ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে মদত না দিলে কি ইন্দিরার পরিণতি অন্য রকম হতে পারত?


ইন্দিরা ও সঞ্জয় যে ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে মদত দিয়েছিলেন তা প্রমাণিত। কীভাবে মদত দিয়েছিলেন, তা নিয়েই লিখলেন‌ উত্তম দেব—

ইন্দিরা গান্ধী নিঃসন্দেহে সাহসিনী ছিলেন। আবার তাঁর দুর্বুদ্ধির‌ও তুলনা ছিল না। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের ইতিহাসে আর‌ও একটি অভিশপ্ত দিন। ওইদিন সকালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রাজধানী দিল্লিতে তাঁর সরকারি বাসভবনে নিজের দুই দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। ইন্দিরার ঘাতক দুই দেহরক্ষী ধর্মীয় পরিচয়ে ছিলেন শিখ। অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন ব্লু স্টার’-এর বদলা নিতেই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে খুন করেছিলেন দুই দেহরক্ষী সত‌ওয়ান্ত সিং ও বিয়ান্ত সিং। ইন্দিরা গান্ধীর বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেহ ১ নম্বর সফদরজং রোডের বাসভবনের লনে লুটিয়ে পড়েছিল সকাল সোওয়া নটা নাগাদ।

দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী তিনদিন দেশে কী ঘটেছিল, সেই কালো ইতিহাস আমরা সবাই জানি। বদলা নিতে শুধু দিল্লিতেই ৩,০০০ শিখকে খুন করা হয়েছিল। যদিও বেসরকারি মতে সংখ্যাটি ৮,০০০-১৭,০০০-এর মধ্যে! এই হত্যাযজ্ঞকে বৈধতা দিতে কাব্যিক ভাষায় রাজীব গান্ধী বলেছিলেন, “যখন একটি বনস্পতির পতন হয়, তখন চারপাশের মাটি কেঁপে ওঠে।” অথচ নিজের খোঁড়া গর্তেই ইন্দিরার পতন হয়েছিল এবং তার মাশুল দিয়েছিলেন হাজার হাজার নিরীহ মানুষ— রাজনীতির গতিপথ এমন‌ই বিচিত্র!

শিখ দেহররক্ষীদের হাতে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ভয়ঙ্কর। দাঙ্গায় দিল্লিতে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল শিখ সম্প্রদায়ের জীবন। ফাইল ফটো।

শিখ ধর্মাবলম্বীদের সবথেকে পবিত্র তীর্থস্থান অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির— শিখ ধর্ম অনুযায়ী যার আধ্যাত্মিক নাম হরমন্দির সাহিব বা দরবার সাহিব। ১৯৮৪ সালের জুনে স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান‌ হয়েছিল— তত দিনে স্বর্ণমন্দির আর মন্দির নেই, অস্ত্রাগারে পরিণত। স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানের নির্দেশ দেওয়া ছাড়া ইন্দিরা গান্ধীর‌ সামনে দ্বিতীয় কোন‌ও উপায় ছিল না। স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানের পোশাকি নাম ছিল— ‘অপারেশন‌ ব্লুস্টার’। অপারেশন ব্লুস্টারের সময় ভারতের সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল এএস বৈদ্য। কিন্তু অপারেশন ব্লুস্টারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লে. জেনারেল কুলদীপ সিং ব্রার। বাংলাদেশকে মুক্ত করার ১৯৭১-এর ভারত-পাক যুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর ভোরে সবার আগে সসৈন্যে ঢাকায় ঢুকেছিলেন ব্রার।

শিখ ধর্মগুরু জারনাইল সিং ভিন্দ্রান‌ওয়ালে স্বর্ণমন্দিরকে মুক্তাঞ্চল ও অস্ত্রাগারে পরিণত করেছিলেন। তাঁকে সদলবলে উৎখাত করতেই স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। লে. জেনারেল (অব.) কেএস ব্রার এখন‌ও জীবিত। ৯২ বছর বয়সী এই সেনানায়ক মনে করেন, ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছিলেন খোদ ইন্দিরাই। লে. জেনারেল ব্রার অবশ্য কোন‌ও গোপন তথ্য ফাঁস করেন নি। ইন্দিরা ও সঞ্জয় মিলে যে ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে দানব হয়ে উঠতে মদত জুগিয়েছেন, এই দাবি সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার, সাংবাদিক সতীশ জ্যাকব এবং লেখক খুশবন্ত সিং সহ আর‌ও অনেকেই তথ্য প্রমাণ সহ বহু জায়গায় উপস্থাপন করেছেন।

সাতাত্তরে ইন্দিরাকে ক্ষমতাচ্যুত করে জনগণ। সে বছর‌ই শিখদের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দমদমি তকসাল’-এর প্রধান নির্বাচিত হন সন্ত জারনাইল সিং ভিন্দ্রান‌ওয়ালে। পাঞ্জাবে তখন অকালি দলের সরকার— মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল। ১৯৭৮-এর বৈশাখী উৎসবের দিন ‘সন্ত নিরঙ্কারী’-দের শোভাযাত্রা ঘিরে অমৃতসরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রশাসন নিরঙ্কারীদের মিছিলের অনুমতি দেওয়ায় গোঁড়া শিখদের সংগঠন‌ ‘দমদমি তকসাল’ অকালি সরকারের প্রতি বি়ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। নিরঙ্কারীদের শোভাযাত্রা পন্ড করতে কোষমুক্ত কৃপাণ হাতে পাল্টা মিছিল নিয়ে ভিন্দ্রান‌ওয়ালে এগিয়ে যান। কিন্তু সন্ত নিরঙ্কারী সম্প্রদায়ের শিখরাও খালি হাতে ছিল না। নিরঙ্কারীরা গুলি চালালে ভিন্দ্রান‌ওয়ালের দলের ১৩ জন নিহত হন।

সন্ত নিরঙ্কারীর অনুগামীদের সঙ্গে গোঁড়া শিখদের ঝামেলা বহুদিনের। বৈশাখীর দিন অমৃতসরে এই হত্যাকান্ডের জেরে পাঞ্জাবের শিখসমাজের মূলস্রোতে প্রবল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পুলিশ সন্ত নিরঙ্কারী সম্প্রদায়ের প্রধান গুরুবচন সিংকে গ্রেফতার করলেও অকালি সরকারের বিরুদ্ধে শিখদের বড় অংশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে শিখ সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে উঠলেন জারনাইল সিং ভিন্দ্রান‌ওয়ালে। কেন্দ্রের শাসকদল জনতা পার্টির শরিক পাঞ্জাবের অকালি দলের সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করতে ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে ঘুঁটি হিসেবে বেছে নেন ইন্দিরাপুত্র সঞ্জয় গান্ধী।

জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে জনতাকে উত্তপ্ত করা এবং মানুষকে সংগঠিত করার সহজাত ক্ষমতা ছিল ভিন্দ্রান‌ওয়ালের। ভিন্দ্রান‌ওয়ালের এই গুণটি সঞ্জয়ের নজর এড়ায় নি। সঞ্জয় বুঝতে পারেন, এই সাহসী শিখগুরুকে দিয়েই কার্যোদ্ধার হবে। দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়ে ভিন্দ্রান‌ওয়ালের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বৈঠক‌ও করেন সঞ্জয় গান্ধী। সে সময় ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে যে কংগ্রেস আর্থিকভাবে সাহায্য করত, সে কথা পরবর্তীকালে সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের কাছে স্বীকার করেছেন সঞ্জয়ের ঘনিষ্ঠবন্ধু কমলনাথ। কমলনাথ কুলদীপকে বলেছিলেন, “আকর্ষণীয় কন্ঠস্বর ও জ্বালাময়ী ভাষণ দিতে পারায় ভিন্দ্রান‌ওয়ালেই আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের উপযুক্ত পাত্র বলে মনে করেছিলাম। আমরা তাঁকে মাঝেমধ্যে টাকা দিতাম। কিন্তু কখন‌ও ভাবি নি যে একদিন তিনি সন্ত্রাসবাদীতে পরিণত হবেন।”

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিংয়ের ইন্দিরার প্রতি আনুগত্য নিয়ে বাজারে অনেক গল্প আছে। ১৯৮০-তে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফিরলে আনুগত্যের পুরস্কার পেয়েছিলেন জৈল সিং। জৈল সিংকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়ে দেন ইন্দিরা, যে চেয়ারে বসার কোন‌ও যোগ্যতাই জৈলের ছিল না। দু’বছর পর দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে জৈল সিং বলেছিলেন, “আমার নেত্রী যদি বলতেন যে দিল্লির রাস্তায় আমাকে ঝাড়ু মারতে হবে, তবে আমি সেটাই করতাম। কারণ, তিনি আমাকে রাষ্ট্রপতি হ‌ওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।” জৈল সিংয়ের মাধ্যমেই ভিন্দ্রান‌ওয়ালের সঙ্গে যোগারোগ রাখতেন ইন্দিরা-সঞ্জয়। ১৯৭৮ সালে যে ‘দল খালসা’ সংগঠনের আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে পাঞ্জাবে জঙ্গি খালিস্তান আন্দোলনের সূত্রপাত, সেই দল খালসার পিছনে টাকা ঢেলেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। দল খালসার প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে ৬০০ টাকা খরচ হয়েছিল। সেই বিল মিটিয়েছিলেন জৈল সিং!

সশস্ত্র অনুগামীদের মাঝে খালিস্তানি আন্দোলনের নেতা জারনাইল সিং ভিন্দ্রান‌ওয়ালে। স্বর্ণমন্দিরকে অস্ত্রাগারে পরিণত করেছিলেন ভিন্দ্রান‌ওয়ালে। ফটো: সংগৃহীত।

১৯৮০ সালে জানুয়ারির গোড়াতেই দেশে মধ্যবর্তী লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে পাঞ্জাবে কংগ্রেস প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করেছিলেন ভিন্দ্রান‌ওয়ালে। এমনকি ইন্দিরা প্রচারে পাঞ্জাবে গেলে এক‌ই মঞ্চে দু’জনকে দেখা গিয়েছিল। সেই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতে ক্ষমতায় ফিরে কংগ্রেস (আই)— পুনরায় দেশের প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা। এর তিন মাস পরেই দিল্লিতে নিজের বাসভবনে খুন হন ‘সন্ত নিরঙ্কারী’ সম্প্রদায়ের প্রধান গুরুবচন সিং। গুরুবচনকে খুন করতে যে বন্দুকটি ব্যবহার করা হয়েছিল, তার লাইসেন্স ছিল ভিন্দ্রান‌ওয়ালের ভাইয়ের নামে।

পুলিশ ও সিবিআইয়ের হাতে যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ চলে এসেছিল যে ভিন্দ্রান‌ওয়ালের নির্দেশেই খুনটি হয়েছিল। গ্রেফতারি এড়াতে ভিন্দ্রান‌ওয়ালে প্রথমবারের মতো স্বর্ণমন্দির চত্বরের গুরুনানক নিবাসে আশ্রয় নেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জৈল সিংয়ের তৎপরতায় আদালত থেকে জামিন না হ‌ওয়া পর্যন্ত শিখ ধর্মের পবিত্রতম তীর্থস্থল হরমন্দির সাহিব থেকে বের হন নি ভিন্দ্রান‌ওয়ালে। সে’সময় খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, নিরঙ্কারী প্রধান গুরুবচন সিংয়ের হত্যার সঙ্গে ভিন্দ্রান‌ওয়ালে জড়িত থাকার কোন‌ও প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জৈল সিং ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে সংসদে দাঁড়িয়ে খুনের মামলা থেকে দায়মুক্তি দেন নি, একটা বাচ্চাও তা বুঝবে। যে ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে ইন্দিরা গান্ধী রাজনৈতিক স্বার্থে মদত দিয়েছিলেন, এমনকি ক্ষমতায় এসেই খুনের মামলা থেকে বাঁচিয়েছেন, সেই ভিন্দ্রান‌ওয়ালে অচিরেই তাঁর গলার কাঁটা হয়ে ওঠে। সেই কাঁটা উপড়াতে গিয়েই শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্রতম তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দিরে সেনা পাঠিয়ে ইন্দিরা শিখ জাতির রোষের কারণ হন।

অন্তিম শয়ানে ইন্দিরা গান্ধী। পাশে পুত্র রাজীব। রাজীবকে ধরে রেখেছেন অমিতাভ বচ্চন। ফাইল ফটো।

ধর্মের কারণে জিঘাংসা বড় সাংঘাতিক জিনিস। সত‌ওয়ান্ত সিং ও বিয়ান্ত সিং ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দুই শিখ দেহরক্ষী। জিঘাংসা তাদের অন্তরকেও গ্রাস করেছিল। স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানের পর থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। কিন্তু সর্ষের মধ্যেই ভূত রয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, সত‌ওয়ান্ত-বিয়ান্তকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরামর্শ ইন্দিরাকে কেউ কেউ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা কানে তোলেন নি। কর্মফলের চক্রে নির্ধারিত হয় যে অমোঘ নিয়তি, তাকে খন্ডানো যায় না। হয়তো ভিন্দ্রান‌ওয়ালেকে মদত না দিলে ইন্দিরার জীবনের ইতিহাস অন্য রকমভাবে লেখা হত।

Feature graphic is representational and AI generated.

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com