুপ্রভাবটাই বেশি । সামাজিক মাধ্যমকে কীভাবে এবং কতটা ব্যবহার করব আমার মনে হয় এটা কিশোর-কিশোরীদের শিখিয়ে দেওয়াটা জরুরি । এই কাজটি করবেন কারা ? অবশ্য‌ই অভিভাবক এবং শিক্ষকেরা । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন সবাই কমবেশি বুঁদ হয়ে আছে । এই করোনা কালে সামাজিক মাধ্যম পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম উপায়ও বটে । সামাজিক মাধ্যমে হঠাৎ হিরো হয়ে যাওয়া খুব সহজ । হিরোগিরি কৈশোর -যৌবনের‌ একটা স্বাভাবিক প্রবণতা । খারাপ নয় । কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি । তাই সামাজিক মাধ্যমকে ছেলেমেয়েরা কীভাবে ব্যবহার করছে সেই দিকে বাবা-মা এবং শিক্ষকদের নজর দেওয়া দরকার । নৈতিক শিক্ষা বলে একটা জিনিস আছে । একটা সময় অভিভাবকেরা সবার আগে ছেলেমেয়েদের এটা দান করতেন । নৈতিক শিক্ষা একটা পরম্পরাগত ব্যাপার । নৈতিক শিক্ষার সূত্রপাত হয় পরিবার থেকে । এখন অভিভাবকেরাই যদি নৈতিকতার ধার না ধারেন তবে ছেলেমেয়েরা শিখবে কেমন করে । ছেলেমেয়েদের শুধু প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিলেই চলবে ? ছেলেমেয়েদের পেছনে অকাতরে অর্থ ব্যয় করলেই অভিভাবকদের কাজ শেষ ? ছেলেমেয়েদের জীবনে বাবা-মায়ের চেয়ে বড় কাউন্সেলার আর কে আছেন ? ছেলেমেয়েদের চঞ্চল মনকে স্থির করার সবথেকে বড় দায়িত্ব তো বাবা-মায়ের‌ই । ছাত্র-ছাত্রীদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন বাবা-মা‌য়েরাই পারেন তাদেরকে যথার্থভাবে পথ দেখাতে। তার জন্য বাবা-মার পুঁথিগত শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। সম্যক জ্ঞান ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি থেকে আসে না আসে বিবেকবোধ থেকে ।

ছেলেমেয়েদের শুধু প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিলেই চলবে ? ছেলেমেয়েদের পেছনে অকাতরে অর্থ ব্যয় করলেই অভিভাবকদের কাজ শেষ ? ছেলেমেয়েদের জীবনে বাবা-মায়ের চেয়ে বড় কাউন্সেলার আর কে আছেন ? ছেলেমেয়েদের চঞ্চল মনকে স্থির করার সবথেকে বড় দায়িত্ব তো বাবা-মায়ের‌ই । ছাত্র-ছাত্রীদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন বাবা-মা‌য়েরাই পারেন তাদেরকে যথার্থভাবে পথ দেখাতে। তার জন্য বাবা-মার পুঁথিগত শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। সম্যক জ্ঞান ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি থেকে আসে না আসে বিবেকবোধ থেকে ।

এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের বারবার বলতে থাকুক – সদর্থক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলো । মনোবল হারিয়ো না । সব একদিন ঠিক হয়ে যাবে ।‌ জীবনের আরেক নাম যুদ্ধ । এখন একটা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে সারা পৃথিবী চলেছে । তুমিও এই যুদ্ধের একজন সৈনিক । যুদ্ধটা সবাই মিলে জিততে হবে । এখানে নিজের ব্যক্তিগত লাভক্ষতিটাই বড় ব্যাপার নয় । এইভাবেই জাপানিরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেয় । এই জন্যই বারে বারে ধংসস্তুপ থেকে মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়ায় দেশটা । যদি অভিবাবকরা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেন অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন । এখনও আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা যে , মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে একমাত্র বদ্ধ পাগলরাই চিকিৎসার জন্য যায় । বাস্তব হল মনের যত্ন নিতে যে কেউ সাইকিয়াট্রিস্ট কিম্বা সাইকোলজিস্টের কাছে যেতে পারেন য়। সঠিক পথে কাউন্সেলিং হলে কিন্তু মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে যায়। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড় ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড হওয়াটাই মুখ্য নয়, এই কথাটি কিশোর-কিশোরীদের বারবার করে বোঝাতে হবে । বোঝানোর দায়িত্ব অভিভাবক এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের । বাবা-মায়ের পরে ছাত্রছাত্রীরা সবচেয়ে বেশি আইডল মনে করে স্যার-ম্যামদের ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলি এখন বন্ধ। কিন্তু অনলাইনে ক্লাস নিয়েই শিক্ষকদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষকদের উচিত আরও বড় দায়িত্ব পালন করা । স্কুল গুলির উচিত পরিকল্পনা করে পড়ুয়াদের কাউন্সেলিংয়ের দায়িত্ব নেওয়া । এটা একটা বিজ্ঞানভিত্তিক কাজ । আলাপ-আলোচনা , অনুপ্রেরণা জোগায় এমন গ্রন্থ পাঠ , গান-বাজনা , আড্ডার মাধ্যমে খেলাচ্ছলে ছাত্রছাত্রীদের মনের ভার হাল্কা করা যেতে পারে । ইনোভেশন বা আবিষ্কার ছাড়া সভ্যতা এগোতে পারে না । প্যান্ডেমিক পিরিয়ডে অনলাইন ক্লাসে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ততটা গুরুত্বের সাথেই যদি স্কুল গুলি নিয়মিত সমবেত কাউন্সেলিংয়ে জোর দিত । সরকারি স্কুলের মাস্টাররাও যদি‌ শুধুই ঘরে বসে বসে বেতন না তুলে বিষয়টিকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতেন তবে এই অভিশপ্ত করোনা কাল‌ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যথার্থ অর্থেই শিক্ষনীয় হয়ে উঠতে পারত ।

  • লেখক পরিচিতি : ডঃ সুকান্ত ঘোষ । সহকারী অধ্যাপক , রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ , কোচবিহার মহাবিদ্যালয় ।

Photo Credits – The Harvard Gazette , Free Press Journal , Classroom.Live


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *