আব্বাস সিদ্দিকির ঘাড়ে ভর করে বাংলায় ভোটে কামিয়াবি চান হায়দরাবাদের ওয়াইসি


নাগরিক  পলিটিক্যাল ডেস্ক :  লক্ষ্য প্রায় তিরিশ শতাংশের কাছাকাছি সংখ্যালঘু ভোট । বিহারে আশাতীত সাফল্যের পর আসাদ‌উদ্দিন ওয়াইসির নজর এবার বাংলায় । রবিবার রাজ্যে পা দিয়েই ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে বৈঠক করলেন ওয়াইসি । আব্বাস সিদ্দিকির নেতৃত্বেই তাঁর দল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে লড়বে বলে এদিন জানিয়েও দিলেন তিনি । ওয়াইসির দলেকে সবাই ‘মিম‘ বলেই চেনে । যদিও বছর খানেক আগেও মিমের নাম জানত না পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষ । মিমের পুরো নাম ‘ অল ইন্ডিয়া মজলিস ই ইত্তেহাদুল মুসলিমি ‘ । এই নাম নিঃসন্দেহে বাঙালির পক্ষে মনে রাখাও শক্ত । এত দিন পর্যন্ত মিমের রাজনৈতিক কার্যকলাপ পূর্বতন অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ ও বর্তমান তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । স্থানীয় উর্দুভাষী মুসলমানরা মিমের ভোটব্যাঙ্ক । খুল্লামখুল্লা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে কোন‌ও কালেই অরুচি ছিল না ওয়াইসি খানদানের । মুখে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে রাজনীতি করলেও মিম দলটি পারিবারিক সম্পত্তির বাইরে কিছু নয় বলে সমালোচকদের অভিযোগ ।  

ফুরফুরা শরিফে আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে ওয়াইসির বৈঠক

মিমের প্রতিষ্ঠাতার নাম সুলতান সালাউদ্দিন ওয়াইসি । বাবার এন্তেকালের পর দলের হাল ধরেন বড় ছেলে আসাদ‌উদ্দিন ওয়াইসি । দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড আসাদ‌উদ্দিনের ছোটভাই আকবর‌উদ্দিন ওয়াইসি । সুবক্তা আসাদ‌উদ্দিন ওয়াইসি রাখঢাক করে কথা বললেও উস্কানিমূলক ভাষণ দেওয়ায় কুখ্যাতি আছে ছোটভাই আকবর‌উদ্দিন ওয়াইসির । মুসলমানদের নাম নিয়ে প্রকাশ্যেই রাজনীতি করলেও হায়দ্রাবাদ-সেকেন্দ্রাবাদের বাইরে কোনও দিন‌ই অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের আর কোথাও পায়ের তলায় মাটি পায় নি মিম । বর্তমান তেলেঙ্গানাতেও ওয়াইসির যত বিক্রম টুইন সিটিতেই সীমাবদ্ধ । গত দু’তিন বছর ধরেই এহেন ওয়াইসির মনে উচ্চাকাঙ্ক্ষা জেগেছে গোটা দেশের সংখ্যালঘুদের মুখপাত্র হবেন তিনি । মিমকে ছড়িয়ে দেবেন ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও ।

বহুদিন ধরেই হায়দ্রাবাদের গন্ডির বাইরে  দলকে নিয়ে যাওয়ার খোয়াইশ মিম প্রধানের

বিগত কয়েক বছর ধরে রাজ্যের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা গুলোতে বিশেষ করে দুই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদ- মালদহে সংগঠন বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে মিম । যদিও রাজ্যের বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে মিমের বিরাট কোন‌ও প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এরকম কোনও প্রমাণ এখনও পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে বলে মনে করে না রাজনৈতিক মহলমিমের ভোটব্যাঙ্ক হায়দরাবাদের উর্দুভাষী মুসলমানরা । পশ্চিমবঙ্গের উর্দুভাষী মুসলমানদের বৃহত্তর অংশ কলকাতা কেন্দ্রিক । কলকাতার উর্দুভাষী মুসলমানরা যে তৃণমূলের‌ই সঙ্গে উনিশের লোকসভা নির্বাচনেও সেই প্রমাণ মিলেছে । এক বছরের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে এরকম কোনও লক্ষণ এখনও পর্যন্ত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে পড়ে নি । 

কোনও সন্দেহ নেই যে বিহারের সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ভাল পারফরমেন্স দেখিয়েছে ওয়াইসির মিম । সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশে ভাগ বসিয়ে লালুপুত্র তেজস্বী যাদবের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় জল ঢেলে দিয়েছে মিম । এই জন্যই ওয়াইসিকে বিজেপির এজেন্ট বলে কটাক্ষ করতে ছাড়ে নি বিরোধীরা । বিহারে পাঁচটি সিট জেতায় পশ্চিমবঙ্গে‌ও এই জাতীয় সাফল্য লাভের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন আসাদ‌উদ্দিন ওয়াইসি । কিন্তু ওয়াইসির জন্য সবথেকে বড় বাধা হল এখনও পর্যন্ত এই রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের কব্জায় । বাংলাভাষী এবং উর্দুভাষী – দুই মুসলমান জনগোষ্ঠীর ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে চেষ্টার ত্রুটি রাখছেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । সাম্প্রতিক কালে সরাসরি সাম্প্রদায়িক লাইনে রাজনীতি করে রাজ্যের সংখ্যালঘু বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমান জনগোষ্ঠীর ভেতরে জমি তৈরি করার চেষ্টা আর‌ও একজন চালিয়ে যাচ্ছেন । তাঁর নাম ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি । ফুরফুরা শরিফের আরেক পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকি প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও ভাইপো আব্বাস পৃথক দল গঠন করে ভোটে লড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে । উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সংখ্যালঘু এলাকা গুলোতে আব্বাসের সভায় ভিড়‌ও হচ্ছে ব্যাপক । ভিড় দেখে দেখে ভোটে লড়ার জন্য আরও বেশি বেশি উৎসাহিত হয়ে পড়ছেন পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি । 

আব্বাস সিদ্দিকির হাত ধরে বাংলায় পা রাখতে চাইছেন ওয়াইসি

পৃথক দল গড়ে আব্বাস সিদ্দিকির ভোটে লড়ার এই পায়তারা যে তৃণমূল ভাল নজরে দেখছে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না । আব্বাস শেষ পর্যন্ত সংখ্যালঘু ভোটে কতটা ভাগ বসাতে পারবেন এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ের অবকাশ আছে । এখন ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির স্কন্ধে ভর করেই বাংলায় নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জাহির করতে চান মিম প্রধান আসাদ‌উদ্দিন ওয়াইসি । রবিবার হুগলির ফুরফুরা শরিফে আব্বাস ও তাঁর দলবলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে সে কথা ঘোষণা‌ও করে দিয়েছেন ওয়াইসি । খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওয়াইসির কথা খুব ভালভাবে নেয় নি তৃণমূল কংগ্রেস । ইতিমধ্যে মিমকে প্রকাশ্যেই বিজেপির বি টিম বলে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । এদিন‌ও মুখে অন্ততঃ ওয়াইসির কথাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনেন নি তৃণমূল নেতৃত্ব । পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মুসলমান ওয়াইসির কথায় টলবে না বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন সাংসদ সৌগত রায় । 

ভাইপো আব্বাস মুখ ফিরিয়ে নিলেও  কাকা ত্বহা সিদ্দিকির সমর্থন এখনও তৃণমূলের দিকেই

বাম ও কংগ্রেস তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা চালালেও ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকি এখনও তৃণমূলের সঙ্গেই আছেন । ভাইপো আব্বাসের সঙ্গে ত্বহার মুখ দেখাদেখি বন্ধ বহুদিন । হায়দরাবাদের ওয়াইসির থেকে ঘরের আব্বাস সিদ্দিকিকে নিয়েই অনেক বেশি চিন্তিত তৃণমূল নেতৃত্ব । কেননা , আব্বাস বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে জমি তৈরি করতে চাচ্ছেন । আব্বাস ভোটে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য পূরণে কামিয়াব হলে এর রাজনৈতিক পরিণাম কী হতে পারে তা ভাল মতোই ওয়াকিবহাল আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । তবে মাঠের রাজনীতি আর ভোটের রাজনীতিতে ব্যবধান বড় কম নয় । ভোটের রাজনীতিতে কুশলী না হলে শুধু ভরামাঠে গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে ইভিএমে ফসল ফলানো যায় না । আসন্ন ভোট মরশুমে আব্বাস সিদ্দিকির গর্জন থেকে‌ শেষ পর্যন্ত কতটা বর্ষণ হয় এটা দেখতেই মুখিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহল ।


ছবি – ওয়াইসির ট্যুইটার ও ফেসবুক থেকে সংগৃহীত


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *