সূর্য সেন : ব্রিটিশ সিংহের হাঁটু কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন যেই বাঙালি শার্দুল


                                  না গ রি ক  নি উ জে র  স্মৃতি   ত র্প ণ

বারোই জানুয়ারি । দিনটির জন্য আকাশচুম্বী অহঙ্কার করা সাজে বাঙালির । এমন এক দিন , যেদিন প্রভাতে বাঙালির এক সূর্যসন্তানের উদয় নিশীথে আরেক সূর্যসন্তানের বিলয় ঘটেছিল । ১৮৬৩‘র এইদিন প্রভাতে সূর্যোদয়ের ঠিক ছয় মিনিট পূর্বে কলকাতার শিমুলিয়ায় বিশ্বনাথ দত্তের ঘর আলো করে যাঁর উদয় হয়েছিল সূর্যের সব গুণ দিয়েই তাঁকে ধরায় পাঠিয়েছিলেন বিধাতা । তিনি আমাদের চির প্রণম্য স্বামী বিবেকানন্দ । আবার এর ঠিক ৭১ বছর পর ১৯৩৪ এর ১২ই জানুয়ারি রজনীতে চট্টগ্রামের কারাগারে বিলয় হয়েছিল বাঙালির আরেক সূর্যের ।যাঁর নাম সূর্য সেন । আপন কর্ম দ্বারা পিতৃদত্ত নামের প্রতি এমন সুবিচার পৃথিবীতে ক‌’জন করতে পারে ! প্রথম সূর্যকে প্রণতি জানিয়ে এখানে দ্বিতীয় সূর্য মাস্টারদা সূর্যসেনের কথা বলব । যদিও স্বল্প কথায় তাঁকে বলা সহজ নয় । 

আটপৌরে এই অবয়বের অন্দরেই লুকিয়ে থাকত আগুন ,যা ত্রস্ত রাখত ইংরেজ শাসককে


১৯৩৪ এর ১২ই জানুয়ারি শেষ রাতে ফাঁসি হ‌ওয়ার কথা ছিল বিপ্লবী সূর্য সেন ও তাঁর সহযোদ্ধা তারকেশ্বর দস্তিদারের । কাগজে কলমে হয়েছেও তাই । কিন্তু আসল ইতিহাস এতদিনে সবার জানা হয়ে গেছে । রোগা পাতলা খর্বাকায় নিতান্তই আটপৌরে চেহারার বাঙালিটাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা পর্যন্ত তর সয় নি দোর্দন্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ সিংহের । কারণ চাটগাঁইয়া এই মানুষটি তাঁর জনাকয়েক অনুগামীকে নিয়ে মহাপরাক্রমশালী ইংরেজ শাসকের গালে সজোরে এমন একটি চপেটাঘাত কষিয়ে ছিলেন যে সেই অপমান কিছুতেই ভুলতে পারছিল না ব্রিটিশ রাজশক্তির পাইক বরকন্দাজরা । সূর্য সেন নামক জাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে খাঁচায় না পোড়া পর্যন্ত ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল অবিভক্ত বাংলার ছোটলাটের । বিচারের পালা সাঙ্গ করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নিকেশ করার সময় লোকটা এতটুকু টাল খায় নি ! লোকটার মুখে এতটুকুও মৃত্যু ভয় নেই ! ফাঁসির কাল কুঠুরিতেও সামান্য এক বাঙালির এমন রাজসিক মেজাজ দেখে কি আর গোরা পুলিশ অফিসারদের মাথা ঠিক থাকে । কনডেমড সেলের ভেতরেই মেরে মেরে মাস্টারদার হাড়ের জোড়া গুলো আলগা করে দিল গোরারা । মরার আগে রয়্যাল বেঙ্গল ব্যাঘ্রের দাঁত গুলো পর্যন্ত উপড়ে নিল শ্বেতাঙ্গ পিশাচেরা । সর্বাধিনায়কের আর্তনাদ শুনে প্রতিবাদ করেন তারকেশ্বর দস্তিদার। তখন তাঁর ওপরেও বন্য কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংরেজ পুলিশ অফিসারেরা। শেষে দলা পাকানো দুটো নিষ্প্রাণ দেহকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নিয়ম রক্ষা করেছিল কারা কর্তৃপক্ষ । 

রাত ভোর হ‌ওয়ার আগেই মাস্টার দা আর তারকেশ্বর দস্তিদারের দেহ জেল থেকে বের করে ট্রাকে চাপিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের চার নম্বর জেটিতে নিয়ে যায় পুলিশের একটি বাহিনী। সেখান থেকে দেহ দুটি জাহাজে তুলে বঙ্গোপসাগরের গভীরে নিয়ে গিয়ে লম্বা লোহার শেকলে বেঁধে নিক্ষেপ করা হয় অতল সমুদ্রে । মুহুর্তেই বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে তলিয়ে যায় এক বাঙালি বিপ্লবী নায়ক ও তাঁর বিশ্বস্ত বীর সহযোদ্ধার ক্ষতবিক্ষত দেহ । ঘটনার সময় উপস্থিত বাঙালি পুলিশ কর্মীদের বয়ান থেকে জানা যায় জাহাজ থেকে ফেলার আগেও দেহ দুটিতে পদাঘাত করেছিল গোরা পুলিশ অফিসারেরা । কত খানি আক্রোশ থাকলে মৃতের প্রতি এমন অবজ্ঞা-অসম্মান সম্ভব !

মাস্টারদার ফাঁসির মঞ্চ। যদিও ফাঁসির আগেই নির্মম নির্যাতনে মাস্টারদাকে খুন  করেছিল শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসাররা










ক্ষুদিরাম-কানাইলাল-সত্যেন থেকে দীনেশ গুপ্ত-প্রদ্যুৎ ভট্টাচার্য কম বাঙালি বিপ্লবীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারে নি ইংরেজ সরকার । কিন্তু মৃত্যুকালে এবং মৃত্যুর পরে কার‌ও সঙ্গে এতটা নির্দয় নির্মম আচরণ করে নি ব্রিটিশ প্রশাসন । আসলে ইংরেজ শাসনকে নাড়িয়ে কাঁপিয়ে দিয়ে ছেড়েছিলেন মাস্টার দা । শুধু বাংলা নয় গোটা ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সামান্য সরঞ্জামে এমন সুসংগঠিত অভিযানের উদাহরণ আর নেই । 

১৯৩০ এর ১৮ই এপ্রিল রাতে বিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির ৬৫ জন যুবক চট্টগ্রামে প্রশাসনের মূল তিনটি স্তম্ভ পুলিশ লাইন অস্ত্রাগার , টেলিফোন-টেলিগ্রাফ স্টেশন এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঘাত হেনেছিল । বিপ্লবীদের ঝটিকা আক্রমণের সামনে রীতিমতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে বন্দরনগরীর ব্রিটিশ প্রশাসন । রাত দশটা থেকে ভোরের আলো ফোঁটা পর্যন্ত প্রশাসন ছিল সম্পূর্ণ পরাজিতের দলে। অপারেশন শেষ হ‌ওয়া মাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শেষে গেরিলারা চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করলেও পরবর্তী ৯৬ ঘন্টার আগে এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ফিরে পায় নি ব্রিটিশ প্রশাসন । সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের হাঁটুতে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল মাত্র ৬৫ টি অকুতোভয় বাঙালি যুবক । মাস্টারদা ,অম্বিকা চক্রবর্তী , গণেশ ঘোষ , নির্মলকুমার সেন এবং অনন্ত সিংহের মতো সিনিয়রদের বাদ দিলে প্রায় কারোরই বয়স বাইশ তেইশের বেশি নয় । দলে টেগরা ( হরিগোপাল বল ) ছিল সবথেকে ছোট , মাত্র ১৪ বছর বয়স । 

এরপর বাইশে এপ্রিল । জালালাবাদ পাহাড়ের ঐতিহাসিক যুদ্ধ । বিপুল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ রয়্যাল আর্মির বিশাল বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামলেন চারদিন অর্ধাহারে অনাহারে থাকা ৬৫ জনের বাঙালি যোদ্ধার দল । মাস্টারদা এই যুদ্ধে সেনাপতির দায়িত্ব দিলেন বাইশ বছরের লোকনাথ বলকে । রসদ ফুরোলে বিপ্লবীরা রণাঙ্গন ত্যাগে বাধ্য হন । ততক্ষণে বালক টেগরা সহ শহিদ দ্বাদশ বিপ্লবী । কিন্তু বিপ্লবীরা রণাঙ্গন ত্যাগের আগে পর্যন্ত জালালাবাদ পাহাড়ে উঠতে পারে নি ইংরেজ সৈন্য বাহিনী । জালালাবাদের যুদ্ধে ইংরেজদের তরফে ক্ষয়ক্ষতি ছিল মারাত্মক । বিপ্লবীদের বধ করতে এসে প্রাণ দেয় প্রায় একশ ব্রিটিশ সৈন্য । স্বাধীনতা আন্দোলনের গোটা পর্বে দেশের সশস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে ইংরেজদের তরফে এত ব্যাপক প্রাণহানির দ্বিতীয় নজির ( আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াইয়ের কথা আলাদা ) কিন্তু নেই । 

ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধের দ্বাদশ শহিদ

সূর্য সেন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের লড়াইয়ের কথা অমৃত সমান । মাস্টারদা শুধু দক্ষ সংগঠকই ছিলেন না ছিলেন এমন এক অগ্নিশুদ্ধ পুরুষ , যাকে কখনও কোনও কলঙ্ক স্পর্শ করতে পারে নি। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতির ভূমিকায় মানুষটি ছিলেন বজ্রের মতোই কঠিন অথচ দলের ভেতরে কনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের আগলে রাখতেন যেন অপত্যস্নেহে । ফাঁসির আগের রাতে সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন , আমার শেষ বাণী – আদর্শ ও একতা । ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে । মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে । মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে । এই তো আমার সাধনার সময় । এই তো‌ বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সময় , হারানো দিন গুলোকে নতুন করে স্মরণ করার এই তো সময় আরও লিখেছিলেন , ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম ইস্টার বিদ্রোহের কথা কোন‌ও দিন‌ই ভুলে যেও না । জালালাবাদ , জুলধা , চন্দননগর ও ধলাঘাটের সংগ্রামের কথা সব সময় মনে রেখো । ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যেসব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন , তাঁদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো । ‘ 

আমরা মাস্টারদাকে মনে রাখি নিতারকেশ্বর দস্তিদারকে মনে রাখি নি । জালালাবাদ রণাঙ্গনে প্রাণ উৎসর্গকারী দ্বাদশ বিপ্লবীকে মনে রাখি নি । প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে ভুলে গেছি । লোকনাথ বল , অনন্ত সিংহ , নির্মলকুমার সেন , অম্বিকা চক্রবর্তী , গণেশ ঘোষদের নাম‌ই শোনে নি বাঙালির নবীন প্রজন্ম  । যে মাটিতে মাস্টারদার শেষ নিঃশ্বাস পড়েছে সেই মাটির ওপর অধিকার হারিয়েছি । বাঙালি যদি তাঁর সূর্যসন্তানদের কথা মনে না রাখে তবে কে রাখবে ? বাঙালি যদি তাঁর অগ্নিপুরুষদের অর্ঘ্য না দেয় তবে কে দেবে ? 

কলকাতা হাইকোর্টের সামনে বিপ্লবী সূর্য সেনের পূর্ণাবয়ব মূর্তি





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *