বীরত্বে নেপোলিয়নের সমকক্ষ অথচ বঙ্গে উপেক্ষিত কোচ সাম্রাজ্যের মহান সেনাপতি চিলারায়


চিলারায়ের জীবনী, কর্মকান্ড ও রণকৌশল পশ্চিমবঙ্গের স্কুল, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরের ইতিহাসের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। লিখলেন অরুণ কুমার

পিতৃদত্ত নাম ছিল শুক্লধ্বজ, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আর রাজবংশী জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন চিলারায় নামে। বীরশ্রেষ্ঠ সেনাপতি চিলারায়। তাঁকে বিশ্ববীর‌ও বলা হয়। বীর চিলারায়কে না জানলে আমাদের ইতিহাস চর্চা, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত, উত্তরবঙ্গের ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।‌ কোচ রাজ্যের উত্থান, স্থিতি, প্রতিরক্ষা ও সম্প্রসারণের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে যাঁর নাম, তিনিই সেনাপতি শুক্লধ্বজ চিলারায়।

সেনাপতি শুক্লধ্বজ কীভাবে চিলারায় নামে পরিচিত হলেন, সেই ইতিহাসটা আগে একটু জেনে নেওয়া যাক। অসমীয়া ভাষায় ঘুড়ির নাম চিলা। সেই চিলাই কোনওভাবে শুক্লধ্বজের নামের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে বলে অনেক গবেষক মনে করেন। আবার শুক্লধ্বজের যুদ্ধের কৌশল ছিল অত্যন্ত দ্রুত। শত্রুর ওপর তাঁর বাহিনী যে গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তা অনেকটা আকাশ থেকে শিকারের সন্ধানে নেমে আসা চিলের মতোই। কামতাপুরি ভাষায় চিলকে চিলা বলা হয়। সেই কারণেই নাকি শুক্লধ্বজের নাম হয়ে যায় চিলারায়!— অর্থাৎ ‘চিলের মতো দ্রুত আক্রমণকারী’। কেউ কেউ আবার বলেন, প্রজারা তাঁকে ‘চিলারায় দেওয়ান’ নামে ডাকত। প্রজাদের দেওয়া চিলারায়ই কালক্রমে শুক্লধ্বজের লোকপ্রিয় নাম হয়ে দাঁড়ায়।

চিলারায় নিঃসন্দেহে একজন সফলতম সেনানায়ক। কিন্তু এতেই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ নয়। শুক্লধ্বজের শাস্ত্রজ্ঞান, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করার ক্ষমতাও ছিল অসামান্য। তিনি দয়ালু, মানবিক গুণসম্পন্ন ও প্রজাদরদী শাসক ছিলেন। কোচ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহারাজা বিশ্ব সি়ংহ। বিশ্ব সিংহের তৃতীয় পুত্রই শুক্লধ্বজ। ১৫১০ খ্রিস্টাব্দের মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি ধরায় আসেন বলে প্রচলিত আছে। মহারাজ নরনারায়ণ ছিলেন চিলারায়ের অগ্রজ। চিলারায়ের মায়ের নাম পদ্মাবতী, তিনি গৌড়ের কন্যা ছিলেন বলে লোকশ্রুতি।

নরনারায়ণ এবং শুক্লধ্বজ— দুই পুত্রকেই উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বারাণসীতে পাঠিয়েছিলেন মহারাজ বিশ্ব সিংহ। ব্রহ্মানন্দ বিশারদ নামে এক যোগীপুরুষ শুক্লধ্বজকে ধর্মশাস্ত্র, দর্শন, রাষ্ট্রতত্ত্ব, রাজ্য পরিচালনা এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলেন। বিশ্ব সিংহ যখন প্রাণত্যাগ করলেন, তখন দুই ভাই কাশীতে। পিতার সিংহাসনে আরোহণ করেন মহারাজার জ্যেষ্ঠ সন্তান নর সিংহ। পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বারাণসী থেকে রাজধানীতে ফিরে নর সিংহকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করেন দুই ভাই। ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে নরনারায়ণের রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়। অনুজ চিলারায়কে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দেন মহারাজা নরনারায়ণ।

অগ্রজের সাম্রাজ্যকে রক্ষা ও সম্প্রসারণের জন্য বীর চিলারায় আমৃত্যু যা করে গেছেন, তা রাজবংশী জনগোষ্ঠীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সবথেকে উল্লেখযোগ্য অংশ। নরনারায়ণ ছিলেন কোচ সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থার প্রধান, আর চিলারায় ছিলেন সেই শাসনব্যবস্থার সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাঁদের মধ্যে যে পারস্পরিক আস্থা ও সৌভ্রাতৃত্ব ছিল, তা মধ্যযুগীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

সেনানায়ক চিলারায়: বীরত্ব ও রণকৌশলে যিনি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের সমতুল্য। স্কেচ: এআই জেনারেটেড।

চিলারায়ের সামরিক জীবনের সবথেকে বড় সাফল্য অহমরাজকে নাস্তানাবুদ করা। ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে চিলারায়ের সেনাপতিত্বে কোচ বাহিনী অহম রাজ্য আক্রমণ করে অহমের রাজধানী গড়গাঁও পর্যন্ত দখল করে নেয়। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে মাজুলি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে অহম রাজ্যের ওপর কোচ সাম্রাজ্যের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণবাবদ প্রভূত ভূখন্ড ও সম্পদ লাভ হয় মহারাজা নরনারায়ণের।

এরপর থেকে অপ্রতিরোদ্ধ হয়ে ওঠে বীর সেনাপতি শুক্লধ্বজের বিজয়রথ। একের পর এক যুদ্ধ জয় করে তিনি ছিনিয়ে নেন কাছাড়, মণিপুর, জয়ন্তীয়া, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট, খাইরাম, চট্টগ্রাম এবং ডিমুরিয়া সহ বহু অঞ্চল। সব মিলিয়ে চিলারায়ের সামরিক কর্মকাণ্ড উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন এনেছিল বলে ঐতিহাসিকেরা মেনে নিয়েছেন।

গৌড়ের কররানী রাজবংশের সুলতান সুলায়মান খান কররানীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন মোহাম্মদ ফর্মুলী, হিন্দুরা যাঁকে ‘কালাপাহাড়’ বলত। কালাপাহাড় হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছিলেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে তাঁর নাম ছিল কালাচাঁদ রায় মতান্তরে রাজীবলোচন রায়। গৌড়ের সুলতান সুলায়মান খান কররানীর কন্যার প্রেমে পড়ে ধর্মত্যাগ করে মুসলমান হয়েছিলেন ব্রাহ্মণ কালাচাঁদ রায়। কালাচাঁদ থেকে কালাপাহাড় হয়ে বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন মোহাম্মদ ফর্মূলী। কোচ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানেও অভিযান চালিয়ে হিন্দুদের মন্দির ও উপাসনালয় ধ্বংস করছিল কালাপাহাড়।

কালাপাহাড়কে শায়েস্তা করতে গৌড় আক্রমণ করেছিলেন কোচরাজ মহারাজা নরনারায়ণ। যথারীতি অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তাঁর ছোটভাই শুক্লধ্বজ। দশ দিনের যুদ্ধ শেষে কোচ বাহিনী পরাজিত হয়। চিলারায়কে গৌড়ের সেনাবাহিনী বন্দী করেছিল বলে কোনও কোনও ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী কালে যদিও কোচদের পশ্চিমমুখী অভিযান এবং মুঘল শক্তির সঙ্গে সম্পর্কস্থাপন নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করে।

বীরশ্রেষ্ঠ চিলারায়ের মৃত্যুর স্থান-কাল ও কারণ নিয়ে মতবিরোধ আছে। সবথেকে বহুল প্রচলিত মতটি হল, গৌড় অভিযান শেষ করে আর ঘরে ফিরতে পারেন নি চিলারায়। গৌড় অঞ্চলেই গঙ্গার তীরে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। যদিও কোনও কোনও গবেষক মনে করেন ১৫৭২ থেকে ১৫৭৫-এর মধ্যে বীর চিলারায়ের মৃত্যু ঘটেছে।

সেনানায়ক চিলারায়ের সামরিক প্রতিভা আজও ঐতিহাসিকদের গবেষণার বিষয়বস্তু। দ্রুত আক্রমণ শানিয়ে শত্রুকে বিচলিত ও পর্যুদস্তু করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। গতি, শৃঙ্খলা, আকস্মিক আক্রমণ এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ছিল চিলারায়ের রণকৌশলের বৈশিষ্ট। দ্রুতগতির অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে এত আচমকা শত্রু সেনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন যে নিজেদের সংগঠিত করে প্রতিআক্রমণের সময় পেত না প্রতিপক্ষ। এই রণকৌশলের কারণেই সেনাপতি শুক্লধ্বজকে গেরিলা যুদ্ধের জনকদের একজন বলা হয়ে থাকে।

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক কৌশলবিদের তালিকায় ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, মারাঠা সম্রাট ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের পাশাপাশি কোচ রাজবংশের প্রধান সেনাপতি শুক্লধ্বজ চিলারায়কেও স্থান দিয়েছেন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়নবি।

বীর চিলারায় ছিলেন ষোড়শ শতকের উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সমর নায়ক। মহারাজা নরনারায়ণের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সেনাপতি চিলারায়ের সামরিক দক্ষতা— এই দুই ভাইয়ের সম্মিলিত শক্তিতে ষোড়শ শতকে কোচ রাজ্যের আয়তন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছিল।

চিলারায় ছিলেন একাধারে রাজপুত্র, সেনাপতি এবং কোচ সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান স্থপতি। ষোড়শ শতকে কোচ রাজশক্তির উত্থানের ইতিহাস বীরশ্রেষ্ঠ চিলারায়কে বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব নয়। দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের জনগণের বৃহত্তম অংশ বীর চিলারায় সম্পর্কে উদাসীন ও অজ্ঞ। চিলারায়ের জীবনী, কর্মকান্ড ও রণকৌশল পশ্চিমবঙ্গের স্কুল, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরের ইতিহাসের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

Feature graphic is representational and AI generated.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com