২০২৪-এর ৫ অগাস্টের পরে মনে হয়েছিল, আওয়ামি লিগ বিপর্যস্ত, বিএনপির জন্য এখন ফাঁকা মাঠ। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, জামাত জমি শক্ত করেছে… বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিকুর রহমান শুভ্রর পর্যবেক্ষণ-
খুব বড় কোনও অঘটন না ঘটলে ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছেই। আওয়ামি লিগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। ভোটের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি মুখোমুখি। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভোটের প্রচারে সরগরম। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক হিংসাও বন্ধ নেই। নির্বাচন নিয়ে এখনও কোনও কোনও মহলের সংশয় থাকলেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে নির্বাচন হয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত জরুরী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই গণভোটে বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় রকমের সংস্কারের জন্য জনগণের সম্মতি চাওয়া হয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে ইউনূস সরকার
গণভোটের ফলাফল সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে যাই যাক, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের আশ্বাস দিয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে, তার হাতে দেশের শাসনভার তুলে দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার বিদায় নেবে। দেশভাগের পরেপরেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে আওয়ামি লিগের উত্থান। এবং ২৩ বছরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় দল হয়ে ওঠে আওয়ামি লিগ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামি লিগ বর্তমান বাংলাদেশে নিষিদ্ধ এবং দলটিকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয় নি! বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অঘটনও যে কোনও দিন ঘটতে পারে, তা আওয়ামি লিগের সবথেকে বড় শত্রুও মনে হয় ২০২৪-এর ৫ অগাস্টের আগে কল্পনা করতে পারে নি।
ভারতে আশ্রিত আওয়ামি লিগ নেতৃত্ব ভোট বয়কটের ডাক দিলেও জনগণ তাতে কতটা সাড়া দেবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। নির্বাচনকে ব্যাহত বা পন্ড করার মতো সক্ষমতা এই মুহূর্তে লিগের নেই। রাজনৈতিক মহলের আগ্রহ বরং আওয়ামি লিগের ব্লক ভোটাররা কোন দিকে মোড় নেন, তা নিয়ে। কম করেও ২০-২২ শতাংশ ভোট এখনও আওয়ামি লিগের পক্ষে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ভোট নিজেদের দিকে টানতে বিএনপি-জামাত দুই পক্ষই মরীয়া। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে বিএনপি না জামায়াতে ইসলামি কে জিতবে, এখন বাংলাদেশের রাজনীতি এই প্রশ্ন ঘিরেই উত্তপ্ত। ২০২৪-এর ৫ অগাস্টের পরে মনে হয়েছিল, আওয়ামি লিগ বিপর্যস্ত, বিএনপির জন্য এখন ফাঁকা মাঠ; জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় জয় সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, জামাত জমি শক্ত করেছে এবং ভোটের পাঁচ-ছয় দিন আগে ক্ষমতায় আসা নিয়ে জামাত শিবিরের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে।
বিএনপির জয়ের রাস্তা মসৃণ নয়
জামাত ক্ষমতায় আসবে কি আসবে না, সময়ই তা জানান দেবে। কিন্তু জামাত ক্ষমতায় আসতে চলেছে, বাংলাদেশের ভোটের বাজারে এই বাতাস ছড়িয়ে দিতে জামাতের নেতৃত্ব বেশ ভালভাবেই সফল হয়েছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বেগম খালেদা জিয়া প্রয়াত। খালেদার দেহাবসানের দিন কয়েক আগে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেছেন তারেক রহমান। ভোটের প্রচারে নেমে বাসে চড়ে বাংলাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন তারেক। তাঁর নির্বাচনী সমাবেশগুলিতে ভিড়ও হচ্ছে উপচে পড়া। কিন্তু তারপরেও জোর দিয়ে কেউ বলতে পারছেন না, আওয়ামি লিগ বিহীন এই নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত।
মাঠে আওয়ামি লিগের অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিন্যাস নিঃসন্দেহে পাল্টে গেছে। ভোটে জামাতকে ধরাশায়ী করার জন্য বিএনপি নিজের মতো করে ঘুঁটি সাজিয়েছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে সোচ্চার হওয়ার একমাত্র শক্তি বিএনপি। একাত্তরকে হাতিয়ার করে ভোটের ময়দানে বিএনপি জামাতের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ নামিয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বের আশা আওয়ামি সমর্থকদের একটা বড় অংশ ভোটে ধানের শীষের দিকে ঝুঁকবেন। আওয়ামি লিগের অনুপস্থিতিতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের সামনে জামায়াতে ইসলামির চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি বেটার অপশন বিএনপি। হিন্দুদের মন জয় করতে বিএনপি চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না। ভোটে হিন্দুদের টার্নআউট যদি ভাল হয়, আশা করা যায় তার বড় অংশই যাবে ধানের শীষের ঘরে। কিন্তু তারপরেও বিএনপির জয়ের রাস্তায় চ্যালেঞ্জ বড় কম নয়।
৫ অগাস্টের পর জামাতের বিস্ময়কর উত্থান!
জামায়াতে ইসলামি বরাবরই ক্যাডার বেসড সংগঠিত দল কিন্তু তাদের জনভিত্তি ছিল সীমাবদ্ধ। ২০০৮-এর সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জামাত পেয়েছিল পাঁচ শতাংশেরও কম ভোট। কিন্তু ১৭ বছর পরে এ কথা বলার সুযোগ নেই, জামাতের ভোট পাঁচ-ছয় শতাংশেই আটকে আছে। শেখ হাসিনার সরকার যে জামাতের নিবন্ধন বাতিল করে দিয়ে দলটির কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ করেছিল, শেখ হাসিনার শাসনের অবসানের পর সেই জামাতের উত্থান রীতিমতো বিস্ময়কর বললে ভুল হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ যতগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির প্রত্যেকটিতে বিপুলভাবে জয়লাভ করেছে। বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জামায়াতে ইসলামির ইসলাম ভিত্তিক রাজনীতির জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। এতদিন জামাতের সমর্থন গ্রামাঞ্চলে নির্দিষ্ট বর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও জামাতের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রশাসনের অভ্যন্তরে এমনকি ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরে জামাত দরদি ঘাপটি মেরে বসে আছে। পুলিশের একটা বড় অংশ জামাতপন্থী হয়ে গেছে। সামরিক বাহিনীর ভেতরে জামাতের প্রতি সহানুভূতিশীল অফিসারের সংখ্যাও কম নয়। বিএনপি ভয় পাচ্ছে নির্বাচনের কাজে নিযুক্ত প্রশাসনের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ থাকবে না, জামাতের হয়ে ভোটে কারসাজি করবে।
জামায়াতে ইসলামির বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমান ঝানু রাজনীতিবিদ। পেশায় চিকিৎসক ৬৭ বছরের শফিকুর ছাত্রাবস্থায় কিছুদিন জাসদ-ছাত্রলিগের ছত্রছায়ায় ছিলেন। পরে শিবিরে নাম লেখান। ভোট প্রচারে নেমে শফিকুর রহমানও বাংলাদেশ চষে ফেলছেন। শফিকুরের নির্বাচনী সভাগুলিতেও ভিড় উপচে পড়ছে। এমনকি বিএনপির শক্ত ঘাঁটিগুলিতেও জামাতের আমিরের সভায় চোখে পড়ার মতো ভিড় হচ্ছে। ভোটের মাঠে বেশ গুছিয়ে নেমেছে জামাত। নাহিদ-আসিফ-সারজিসদের অর্বাচীন এনসিপি সহ ছোটখাটো আরও ১১টি ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করেছে জামাত। জোটসঙ্গীদের তুষ্ট করতে আসন নিয়ে খানিকটা আত্মত্যাগও করতে হয়েছে জামাতকে।
নিজেকে মডারেট ইসলামিক দল হিসেবে তুলে ধরতে মরীয়া জামাত
এদিকে নাকে ক্ষমতার গন্ধ পাওয়া মাত্রই ইসলামপন্থী জামাত গায়ের জামা থেকে ধর্মীয় গোঁড়ামির ছাপ তুলতে মরীয়া হয়ে উঠেছে। আমেরিকা সহ বিভিন্ন পশ্চিমা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে ঘনঘন বৈঠকে বসে আমির শফিকুর রহমান তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন, জামাত বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি মডারেট ইসলামিক দল মাত্র; বাংলাদেশে শরিয়ার শাসন কায়েম করার কোনও পরিকল্পনা তাদের নেই। এমনকি বাংলাদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতির অগ্রভাগে থাকা জামাত এখন ভারতের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে জামাতের আমিরের গোপন বৈঠকের খবরটি রয়টার্স ফাঁস করে দেওয়ায় ভোটের বাজারে ড. শফিকুর রহমানকে খানিকটা অস্বস্তির মধ্যেও পড়তে হয়েছে।
যে দুটি কলঙ্ক জামায়াতে ইসলামিকে সবসময় বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে তার একটি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও পাক সেনাবাহিনীকে গণহত্যায় সহযোগিতা করা, দ্বিতীয়টি হিন্দু বিদ্বেষ। জামাত নেতৃত্ব অনেক দিন ধরেই জার্সি থেকে ‘হিন্দু বিরোধী’ ট্যাগ মুছতে মরীয়া। পরপর দুই বছর শারদীয়া দুর্গোৎসবে জামাতের নেতাদের অংশগ্রহণ করতে দেখা গিয়েছে। ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে মোট ২২৪টি আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জামাত। একটি আসনেও নারীকে মনোনয়ন দেন নি জামাত নেতৃত্ব। কিন্তু খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দী নামে এক হিন্দুকে প্রার্থী করেছে জামায়াতে ইসলামি। ভোটের প্রচারে নেমে জামাতের প্রার্থীরা হিন্দু মহল্লায় ছুটছেন এবং সংখ্যালঘুদের ভাই ডেকে তাদের দোয়া চাইছেন। মানতেই হবে ভোট বড় বালাই।
একাত্তর এখনও জামাতের গলার কাঁটা
তবে একাত্তর সেই গলার কাঁটা, যা জামাত আজও উপড়ে ফেলতে পারে নি। ছাব্বিশের নির্বাচনে যে কয়েকটি ইস্যুকে হাতিয়ার করে বিএনপি জামাতকে কুপোকাত করতে চাইছে, তার একটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামাতের ভূমিকা। নারী বিদ্বেষী ইমেজ নিয়েও জামায়াতে ইসলামি অস্বস্তিতে। সম্প্রতি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামাতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতের প্রধান পদে কোনও নারীকে বসানো সম্ভব নয়। নারীরা শারীরিক ও মানসিক কারণে দল ও প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসার উপযুক্ত নয়, সাক্ষাৎকারে এমনই মধ্যযুগীয় মনোভাব ব্যক্ত করেছেন শফিকুর। জামাতের আমিরের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেল থেকে করা একটি পোস্ট ঘিরেও কম পানিঘোলা হয় নি। পোস্টটিতে কর্মজীবী নারীদের যৌনকর্মীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যদিও দলের আমিরের এক্স হ্যান্ডেল হ্যাকড করে ওই পোস্ট করা হয়েছিল বলে দাবি করে জামায়াতে ইসলামি।
চাঁদাবাজের কলঙ্ক মুছতে ব্যর্থ বিএনপি
সংগঠিত শক্তি জামায়াতে ইসলামির মোকাবিলায় নেমে বিএনপির সবথেকে বড় ডিসঅ্যাডভান্টেজ হল এই বড় দলটি ৩৬ জাতের দল থেকে আসা লোকজনদের নিয়ে তৈরি একটি চরম অসংগঠিত দল। ইউনিয়ন থেকে শীর্ষস্তর পর্যন্ত গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বিদীর্ণ বিএনপির নেতৃত্বের রাশ বয়োবৃদ্ধদের হাতে। তরুণদের মধ্যে থেকে এখনও দক্ষ ও জনপ্রিয় মুখ তুলে আনতে ব্যর্থ বিএনপি, যাঁরা দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। দলের ভেতরে থাকা গুন্ডা-মাস্তান, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্তদের সামাল দেওয়া বিএনপি নেতৃত্বের জন্য সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপির বিরুদ্ধে জনগণের সবথেকে বড় অভিযোগ- ক্ষমতায় থাকলে বিএনপির লোকেরা চাঁদাবাজি করে মানুষের জীবন অতিষ্ট করে তোলে। দীর্ঘ ১৭ বছর বিএনপির চাঁদাবাজরা উপোস ছিল। ৫ অগাস্টের পর বিএনপির একটি বড় অংশ ট্রাক স্ট্যান্ড, টেম্পু স্ট্যান্ড, হাট-বাজার, নদীর ঘাট, বালুমহাল দখল করে চাঁদাবাজিতে নেমে গিয়ে দলের ভাবমূর্তি জনগণের চোখে দ্রুত খারাপ করে তুলেছে।
আওয়ামি লিগ বিহীন বাংলাদেশে ইসলামপন্থী জামাতের থেকে মধ্যপন্থী বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতেই নয়াদিল্লি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে। তারেক রহমান আগের থেকে অনেক বেশি পলিটিক্যালি ম্যাচিউরড। সময়, অভিজ্ঞতা ও বয়স তাঁকে নিঃসন্দেহে অনেক পরিণত করেছে। ছাব্বিশে ক্ষমতায় এলে ২০০১-০৬ এর ভুল আর বিএনপি করবে না বলে আশা করে সাউথ ব্লক। জামাত ক্ষমতায় চলে এলে পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে সেই ‘প্ল্যান বি’ও নিশ্চয় ভারত তৈরি করে রেখেছে।
Feature graphic is representational.