কালের পথ ধরে কালীপুজো


বাঙালি কালী অন্ত প্রাণ । কিন্তু কালীতত্ত্ব  সহজ নয় । যদিও ভক্ত তাঁকে পায় শর্তহীন সমর্পণ ও নিরঙ্কুশ ভক্তির জোরেই । আর জ্ঞানী তাঁকে খোঁজে পরম তত্ত্বে । তন্ত্রের দীর্ঘ পথ ধরে কীভাবে বাঙালির জীবনধারায়  আদি মাতৃকা , আদ্যাশক্তি মাকালীর আবির্ভাব – মায়ের মহাপুজোর দিনে সেই কথাই তুলে ধরলেন গবেষক ডঃ তমাল দাশগুপ্ত    

হরপ্পা সভ্যতার অন্তর্গত ঝোব উপত্যকায় আনুমানিক ৫০০০/৪৫০০ বছর পুরোনো ভীষণ মাতৃকামূর্তি পাওয়া যায়, যার রূপে ভয়াভয় (ভয়+অভয়) বৈশিষ্ট্য আছে, যা আমি কালীর মূর্তিকল্পনার চিরন্তন অবয়ব বলে ধরি। এরপর ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্তে একজন মাতৃকার আবছা আদল, যিনি রাত্রির সঙ্গে সমার্থক। মণ্ডুক উপনিষদে অগ্নির সাতটি জিভের মধ্যে কালী ও করালী। মহাভারতে সৌপ্তিক পর্বে দেখা যায় মা কালীকে, কোনও সংস্কৃত সোর্সে এটাই প্রথম, যে মাতৃকার রূপটি দেখা গেল, এখানে তাকে দেখে অতীব ভয়ানক মৃত্যুদেবতা মনে হয়। পাণ্ডব শিবিরে ঢুকে অশ্বত্থামা তখন পাণ্ডবপুত্রদের হত্যা করছে…

ওই মহাভারতেই শল্যপর্বে দুর্গাস্তবে কালীর উল্লেখ আছে, দুর্গাকে উপাসনা করার সময়ে কালীর নাম নেওয়া হল।

এরপর কালিদাস। রামের সঙ্গে লড়তে গিয়ে তাড়কা রাক্ষসী কালীরূপ ধারণ করে যুদ্ধ করেছিল। এ থেকে আর্যাবর্তের কালীকল্পনা বোঝা যায়। আবার কুমারসম্ভবে শিবের বরযাত্রীর মধ্যে কালী রয়েছেন, মানে শিবের ভূত-প্রেতদের সঙ্গে তিনি। ভিড়ের মধ্যে এক্সট্রা বলতে পারেন। হ্যাঁ, বৈদিক-পৌরাণিক আর্যের কালীকল্পনা। কিন্তু কালী আর্যাবর্তর নন, তিনি আমাদের ব্রাত্যদের মাতৃকা।

হরপ্পা সভ্যতায় ঊষার উপাসনা প্রচলিত ছিল প্রমাণ আছে। এবং ঊষার সঙ্গেই নিশার উপাসনা হত।

কালী প্রাচীন। নিশার রূপ। হরপ্পা সভ্যতায় বোধন হত উষার। এই দীপান্বিতা অমাবস্যায় নিশার উপাসনা হত কিনা, সেটার কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। কিন্তু, কয়েকটা আশ্চর্য ইঙ্গিত।

আদি সাংখ্য প্রকৃতি প্রধান ছিল, এই দর্শন ছিল ত্রিবর্গ-কেন্দ্রিক, ধর্ম অর্থ কাম ছিল উদ্দেশ্য।  ধ্রুপদী সাংখ্যেও প্রকৃতি সর্বময়ী জগদকারণ কিন্তু অপবর্গ বা মোক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল। দীপান্বিতা অমাবস্যার সঙ্গে এই কৈবল্যধারণার গুরুত্ব। জৈনরা বলতেন যে এই দিনে মহাবীর মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন, সেজন্য আলোকমালা জ্বালিয়ে সেই ঘটনার উদযাপন হত।

স্পষ্টই, আলোকমালা জ্বালিয়ে এই দিনটির উদযাপনের তাৎপর্য প্রাচীন। এটাই ব্রাহ্মণ্যধর্মে রামের অযোধ্যায় ফিরে আসা, ফলে প্রজাদের আলো জ্বালিয়ে উৎসব। পরবর্তী ধর্মগুলো উপমহাদেশের একটি প্রাচীন উৎসবকে নিজের নিজের মত করে গড়েপিটে নিচ্ছে।

কৃষ্ণচন্দ্র মধ্যযুগের শেষে দীপান্বিতা কালীপুজো পুনর্প্রচলন করেন, কারণ ত্রয়োদশ শতকের বৃহদ্ধর্মপুরাণে যে শুধু কালীমূর্তির বিবরণ পাই (আগমবাগীশের তিনশো বছর আগেই কালীমূর্তির বর্তমান রূপটি ছিল) তাই নয়, সেখানে দীপান্বিতায় কালীপুজোর বিবরণ পাওয়া যায়।

পালযুগে নৈরাত্মার উপাসনা হত এই দিনে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাচ্ছি, কারণ এই দিনটি কৈবল্য, মোক্ষ, অপবর্গের। এটা দার্শনিক। একটা খুব গোদা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হতে পারে যে বিজয়ার দিন যুদ্ধযাত্রা করে একটানা অনেক শত্রুনিপাত করে এইদিন সেই মুণ্ড সাজিয়ে মালা গেঁথে মাকে নিবেদন করা হত। এমনি এমনি এতগুলো ভারতজোড়া সাম্রাজ্য গড়েনি বাঙালি। 

কালীকেন্দ্রিকতা দশম শতকে শুরু। এই সময়ে প্রথম একটা তান্ত্রিক গ্রন্থে (মহাকালসংহিতা) বলা হয়েছে যে কালীই সর্বময়ী। বলা দরকার প্রকৃতিমাতৃকার এই সর্বময়ী রূপটি আমাদের ব্রাত্যদের মধ্যে প্রথম থেকেই উপাস্য। কিন্তু কালী নামেই, কালী রূপেই আদি মাতৃকার সর্বোচ্চ স্ফুরণের ইঙ্গিত দশম শতক থেকে ঘটতে থাকে। পালযুগে বজ্রযানে একাধিক মাতৃকার মিশ্রণ কালী। তার মধ্যে বজ্রযোগিনীর মণ্ডলে থাকা শ্যামবর্ণা ডাকিনীর সঙ্গে আশ্চর্য মিল, এছাড়া নৈরাত্মার কথা আগে বলেছি, এবং অক্ষোভ্যকুলের একাধিক দেবতা যারা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বিভিন্ন দেবদেবীকে পদদলিত করেন, তাঁরা কালীপুজোর ইতিহাসে সম্পৃক্ত আছেন।

পালযুগের চামুণ্ডা/চর্চিকার উপাসনাও মিশে, কারণ চামুণ্ডার সঙ্গেও এই কৈবল্যসংযোগ। দন্তুরা চামুণ্ডা মূর্তি যারা দেখেছেন বুঝবেন। 

এছাড়া তারার একাধিক রূপ মিশে আছে এই কালীরূপে। মহাচীনতারা নামে যাঁকে উপাসনা করা হত পালযুগে, তিনি তারাপীঠে পূজিত হতেন ভাবা যায় কারণ বশিষ্ঠ-সংক্রান্ত কাহিনী থেকে সেরকম ইঙ্গিত আছে। 

বাকি জাতিগুলোর মত আমাদের কপাল নয়। কারণ আমাদের প্রাচীন মাতৃকারা বারবার ধ্বংস হয়েছেন, বারবার খণ্ডহর থেকে মাথা তুলতে হয়েছে আমাদের। তার মধ্যেই যে পালযুগ থেকে আজ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে তারাপীঠে পুজো হচ্ছে মা তারার, এটি স্বস্তি দেয়।

পাণ্ডু রাজার ঢিবি এবং চন্দ্রকেতুগড়ের বলাকা মাতৃকার উপাসনা হত, এবং হেমন্ত বা  নবান্নে এই পক্ষীমাতৃকাকে প্রথম শস্যজাত খাদ্য নিবেদন করার প্রথা আছে আজও গ্রামবাংলায়, জানতে পাচ্ছি। পক্ষীমাতৃকাই কালী হয়েছেন, কাজেই এই হৈমন্তিক উৎসব, এই কার্তিকী অমাবস্যায় উপাসনা বাঙালির মধ্যে প্রথম থেকে আছে, এবং হরপ্পা সভ্যতায় ঊষার বোধন দিয়ে যা শুরু, নিশার উপাসনায় শেষ হত।

দুর্গা থেকে কালীপুজো একটানা ছুটি পাওয়া যাবে এজন্য কৃষ্ণচন্দ্র প্রচলন করেন নি। বাঙালি তখনও কেরানির জাত হয়নি। শেকড়ে ফেরার একটা প্রয়াস ছিল, কৃষ্ণচন্দ্রকে সেজন্য সাধুবাদ দিচ্ছি। কালী অতি প্রাচীন শেকড়। দীপান্বিতায় কৈবল্যদায়িনী কালীর উপাসনা অতি প্রাচীন। ল্যান্ডমার্কগুলো এরকম-

আনুমানিক ৫০০০ বছর আগে – হরপ্পা সভ্যতায় নিশার উপাসনা।

আনুমানিক ৪০০০ বছর আগে – পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে পক্ষীমাতৃকা।

আনুমানিক ২৩০০ বছর আগে – চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতায় পক্ষীমাতৃকার উপাসনা।

গুপ্তোত্তর যুগ (জয়নাগ ও শশাঙ্ক, আনুমানিক ১৪২৭ বছর আগে) – নীলাবতীর উপাসনা। নীলাবতীর সঙ্গে শিবের সংযোগকল্পনা। এর আগেই গুপ্তযুগে অবশ্য শিবলিঙ্গে গৌরীপট্ট সংযোগ শুরু। গুপ্তপূর্ব যুগে শিবলিঙ্গ হত গৌরীপট্টবিহীন। শিশ্ন উপাসকরা হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকে আছে। এখানে বলে রাখি, বৈষ্ণবভাগবতধর্ম অতি প্রাচীন কালেই চক্র বা বলয় চিহ্নের উদযাপনে এই মাতৃকাধর্মের একটি সিম্বলকে কাজে লাগিয়েছিল। চন্দ্রকেতুগড় সভ্যতার একশৃঙ্গা মাতৃকা, কৃষ্ণবলরামের ভগ্নী একনংশা, এবং পালযুগের একজটার সঙ্গে বৈষ্ণব সংযোগ।

পালযুগ (১২৫০ বছর আগে)। চামুণ্ডা উপাসনা, নৈরাত্মা উপাসনা, তারা উপাসনা, বজ্রযোগিনী উপাসনা, – এই সবকিছুর ওপরে জ্ঞানী মাতৃকা বা ডাকিনীর কাল্ট থেকে কালীর বর্তমান মূর্তিরূপের উত্থান ঘটল।

সেনযুগ (৮৫০ বছর আগে) – বল্লালসেন কালী উপাসনায় উৎসাহ দিলেন।

মধ্যযুগ (৮০০/৭৫০ বছর আগে) – বৃহদ্ধর্মপুরাণে  এখনকার মত কালীমূর্তি ও দীপান্বিতা কালীপুজোর উল্লেখ।

চৈতন্য-নিত্যানন্দ পরবর্তী যুগ (৫০০ বছর আগে) – আগমবাগীশ বিশেষ করে গোঁড়া ব্রাহ্মণদের মধ্যেও কালীপুজোর প্রচলন ঘটালেন।

বারোভুঁইয়া যুগ (৪৫০ বছর আগে) – রাজা কেদার ও রাজা প্রতাপাদিত্যর উদ্যোগে কালীপুজো বিশেষভাবে প্রচলিত হল। এই সময়েই বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের প্রভাবে গুহ্য বিকৃতি কাটিয়ে ওঠার শুরু। ব্রহ্মানন্দের শাক্তানন্দ তরঙ্গিণী মাতৃকাকে আদ্যা ও নিত্যা ঘোষণা করায় আদিমাতৃকার রূপটি স্পষ্ট হল।

কৃষ্ণচন্দ্র যুগ (৩০০ বছর আগে) – রামপ্রসাদের ভক্তি আন্দোলন। অবশেষে গুহ্য বিকৃতি কাটিয়ে গণসামাজিক কালী উপাসনার প্রচলন।  কৃষ্ণচন্দ্রের উদ্যোগে রাজ্যমধ্যে দশ সহস্র  দীপান্বিতা কালীপুজো শুরু। কাশীনাথের কালীসপর্যাবিধি গ্রন্থে দীপান্বিতা কালীপুজোর শাস্ত্রীর ব্যাখ্যা ও বিধি। 

               পালযুগের একটি মাতৃকামূর্তী 



লেখক পরিচিতি-                  

                                                                  

ডঃ তমাল দাশগুপ্ত দিল্লিবিশ্ববিদ্যালয়েরএকটি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপনায় নিয়োজিত সপ্তডিঙা পত্রিকা, জার্নাল অভবেঙ্গলি স্টাডিজ মাৎস্যন্যায় ব্লগজাইন নামকতিনটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সপ্তডিঙা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তিনি নিজেকে বাঙালিআত্মপরিচয়ের সন্ধানে নিয়োজিত একজনইতিহাসশ্রমিক ভাষাকৃষক হিসেবেপরিচয় দিতে ভালবাসেন  

 

  

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *