বিশ্ব গন্ডার দিবস: জলদাপাড়া-গরুমারায় বেড়েছে গন্ডারের সংখ্যা!


ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার বা ‘গ্রেটার ওয়ান হর্নড রাইনোসেরস’ IUCN-এর লাল তালিকা অনুযায়ী বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রাণী। তবে আশার কথা, জলদাপাড়া ও গরুমারা জাতীয় উদ্যানে গন্ডারের সংখ্যা বেড়েছে। লিখলেন অরুণ কুমার

গন্ডার মানেই শুধু বিশাল শরীর, শক্ত চামড়া কিংবা কপালের একখানি শিং নয়। গন্ডার একটি জীবন্ত বাস্তুতান্ত্রিক সূচক। একটি সুস্থ গন্ডার-আবাসস্থল মানে সুস্থ তৃণভূমি, জলাভূমি, নদী, জলাশয় ও বনভূমির সহাবস্থান। তাই গন্ডার রক্ষা করা মানে আসলে একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।

প্রতি বছর ২২ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব গন্ডার দিবস। বিশ্বের পাঁচ প্রজাতির গন্ডার সংরক্ষণ, চোরাশিকার রোধ এবং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই দিনের মূল উদ্দেশ্য। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে WWF-এর উদ্যোগে এই সচেতনতা কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিস্তৃত হয়।

ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার বা ‘গ্রেটার ওয়ান হর্নড রাইনোসেরস’-এর আবাসস্থল হিসেবে প্রসিদ্ধ ডুয়ার্সের জলদাপাড়া ও গরুমারা জাতীয় উদ্যান। ছবি: নিজস্ব।

ভারতে একশৃঙ্গ গন্ডার বা Greater One-horned Rhinoceros সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স। জলদাপাড়া ও গরুমারা এই প্রজাতির প্রধান আবাসস্থল। ২০২৫ সালের মার্চে পরিচালিত সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী উত্তরবঙ্গে গন্ডারের সংখ্যা ৩৯২ (±৬)—জলদাপাড়ায় প্রায় ৩৩১ এবং গরুমারায় ৬১টি। শুমারিটি দুই বনাঞ্চলের মোট ৯৯টি গণনা-ব্লক ও প্রায় ৩৯৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে পরিচালিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে জলদাপাড়া ও গরুমারা মিলিয়ে সংখ্যা ছিল ২২৯। অর্থাৎ এক যুগে সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এটি অবশ্যই সংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের বার্তা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, গন্ডারের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাদের তৃণভূমি কি একই অনুপাতে বাড়ছে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গন্ডারের প্রধান খাদ্য ঘাস, কচি পাতা, জলজ উদ্ভিদসহ বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাদ্য। নদী, জলাশয় ও উন্মুক্ত তৃণভূমি তাদের জীবনধারণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। অথচ নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূমিক্ষয়, আগ্রাসী উদ্ভিদের বিস্তার এবং তৃণভূমিতে অতিরিক্ত ঝোপঝাড় ও বৃক্ষের অনুপ্রবেশ খাদ্যভূমির পরিমাণ ও গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে।

অতীতের সরকারি অডিট নথিতেও জলদাপাড়া ও গরুমারায় পর্যাপ্ত তৃণভূমি সংরক্ষণকে ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ গন্ডার বাড়ার সঙ্গে তাদের খাদ্যভূমি ও আবাসস্থলের ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন থেকেই ভাবার সময় এসেছে। কারণ প্রকৃতির হিসাব শুধু সংখ্যায় হয় না। ১০০টি গন্ডারের জন্য যে পরিমাণ তৃণভূমি যথেষ্ট, ৩০০ বা ৪০০টির জন্য তা একই থাকবে না।

তাই গন্ডার গণনার পাশাপাশি দরকার তৃণভূমির গণনা। কতটা তৃণভূমি রয়েছে? তার কতটা প্রকৃত খাদ্যভূমি? কোথায় জলাভূমি সংকুচিত হচ্ছে? কোথায় আগ্রাসী উদ্ভিদ বাড়ছে? গন্ডারের চলাচলের করিডর কতটা নিরাপদ? আগামী দশকগুলিতে এই আবাসস্থলের ধারণক্ষমতা বা carrying capacity কতটা?

