সমাজে ট্রোলিং ছিল চিরকালই , তবে সামাজিক মাধ্যমে ধর্মোন্মাদদের বিষাক্ত জিহ্বায় লাগাম পড়ানো জরুরী


                         উত্তম দেব

মানুষের কিছু সহজাত সুপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তি আছে । পথের মানুষ উল্টে পড়লে তাঁকে উঠতে সাহায্য করা যেমন আমাদের সহজাত সুপ্রবৃত্তির একটি । অর্থাৎ স্বজাতি শোকে তাপে বিপদে পড়লে তার সহমর্মী হ‌ওয়া ,তাকে সাহায্য করা , একটু আহা উঁহু করে সান্ত্বনা দেওয়া এসব সভ্য হ‌ওয়ার সাথে সাথেই রপ্ত করেছে মানুষ । আমাদের অনেক সদাচার , পরার্থপরতা সায়েন্সের ভাষায় যাকে রিফ্লেক্স অ্যাকশন বলে মূলতঃ তার সৌজন্যে ঘটে থাকে । 

আবার অপরকে খ্যাপানো , ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা এককথায় জ্বালাতন করে মজা পাওয়া এটাও মানুষের প্রবৃত্তিজাত । অবশ্য‌ই কু । আজকে সামাজিক মাধ্যমের অভিধান যাকে ট্রোল বলছে সেটা তো সবাই মিলে বা অনেকে মিলে একজনকে খেপিয়ে তোলা ছাড়া আর কিছু নয় । গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে অন্যকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা সমাজে নতুন কিছু নয় । আমাদের শৈশব কৈশোরে ফেসবুকের নামগন্ধ ছিল না। কিন্তু পাড়ায় , স্কুলে উত্যক্ত করার মতো লক্ষ্যবস্তুর অভাব ছিল না । একটু ছিটেল গোছের । পাগলাটে । তিরিক্ষে মেজাজের । খিটখিটে কিম্বা একটু বেশিই কৃপণ, সরস্বতী পুজোর চাঁদা চাইতে গেলে খ্যাক খ্যাক করে তাড়িয়ে দেয় । এরকম মানুষকে দল বেঁধে পেছন থেকে খেপিয়ে হাহা হিহি করতে করতে সটকে পড়া ছিল শৈশব কৈশোরের অনিবার্য অনুষঙ্গ । 

আগে সোস্যাল সাইট ছিল না। কিন্তু মানুষের বিটলে বুদ্ধির অভাব ছিল না। কাঙ্ক্ষিত চাঁদা না পেলে বাড়ির উঠোনে গু লেপ্টে দেওয়া থেকে গাছের ডাব রাতারাতি ভ্যানিশ করার দক্ষতা পাড়ার ছেলেদের ছিল। এমনকী বেনামে কার‌ও বাড়িতে ডাকাত পড়ার হুমকি পোস্টকার্ড পাঠিয়ে মজা দেখার ঘটনাও বিরল ছিল না। প্রতিদ্বন্দ্বীকে খিস্তি খেউড় , প্রতিপক্ষকে নিয়ে গান বানানো , ছড়া কাটা নতুন কিছু নয়। হিন্দু কলেজের ছাদে দাঁড়িয়ে ডিরোজিওর ছেলেরা পথ চলতি বামুনদের ডেকে ডেকে নানা অঙ্গ ভঙ্গি সহযোগে বলত এই যে দ্যাখো আমরা গো মাংস খাই । রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে যে ছড়া রক্ষণশীল বামুনেরা বানিয়েছিল তা তো আজ‌ও লোকে মনে রেখেছে-  

” ব্যাটা সরাই মেলের কুল/ব্যাটার বাড়ি খানাকুল,/ব্যাটা সর্বনাশের মূল।/ওঁ তৎ সৎ বলে ব্যাটা বানিয়েছে ইস্কুল/ও সে, জেতের দফা করলে রফা/মজালে তিন কুল।’’

সমাজের বিশিষ্টদের নিয়ে গুঞ্জন , গুজব চিরকালই ছিল, বিশেষ করে তাতে যদি থাকে আদিরসের অনুপান তাহলে আমজনতাকে কোনও কালেই দাবায়া রাখা সম্ভব নয়। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে কলকাতার ভদ্রলোকেরা নিজ নিজ কর্মস্থলে এসে সহকর্মীদের সঙ্গে তৎকালীন সমাজের সেলিব্রেটিদের নিয়ে কী গভীর ও উচ্চ গবেষণায় মাততো তার কিঞ্চিৎ আঁচ পাচ্ছি নীরদ সি চৌধুরীর “ বাঙালী জীবনে রমণী গ্রন্থে– 

” তাহার‌ও উপর আবার অসূয়া বা দ্বেষপ্রসূত নিন্দা আরম্ভ হ‌ইলে ষোল আনা বত্রিশ আনায় চড়িত । এক উচ্চশিক্ষিত ভদ্রব্যক্তি একদিন আমাকে কলিকাতার একজন বিশেষ গণ্যমান্য , বিদ্বান ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সম্বন্ধে বলিলেন , ” ও তো মাসতুতো বোনের পেট করেছিল । ” আমি কথাটা উড়াইয়া দেওয়াতে বলিলেন, ” আমি আই-উইটনেস এনে দেব “। তখন আমি না বলিয়া পারিলাম না , ” কেউ যে কার‌ও পেট আই-উইটনেস রেখে করে তা তো আমার জানা ছিল না। ” তখন তিনি আমাকে বলিলেন, যে দাই গর্ভপাত করাইয়াছিল , তাহার সাক্ষ্যের কথা তিনি বলিতেছেন ।” 

আর একজন আমাকে একদিন কলিকাতার আর এক সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক সম্বন্ধে বলিলেন , ” ও তো ভাইঝির সঙ্গে শোয় । ” ইহাও আমি অবিশ্বাস করাতে আপত্তি অগ্রাহ্য করিলেন , তবে ভাইঝির সাফাই হিসাবে বলিলেন, ” ওর স্বামীর অমুক স্থানে গোদ । তা বলে কি মেয়ে খালি পেটে বসে থাকবে ? ” 

ইহাদের পরস্পরের কথামত কলিকাতার প্রত্যেকটি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিই হয় জারজ নয় পরস্ত্রীরত , নয় অন্যরকম অপরাধে অপরাধী । ” 

বিষয়বস্তু এক, পার্থক্য একটাই তখন সামাজিক মাধ্যম ছিল না তাই সিটিজেনদের ট্রোল একালের নেটিজেনদের মতো সর্বব্যাপী বিস্তৃত ছিল না। আজকাল পাতি কেরানিও ট্যুইটারে ঢুকে অমিতাভ বচ্চনকে পর্যন্ত অবলীলায় হুল ফুটিয়ে আসতে পারে ।‌ আগেকার দিনে গালিগালাজ ব্যাপারটা স্থানিক ছিল তাই তার ঝাঁঝ বেশি দূর গড়াত না। আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় সোস্যাল সাইটস গোটা পৃথিবীটাকেই একটি মাত্র কলতলা বানিয়ে ছেড়েছে ।‌ সমাজের সেলিব্রেটিরা পর্যন্ত দরজা বন্ধ করে রেহাই পান না শেষে সোস্যাল অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে কেঁদে বাঁচেন । 

সামাজিক মাধ্যমে ট্রোলের থেকেও অনেক বেশি বিপজ্জনক ফেসবুক , ইউটিউবে প্রকাশ্যে খুনের হুমকি দেওয়া। নাস্তিক , মুরতাদ , মুশরিক , বিধর্মী , অবিশ্বাসী , অজ্ঞেয়বাদী , ভিন্ন মত ও পথের অনুসারী এবং সমালোচকদের প্রকাশ্যেই খুন করার ভিডিও গুলো ফেসবুক, ইউটিউব অথরিটি কীভাবে সম্প্রচারের ছাড়পত্র দেয় প্রত্যেকটি দেশের সরকারের এই প্রশ্ন তোলার সময় এসে গেছে । এই দুই নেটওয়ার্কের মালিকপক্ষ যদি হুমকি ধামকির ভিডিও আপলোড বন্ধ করতে ব্যর্থ হয় তবে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া এমনকি তা কার্যে পরিণত করার অধিকার‌ও রাষ্ট্রের আছে। থাকা উচিত । 

Image Courtesy- yourstory.com 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *