মামলা শাসকদলের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠলে ‘ আইনের শাসন ‘ পরিহাসে পরিণত হয়


                               উ ত্ত ম  দে ব 

মামলা বড় ভয়ানক জিনিস । ‘ তোর ঘরে মামলা ঢুকুক ‘ একটি প্রাচীন প্রবাদ । যা অভিশাপ হিসেবে শত্রুর উপর বর্ষিত হত । কার‌ও ভিটেয় ঘুঘু চড়াতে চাইলে মামলা-মোকদ্দমা চাপিয়ে তাকে কাবু করে ফেলার রেওয়াজ চিরকাল‌ই বঙ্গ সমাজে ছিল । তাই অসুখ-বিসুখ ,বন্যা-খরা-দুর্ভিক্ষের মতোই মামলা-মোকদ্দমাকেও একটা বড় মুসিব্বত বলে মনে করে এসেছে বাঙালি গৃহস্থ । সামন্ততান্ত্রিক সমাজে মামলা দিত দুষ্টু জমিদার , জ্ঞাতিশত্রু , হিংসুটে প্রতিবেশীরা । সমাজ থেকে সামন্ততন্ত্র বিদায় নিলেও ঘরে মামলা ঢুকিয়ে লোকের জীবন জেরবার করে দেওয়ার ঐতিহ্যের কিন্তু অবসান হয় নি । রাজনীতির পরিভাষায় যাকে বলে প্রতিপক্ষের লাইফ হেইল করে দেওয়া । যদিও আইনের শাসন বলে বেশ সুন্দর একটা বাণী আছে আমাদের গণতান্ত্রিক দেশে । সংবিধানে আইনের শাসন‌ই শেষ কথা । মানে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন যা কিছু হবে আইন মেনে । 

ঘরে মামলা ঢোকা গৃহস্থের জন্য অভিশাপ চিরকালই ।

দন্ডমুন্ডের কর্তা ছাড়া সমাজে সুশাসন চলে না । সেকালের রাজা-জমিদারের স্থলে একালের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার । সরকার মাইবাপ । তিনি শাসন করেন । পুলিশ পাঠান । মামলা দেন । দুষ্টুকে দন্ড দিতে গেলে পুলিশ পাঠিয়ে তাকে ধরতে হবে বৈকি । মামলা সাজিয়ে তাকে বিচারশালাতেও তুলতে হবে । কিন্তু মামলাকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে শত্রুকে শবক শেখানোর রেওয়াজ তো বন্ধ হয় নি । এই বেলায় সেকেলে জমিদারের সঙ্গে একেলে গণতান্ত্রিক সরকার প্রধানের কোন‌ও পার্থক্য নেই ‌। তুমি আমার বিরোধিতা করলে তোমার বিরুদ্ধে গুনে গুনে চল্লিশটা মামলা দিয়ে তোমাকে দৌড়ের ওপর রাখব । আবার তোমার সঙ্গে রফা হয়ে গেলে মামলা তুলে নেবো । তুমি যখন স্বদলে তখন তুমি আইন ভাঙলেও চুপ করে দেখব আর তোমার কর্মের খতিয়ান খাতায় টুকে রাখব । দল ছেড়ে বেরুলেই খাতা দেখে দেখে মামলা ঠুকতে শুরু করব । চোখের সামনে এইসব দেখতে দেখতে আইনের এই অনাচার আমাদের গা স‌ওয়া হয়ে গেছে । হয়রানি মূলক মামলা বলে বাজারে একটা কথা চালু আছে । অর্থাৎ একজন মানুষকে হয়রান করার জন্য আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে । তাকে মাটিতে ফেলে পেটানো হচ্ছে না কিন্তু তার বিরুদ্ধে গোটা কতক মামলা দিয়ে তাকে আদালতে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । আইনকে ব্যবহার করে তাকে জেলের ঘানি টানতে পর্যন্ত বাধ্য করা হচ্ছে । এই যে আইনকে বেআইনিভাবে ব্যবহার করে একজনকে কষ্ট দেওয়া । এর কি কোনও প্রতিবিধান নেই ? 

খুনের মামলা দিয়ে জেল খাটানোর ভয় দেখিয়ে বিরোধী দলের বিধায়ককে পর্যন্ত  পোষ মানানো হয়েছে !

পলিটিক্যাল টুলস ‘ হিসেবে মামলাকে  ব্যবহার করে বিরোধী দলের বিধায়ককে নিজের দলে টেনে আনার মতো ঘটনাও সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গে  ঘটেছে । বিধায়ককে খুনের মামলা দিয়ে চেপে ধরা হয়েছে । বিধায়ক মশাইদের দল বদলের পর মামলার আর কোনও উচ্চবাচ্চ নেই । আইন-আদালত সম্পর্কে অভিজ্ঞ মানুষ মাত্রেই জানেন মামলাকে ঘুম পারিয়ে দেওয়া কিম্বা জাগিয়ে তোলা – দুটোই মালিকের মর্জি । একদিন ‌শুনলাম শাসকদলের এক নেত্রী এক ছোকড়াকে ধমকি দিয়েছেন – ‘ বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না । গাঁজা কেসে দেবো ফাঁসিয়ে । ‘ কীভাবে ফাঁসাবো ? না কেস দিয়ে ফাঁসাবো । সাংবিধানিক শাসনে যে আইন নিয়ে এত বড় বড় কথা শোনা যায় সভা সমিতিতে । সেই আইনকেই যখন প্রতিশোধ নিতে ব্যবহার করা হয় তখন ‘ আইনের শাসন ‘ নামক শব্দবন্ধটি কি ভুক্তভোগীর কাছে বিদ্রুপ হিসেবে উপস্থিত হয় না ? 

‘ বেশি বাড় বেড়ো না । গাঁজা কেসে ফাঁসিয়ে দেবো ‘ । এটা কোনও বিচ্ছিন্ন সংলাপ নয় । আজকের পশ্চিমবঙ্গে এটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে । কেউ মাদকদ্রব্য বহন-ব্যবহার বা পাচার করলে তা দন্ডযোগ্য অপরাধ । কিন্তু এর একটিও না করার পর কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়াটাও কিছু কম অপরাধ নয় । অথচ যে বা যারা নিরপরাধীদের ফাঁসাচ্ছে তারা নির্বিকার । তাদের কোনও বিবেক দংশন নেই । দেশের আইন‌ও তাদের শাস্তি দিতে অপারগ । কেস দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল পশ্চিমবঙ্গে আগেও ছিল । কিন্তু এটাকে কত সূক্ষ্মভাবে কত রকম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছে এগারো পরবর্তী রাজ্যের শাসক দল । 

হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করায় পাঁশকুড়ার  এক নেতার জামিন রদ হয়ে গেছে ।

পাহাড়ের দুই নেতা নিজেরাও বোধহয় জানেন না তাদের বিরুদ্ধে কটা কেস দিয়েছে সরকার । পুলিশ আধিকারিক খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত দুই ফেরার নেতা সেটিং করে ফেলতেই মামলা গুলো যেন কোথায় বেপাত্তা হয়ে গেল ।‌ পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ার এক রাজনৈতিক নেতার ওপর থেকে খুনের মামলা প্রত্যাহারের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট । নিম্ন আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়া ওই নেতাকে ফের জেলে ঢুকতে হয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে । পাঁশকুড়ার সেই নেতাটিকে কেন খুনের মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছিল আজ ভোটের মুখে কেন‌ই বা মামলা তুলে নিয়ে তাকে জেলের বাইরে আনা হচ্ছিল – পেছনের গল্প সবার জানা । সেই একই কাহিনী । রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই বিপজ্জনক প্রবণতা আইনের শাসনের স্বার্থে বন্ধ হ‌ওয়া জরুরি । কিন্তু করবে কে ? আইন প্রয়োগ করে আইনের শাসন কায়েম রাখাই যার সাংবিধানিক দায়িত্ব সেই শাসন বিভাগ‌ই যখন রাজনীতির খাতিরে দায়িত্বচ্যুত তখন একমাত্র ভরসার জায়গা আদালত । আইনের শাসনের অন্তর্জলি যাত্রা চূড়ান্ত হ‌ওয়ার আগেই মামলা দেওয়া আর মামলা তোলার এই নোংরা খেলা বন্ধ করতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্ণায়ক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার । 

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মামলা বন্ধে  দেশের শীর্ষ আদালতের নির্ণায়ক ভূমিকা চাই ।


 সকল ছবি প্রতীকি ও সংগৃহীত







 


Leave a Reply

Your email address will not be published.