ইন্দিরার সঞ্জয় হোক আর মমতার অভিষেক, অন্ধস্নেহেই রাজত্ব নাশ! ধৃতরাষ্ট্রকে দেখে থেকে শিক্ষা নেন নি কেউই

ইন্দিরার সঞ্জয় হোক আর মমতার অভিষেক, অন্ধস্নেহেই রাজত্ব নাশ! ধৃতরাষ্ট্রকে দেখে থেকে শিক্ষা নেন নি কেউই


যুগে যুগে অন্ধস্নেহ রাজা ও রাজত্বকে ধ্বংস করেছে। এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও অন্ধস্নেহ অনেক নেতার পতনের কারণ হয়েছে। বিশেষ প্রতিবেদন-

স্নেহ ভাল কিন্তু অন্ধস্নেহ অতি বিষম বস্তু। অন্ধস্নেহ বংশকে ধ্বংস করে, রাজত্বকে নাশ। কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র চর্মচক্ষে অন্ধ ছিলেন। পুত্রস্নেহেও অন্ধ ছিলেন তিনি। দুর্যোধনের ব্যাপারে ধৃতরাষ্ট্রকে বহুবার সতর্ক করেছিলেন বিদূর, ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য এমনকি ভগবান শ্রীকৃষ্ণও। ধৃতরাষ্ট্র দেখছি, দেখব করে পুত্রকে কোন‌ও দিন‌ই আর শাসন করেন নি।‌ অন্ধস্নেহের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন কুরুরাজ। দুর্যোধন শেষ পর্যন্ত কুরুবংশ ও কৌরবকুলের রাজত্ব ধ্বংসের কারণ হন। দুর্যোধনের ক্রোধ, ঈর্ষা এবং ঔদ্ধত্য কৌরবদের পতন ঘটিয়েছিল। কিন্তু পিতা ধৃতরাষ্ট্রের চোখে পুত্রের দোষত্রুটি ধরা পড়ে নি। পুত্রস্নেহ তাঁর অন্তর্দৃষ্টি অন্ধ করে রেখেছিল।

কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র শুধু চর্মচক্ষেই অন্ধ ছিলেন না, পুত্রস্নেহেও অন্ধ ছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ পুত্রস্নেহ কৌরব বংশ ধ্বংসের কারণ হয়েছিল।

যুগে যুগে অন্ধস্নেহ রাজা ও রাজত্বকে বিপদে ফেলেছে। এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও অন্ধস্নেহ অনেক নেতার পতনের কারণ হয়েছে। সাতাত্তরে ইন্দিরা গান্ধীর পতনের একটা বড় কারণ, পুত্র সঞ্জয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা। সঞ্জয় গান্ধী স্বভাব দুর্বিনীত ছিলেন। এমার্জেন্সি লাগু হ‌ওয়ার পর ইন্দিরার চোখের সামনেই সঞ্জয় ‘এক্সট্রা কনস্টিটিউশনাল পাওয়ার’ হয়ে ওঠেন। নিজের বাপের বয়সী তো বটেই এমনকি মায়ের বাপের বয়সী প্রবীণ কংগ্রেস নেতাদের‌ অপমান করতেও সঞ্জয়ের গলা কাঁপত না। সঞ্জয় দলের মধ্যে নিজের পারিষদবর্গ নিয়ে চলতেন। পারিষদদের কাজ‌ই হচ্ছে প্রভুকে সর্বদা তোষামোদ করা। সঞ্জয় চাটুকারদের তৈলে ট‌ইটম্বুর হয়ে সবার মাথায় পাড়া দিয়ে চলতেন।

সঞ্জয় গান্ধীর ডানে-বামে থাকতেন দিল্লির সুন্দরী মহিলারা। অম্বিকা সোনি, রুখসানা সুলতানার মতো সুন্দরীরা সঞ্জয়ের অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী ছিলেন। বাকি মহিলাদের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে সঞ্জয়ের নয়নের মণি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন রুখসানা। সঞ্জয় গান্ধীর প্রশ্রয়ে রুখসানা অনেক বাড়াবাড়ি করতেন। অম্বিকা সোনি বিরক্ত হয়ে রুখসানার ব্যাপারে ইন্দিরার কানে পর্যন্ত অভিযোগ তুলতেন। কিন্তু ছোটছেলের সবথেকে ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ‌ই করতেন না ইন্দিরা গান্ধী।

ইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধী। পুত্র সঞ্জয়ের ঔদ্ধত্য ও বাড়াবাড়ি চোখে দেখেও ব্যবস্থা নেন নি ইন্দিরা। সংগৃহীত ছবি।

কংগ্রেসের বুড়ো বুড়ো নেতারা সব দেখতেন, শুনতেন আর ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতেন। প্রধানমন্ত্রীকে বলে লাভ নেই। কারণ তিনি ততদিনে পুত্রস্নেহে অন্ধ! জরুরি অবস্থার দিনগুলিতে কংগ্রেসের সংগঠন এবং সরকারের ভেতরে সঞ্জয় গান্ধীই হয়ে উঠেছিলেন শেষ কথা। সঞ্জয়ের চক্ষুশূল হ‌ওয়ার পর আর কারও দল বা সরকারে পদে আসীন থাকা সম্ভব ছিল না। পদ বাঁচাতে আত্মসম্মানের কথা ভুলে সঞ্জয়ের পদতলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন অধিকাংশ কংগ্রেস নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। যাঁরা পদের থেকে আত্মসম্মানকে বেশি মূল্য দিতেন তাঁরা অনেকেই ইন্দিরার ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আইকে গুজরাল। সঞ্জয়ের দ্বারা অপমানিত হয়ে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন গুজরাল। সঞ্জয়ের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে কাজ ছেড়েছিলেন অনেক আমলাও। দলিত নেতা জগজীবন রাম অবশ্য সঞ্জয়ের গঞ্জনা শুনেই কেন্দ্রীয় কৃষি ও সেচমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তবে সাতাত্তরে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনের দিন ঘোষণা করতেই হাওয়া বুঝে ইন্দিরার ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করে পৃথক দল গঠন করে বিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিলেন চতুর জগজীবন।

সভায় ভাষণ দিচ্ছেন সঞ্জয় গান্ধী। ছবির বামে দেখা যাচ্ছে সঞ্জয়ের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রুখসানা সুলতানাকে। সংগৃহীত ছবি।

সাতাত্তরের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরার শোচনীয় পরাজয়ের পর সবাই মুখ খুলতে শুরু করলেন। কংগ্রেসের যে নেতারা এমার্জেন্সি পিরিয়ডে সঞ্জয়ের বশ্যতা স্বীকার করে পদ বাঁচিয়ে ছিলেন, তাঁরাও বলতে শুরু করলেন, সঞ্জয় গান্ধীর জন্য‌ই দল ডুবল। সঞ্জয়ের গুষ্টি উদ্ধার করে এবং ছেলেকে কন্ট্রোল করতে না পারায় ইন্দিরার‌ও গুষ্টি উদ্ধার করে কংগ্রেস ছাড়ার ধূম পড়েছিল সে সময়। সাতাত্তরে ইন্দিরা গান্ধীর পরাজয়ের পর যাঁরা সঞ্জয় ও ইন্দিরার তীব্র সমালোচনা করে কংগ্রেস ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় ও প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় এমন‌ও বলেছিলেন, “ইন্দিরার বড়ছেলেটা ইডিয়ট, ছোটটা গুন্ডা!”

ইন্দিরা গান্ধীর ছিলেন পুত্র সঞ্জয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বামফ্রন্টকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসলেন, তখন‌ও অভিষেকের বয়স ২৪ পেরোয় নি। সে বছর ২১ জুলাই ব্রিগেডে অভিষেকের রাজনীতিতে অভিষেক। বয়স সাতাশ হ‌ওয়ার আগেই ২০১৪ সালে অভিষেক সাংসদ। ২০১৫ সাল থেকেই তৃণমূলের ভেতরে আওয়াজ উঠল, দিদির পরেই অভিষেক, ভাইপোই দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। মুকুল রায়ের সঙ্গে মমতার দূরত্ব এবং দলত্যাগের অন্যতম কারণ অভিষেক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সজ্ঞানেই চেয়েছিলেন, অন্য কেউ নয়, ভাইপো অভিষেক‌ই দলের দ্বিতীয় স্থানটি দখল করুক। মমতা মুকুলকে তাড়িয়েছেন কিন্তু অভিষেকের ক্ষমতা খর্ব করেন নি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক। তৃণমূলের পতনের জন্য অভিষেকের ঔদ্ধত্য‌ই দায়ী- বলছেন তৃণমূলের নেতারাই। সংগৃহীত ছবি।

২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিজয়ের পর থেকে যত দিন গেছে, দলের ভেতরে অভিষেকের প্রাধান্য তত‌ই বেড়েছে। ধীরে ধীরে প্রশাসনের উপরেও প্রভাব বিস্তার করেছেন ভাইপো। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের খারাপ ফলের পরে অভিষেকের পরামর্শে পিকের আইপ্যাকের সঙ্গে তৃণমূলের টাইআপ। আইপ্যাকের সঙ্গে যোগসাজশ করে অভিষেক দল ও প্রশাসনের ভেতরে রীতিমতো ক্যু করে ফেলেন। কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের পাশাপাশি তৃণমূলের সমান্তরাল ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে ক্যামাক স্ট্রিটের শান্তিনিকেতন। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিধ্বংসী বিজয়ের পর অভিষেক শুধু তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড‌ই থাকলেন না, তিনি হয়ে উঠলেন তৃণমূলের অনিবার্য ভবিষ্যৎ। মাঝে এমন‌ও কানাঘুষো শোনা গিয়েছিল, উপমুখ্যমন্ত্রী পদ দাবি করে অভিষেক পিসির সঙ্গে জেদাজেদি করছেন।

২৪ গাড়ির কনভয় হাঁকিয়ে অভিষেক ব্যানার্জি চলতেন। কনভয়ের সামনে হুটার বাজিয়ে চলত পুলিশের গাড়ি। কার‌ও চোখে তিনি ছিলেন তৃণমূলের সেনাপতি। মিডিয়া তাঁকে বলত ‘যুবরাজ’! ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের দফতরে ছিল এলাহি ব্যাপার। কর্পোরেট স্টাইলের সেই অফিসে অভিষেকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হত তৃণমূলের নেতাদের। মমতার দুঃসময়ের সঙ্গী পুরোনো ও প্রবীণ নেতাদের দলে গুরুত্বহীন করে দিয়েছিলেন অভিষেক।‌ সুব্রত বক্সী পর্যন্ত অভিষেকের ঔদ্ধত্যে বিরক্ত হয়ে সংগঠনের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। ফিরহাদ হাকিম‌‌‌ মুখ বুজে অপমান সহ্য করেছেন। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ভাইপোর খিটিমিটি লেগেই থাকত।

মমতার শাসনের শেষ পাঁচ বছরে প্রশাসন ও পুলিশের ভেতরে মমতাপন্থী ও অভিষেকপন্থী লবি ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছিল। প্রশাসনকে ব্যবহার করে নিজের দলের অনেককেই ফাঁসিয়েছেন ভাইপো। সঞ্জয় গান্ধীর মতোই নিজের পারিষদবর্গ তৈরি করেছিলেন অভিষেক। পারিষদেরা রাতদিন তেল মারত। তেল খেয়ে খেয়ে অভিষেকের অহঙ্কারে মাটিতে পা পড়ত না। সুন্দরী অনুগামিনীর সংখ্যাও কম ছিল না ভাইপোর। অভিষেকের অনুগামীরাই কলেজ ক্যাম্পাসে মদের আসর ও মধুচক্র বসাতো। জেলায় জেলায় গিয়ে টাকা তুলত আইপ্যাকের এজেন্টরা। সেই টাকার হিসেব বুঝে নিত ক্যামাক স্ট্রিট। লোকসভা-বিধানসভা নির্বাচনে দলের মনোনয়ন বেচার কারবারটাও আইপ্যাকের মাধ্যমে ভালোই চালাতেন ভাইপো। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে দলের টিকিট বন্টনের দায়িত্বের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন অভিষেক। ৪-মের পর তৃণমূলের নেতারাই জানাচ্ছেন, মনোনয়নের বিনিময়ে কীভাবে টাকা তুলেছেন মমতার ভাইপো।

ভাইপোর কীর্তিকলাপ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কানে আসত না, এ কথা কেউ বিশ্বাস করেন না। অভিষেকের বাড়াবাড়ি, চালচলন নিয়ে তৃণমূলের অনেকেই মমতার কাছে অভিযোগ করতেন। কিন্তু মমতা অভিযোগের সুরাহা করতেন না। অভিষেককে শাসন করার ইচ্ছে বা ক্ষমতা দুটোই মমতার হ্রাস পেয়েছিল। যতদিন মমতার ক্ষমতা ছিল, দলের কেউ অভিষেকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলেন নি, বিদ্রোহ তো দূরের কথা। ঠোঁট কাটা কল্যাণ মাঝে মধ্যে মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বটে কিন্তু তারপরেই আপোষ করতে বাধ্য হয়েছেন।‌ মমতা ডুবতেই তৃণমূলে বিদ্রোহ। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ নেতাদের যত রাগ অভিষেকের বিরুদ্ধে। ভাইপোর পাপে তারা পিসিকেও শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর। জুন মালিয়া, শতাব্দী রায়‌ও কালীঘাট থেকে কেটে পড়েছেন। এখন শোনা যাচ্ছে, সায়নী ঘোষের‌ও আর অভিষেককে পোষাচ্ছে না।

তৃণমূল জিতলে যারা অভিষেকের পা ধোয়া জল খেত, তারাও অভিষেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি সাজিয়ে বসেছে।‌ ভাইপোর পাশে এখন তাঁর পিসি ছাড়া কেউ নেই। ইন্দিরাকে ডুবিয়ে ছিলেন ছেলে। মমতাকে ডোবালেন ভাইপো। যাঁর হাতে শাসনদন্ড থাকে, তাঁকে অন্ধস্নেহ বিসর্জন দিতে হয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পরিবারবাদ মানেই বরবাদ।

Feature graphic is representational and AI generated.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com