মানভূম দিবস: মাতৃভাষার মান রক্ষার যে আন্দোলনকে আমরা মনে রাখি নাই


১ নভেম্বর। বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। এই দিনটি মানভূম দিবস হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর দীর্ঘ আন্দোলন, গণসংগ্রাম ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৎকালীন মানভূম জেলার ১৬টি থানা নিয়ে পুরুলিয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু মানভূম দিবসের তাৎপর্য শুধুমাত্র একটি জেলার প্রশাসনিক আত্মপ্রকাশের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মাতৃভাষার অধিকার, মানুষের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং নিজের পরিচয় রক্ষার এক দীর্ঘ ও অনন্য সংগ্রাম।

১৯১২ সালে বাংলা থেকে বিহার-ওড়িশা পৃথক প্রদেশ গঠনের সময় বাংলাভাষী অধ্যুষিত মানভূম অঞ্চল বিহারের অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে মাতৃভাষার মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রশাসন ও শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষাগত অধিকার নিয়ে অসন্তোষ থেকেই সংগঠিত আন্দোলনের পথ তৈরি হয়।

১৯৪৮ সালে লোকসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠার পর আন্দোলন নতুন সাংগঠনিক শক্তি লাভ করে। সত্যাগ্রহ, টুসু গান, পদযাত্রা এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাঁদের দাবি তুলে ধরেন। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল পাকবিড়রা থেকে ১০০৫ জন সত্যাগ্রহীর কলকাতার উদ্দেশে ঐতিহাসিক পদযাত্রা এই আন্দোলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তাঁরা কলকাতায় পৌঁছন এবং গ্রেপ্তার হন। তবুও তাঁদের দাবি ও আন্দোলনের মূল সুর থেমে থাকেনি।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হ‌ওয়ার দাবিতে মানভূমবাসীদের ঐতিহাসিক পদযাত্রা। হাওড়া ব্রিজ অতিক্রম করে পদযাত্রীরা কলকাতায় ঢুকছেন। ফাইল ফটো।

মানভূমের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বিশেষত্ব ছিল এর দীর্ঘস্থায়ী গণভিত্তি এবং অহিংস প্রতিবাদী চরিত্র। প্রতিকূলতা, গ্রেপ্তার ও প্রশাসনিক বাধার মধ্যেও আন্দোলনকারীরা মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে অবিচল ছিলেন। এই আন্দোলনকে বিশ্বের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলনগুলির অন্যতম বলে বিবেচনা করা হয়। রক্তপাতের পরিবর্তে সত্যাগ্রহ, অস্ত্রের পরিবর্তে গণসংহতি এবং সংঘাতের পরিবর্তে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক দাবির পথ বেছে নেওয়ার মধ্যে এই আন্দোলনের ঐতিহাসিক মহত্ত্ব নিহিত।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মানভূম দিবসের প্রাসঙ্গিকতা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ ভাষা ও সংস্কৃতির সংকট সব সময় প্রকাশ্য সংঘাতের মধ্য দিয়ে আসে না। কখনও মাতৃভাষার প্রতি অনীহা, কখনও নিজস্ব লোকসংস্কৃতিকে অবহেলা, কখনও আবার নতুন প্রজন্মের কাছে আঞ্চলিক ভাষা, গান, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের পরিচয় পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়েও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার দুর্বল হয়ে পড়ে।

মনে রাখতে হবে, অন্য ভাষাকে সম্মান করার অর্থ নিজের ভাষাকে অবহেলা করা নয়। বহুভাষিকতা আমাদের শক্তি, আর মাতৃভাষা আমাদের শিকড়। এক ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য ভাষাকে ছোট করা কখনও কাম্য হতে পারে না। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে।

মানভূম দিবস তাই আগামী দিনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। আমাদের বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার চর্চা বাড়াতে হবে, আঞ্চলিক ভাষা ও লোকসাহিত্যকে সংরক্ষণ করতে হবে, লোকসংগীত, লোকনৃত্য, উৎসব ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পুরুলিয়ার টুসু গান, ঝুমুর সংস্কৃতি এবং মানভূমের নিজস্ব জীবনধারাকে শুধু উৎসবের মঞ্চে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, শিক্ষা ও সামাজিক চর্চার অংশ করে তুলতে হবে।

মানভূম ভাষা আন্দোলন ছিল অহিংস। কলকাতার রাজপথে মানভূমের বাঙালি সত্যাগ্রহীরা। ফাইল ফটো।

এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের। লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

মানভূমের আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার জন্য মানুষের ঐক্য, সচেতনতা এবং অহিংস গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ কতটা শক্তিশালী হতে পারে। ইতিহাসের সেই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

মানভূম দিবস কোনও বিভাজনের স্মারক নয়, এটি ভাষার মর্যাদা, সাংস্কৃতিক সহাবস্থান এবং আত্মপরিচয় রক্ষার এক ঐতিহাসিক প্রেরণা।

১ নভেম্বর তাই শুধু অতীতকে স্মরণ করার দিন নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার সুরক্ষিত রাখার অঙ্গীকার গ্রহণের দিন।

মানভূম দিবসে সেই দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত সকল ভাষাপ্রেমী মানুষকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

Feature image is AI generated coloured.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com