এসব প্রশ্নের উত্তর বৈজ্ঞানিকভাবে খুঁজে বের করতেই হবে।কারণ শুধু সংখ্যা বাড়িয়ে সংরক্ষণ সাফল্য মাপা যাবে না। সংখ্যার সঙ্গে আবাসস্থলের ভারসাম্য না থাকলে আজকের সাফল্যই আগামী দিনের সংকট হয়ে উঠতে পারে। খাদ্যের জন্য গন্ডার সংরক্ষিত এলাকার বাইরে চলে গেলে মানুষ-গন্ডার সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য ও জল নিয়ে প্রতিযোগিতা, রোগের ঝুঁকি এবং প্রজনন ব্যবস্থাপনাতেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

সরকারের দায়িত্ব শুধু শুমারি করা নয়; নিয়মিত বৈজ্ঞানিকভাবে তৃণভূমি, জলাভূমি, খাদ্যভান্ডার, জলসম্পদ, আবাসস্থলের সংযোগ এবং ধারণক্ষমতা মূল্যায়ন করা। প্রয়োজনে তৃণভূমি পুনরুদ্ধার, আগ্রাসী উদ্ভিদ নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন নিরাপদ আবাসস্থল তৈরির পরিকল্পনা নিতে হবে।

পরিবেশ সংস্থা ও গবেষকদের আরও বেশি মাঠভিত্তিক গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। স্থানীয় মানুষকে সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে—কারণ বন ও বন্যপ্রাণীকে দূর থেকে রক্ষা করা যায় না, মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সম্ভব নয়।

আর আমাদের, সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্ব কম নয়। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে, প্লাস্টিক ও দূষণ কমাতে হবে, অবৈধ শিকার বা বন্যপ্রাণী পাচারের তথ্য প্রশাসনকে জানাতে হবে এবং পর্যটনের নামে প্রকৃতির ক্ষতি না করে দায়িত্বশীল পর্যটনকে উৎসাহিত করতে হবে।

ডুয়ার্সের অরণ্যে গন্ডারের সংখ্যা বাড়লেও তৃণভূমি বাড়ে নি। গন্ডারের অস্তিত্বের জন্য বিষয়টা উদ্বেগের। ছবি: নিজস্ব।

মনে রাখতে হবে গন্ডার শুধু জঙ্গলের প্রাণী নয়; সে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রহরী। তাই আজকের দিনে শুধু গন্ডারের ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রশ্ন তুলতে হবে, সচেতন হতে হবে, প্রশাসনের কাছে জবাব চাইতে হবে এবং সংরক্ষণে নিজের ভূমিকা পালন করতে হবে। ৩৯২টি গন্ডার আমাদের আশার সংখ্যা। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ৩৯২টির জন্য আমরা কতটা নিরাপদ তৃণভূমি, জলাভূমি, খাদ্য, জল ও চলাচলের পরিসর নিশ্চিত করতে পারছি তার ওপর।

নদী-জলাভূমি বাঁচান। ডুয়ার্সের বাস্তুতন্ত্র বাঁচান। কারণ গন্ডার হারালে শুধু একটি প্রাণী হারাবে না—হারাবে একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত পৃথিবী। আর সেই পৃথিবী হারানোর মূল্য দিতে হবে আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্মকে। সেই সঙ্গে সরকার ও সাধারণ নাগরিকের করণীয় রয়েছে অনেক কিছু। গন্ডার সংরক্ষণে সরকারের দায়িত্ব শুধু সংখ্যা গণনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিয়মিত গন্ডার ও তৃণভূমির বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, খাদ্যভূমির ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, তৃণভূমি পুনরুদ্ধার, আগ্রাসী উদ্ভিদ নিয়ন্ত্রণ, জলাভূমি রক্ষা এবং নিরাপদ চলাচলের করিডর নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ সংস্থা ও গবেষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা নিতে হবে।

সাধারণ নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে দূষণ ও প্লাস্টিক বর্জন, অবৈধ শিকার বা পাচারের তথ্য প্রশাসনকে জানানো এবং দায়িত্বশীল পর্যটনকে উৎসাহিত করা জরুরি। আজ গন্ডারের পাশে দাঁড়ানো মানে আগামী প্রজন্মের প্রকৃতির পাশে দাঁড়ানো। আসুন, গন্ডার নয়—তার তৃণভূমি, জলাভূমি ও সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকেও রক্ষা করার অঙ্গীকার করি।

পরিবেশ সংস্থাগুলির ভূমিকা হবে সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে গন্ডার ও তৃণভূমির বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও তথ্যসংগ্রহ করা। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো, সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা, অবৈধ শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং তৃণভূমি পুনরুদ্ধারে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়াও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তথ্যসূত্র:
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তর এর সরকারি ওয়েবসাইট।

প্রতিনিধিত্বমূলক ফিচার ইমেজটি এআই জেনারেটেড।

লেখক পরিচিতি: অরুণ কুমার। প্রবীণ সাংবাদিক। সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত। ইকো ট্যুরিজম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্সের আনাচকানাচে নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com