আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সীমান্ত নিয়ে দু দেশের মধ্যে যে সমস্যা বিরাজমান তা চট করে মিটে যাবে, এমন আশা বেজিং-দিল্লি কেউই করে না। তারপরেও তিক্ততা ভুলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করেতে চায় দুই দেশ। যদিও চিনাদের মন বোঝা সহজ নয়, তারপরেও সাম্প্রতিক সময়ে চিন সরকারের চালচলন দেখে মনে হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে তিক্ততা বাড়াতে আগ্রহী নয় তারা। ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সাত বছর পর ভারত সফরে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন মোদী। যদিও নরেন্দ্র মোদী আয়োজিত নৈশভোজে জিনপিং গরহাজির থাকায় বাংলাদেশের লুঙ্গি মিডিয়া কিঞ্চিৎ উৎফুল্ল হওয়ার কারণ খুঁজে পায়। তাদের অনেক দিনের আশা, চিন চিকেন নেক খায়া দিবে, আর তারা সেই সুযোগে সেভেন সিস্টার্স দখল নিয়া নিবে।
মোদীর ভোজসভায় শি হাজির না থাকলেও বাংলাদেশের লুঙ্গি মিডিয়ার হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, ব্রিকস সম্মেলন সেরে রবিবার খুশি মনেই দিল্লি ছেড়েছেন গোমরা মুখো জিনপিং। শি বেজিংয়ে ফিরতেই মোদী-জিনপিং বৈঠক নিয়ে মুখ খুলেছেন চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই। ওয়াং ই সাংবাদিকদের বলেছেন— বৈঠকে দুই রাষ্ট্রপ্রধান ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। ঐকমত্যটা কীসের উপর? উত্তর— দুই প্রতিবেশী পরস্পরের অংশীদার হবে। ওয়াং জানিয়েছেন, “মোদী ও জিনপিং দুই দেশের সম্পর্কের কৌশলগত এবং দীর্ঘমেয়াদী বিষয়গুলি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করেছেন। তাঁরা যে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন, তা হল ভারত এবং চিনকে পরস্পরের অংশীদার হতে হবে।”

চিন ও ভারত এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি। এই মুহূর্তে চিন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। চতুর্থ বৃহত্তম ভারত। ভারতের বাজারে চিনা পণ্যের বিরাট জোগান। সম্ভবত এ কথা মাথায় রেখেই মোদী-শি বৈঠক প্রসঙ্গে ওয়াং ই বলেছেন, “ভারত ও চিন যেন একে অপরের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পরস্পরকে সাহায্য করতে পারে এবং যৌথভাবে উন্নয়ন করতে পারে।” উল্লেখ করা দরকার যে, ওয়াং শুধু চিনের বিদেশমন্ত্রীই নন, চিনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও। ওয়াং সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী জিনপিংকে আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে, ভারত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। ভারত তার মাটিতে চিনা বিরোধী কোনও শক্তির তৎপরতা বরদাস্ত করবে না। মোদীর এই আশ্বাসকে মূল্য দিচ্ছে চিন সরকার।”
দোকলাম-গালোয়ানের তিক্ততা ভুলে চিন ভারতের সাথে সম্পর্ক উষ্ণ করতে চাইলে ভারত যে সদর্থক সাড়াই দেবে, দিল্লি বহুবার তা বুঝিয়ে দিয়েছে। শনিবার শির সঙ্গে বৈঠকে মোদী চিনের প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে বলেন, “দু’দেশকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংবেদনশীলতা এবং স্বার্থের উপর জোর দিতে হবে।” মোদী বলেন, অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকবেই কিন্তু তা যেন শেষ পর্যন্ত বিবাদে না গড়ায়। ভারত চায়, সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ থাকলেও যে কোনও পরিস্থিতিতে উত্তেজনা পরিহার করে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে যেদিন শি জিনপিং দিল্লিতে পা রাখলেন, সে’দিনই গুয়াংঝোউ-দিল্লি রুটে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত যাত্রী বিমান পরিষেবা চালু করার কথা ঘোষণা করেছে চিনা সাউদার্ন এয়ারলাইন্স। ছয় বছর পর এই রুটে আবার উড়ান স্বাভাবিক হতে চলেছে। কৈলাস-মানস সরোবরগামী ভারতীয় তীর্থযাত্রীদেরও ভারী সংখ্যায় ভিসা দেওয়া শুরু করেছে বেজিং। এই বিষয়গুলিকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের সূচক হিসেবেই দেখছে কূটনৈতিক মহল।
অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চিনের অবস্থান বদলায় নি। মাঝেমধ্যেই অরুণাচলকে ঘিরে উস্কানিমূলক নানা পদক্ষেপ করে চিনা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারপরেও ২০২৪-এ রাশিয়ার কাজান, ২০২৫-এ চিনের তিয়ানজিন এবং ২০২৬-এ নয়াদিল্লিতে মুখোমুখি বৈঠকে বসেছেন শি এবং মোদী। পর পর তিন বছরে তিনবার এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি, যারা কিনা বিবদমান প্রতিবেশি; তাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক প্রমাণ করে, সংঘাতের চাইতে সহাবস্থানেই দুই পক্ষের আগ্রহ বেশি।
Feature image: collected.