ভোজনবিলাসী মহানায়ক: শুধু স্যালাড আর টকদ‌ই খেয়েই লাঞ্চ সারতেন না উত্তমকুমার


জাতে বাঙালি কিন্তু আহারে অরসিক— এমন বেরসিক বাঙালি কদাচিৎ মেলে। বাঙালির ‘ম্যাটিনি মহানায়ক’ একজন‌ই। বাঙালি স্ক্রিনে তাঁকে কতবার ব্রেডে বাটার মাখতে, গুনে গুনে মাছ খেতে, কাতলার মুড়ো কিম্বা কব্জি ডুবিয়ে পাঁঠা খেতে দেখেছে। বাস্তব জীবনেও মহানায়ক উত্তমকুমার এ কালের স্টারদের মতো ডায়েটেশিয়ানের অঙ্গুলিহেলনে চলতেন না। ‘সিক্স প্যাক’ বডি রাখতে গিয়ে তাঁকে শ্যুটিংয়ে ‘সালাদ’ খেয়েই লাঞ্চ সারতে হয় নি। মানুষটার মুখের হাসি, ঠোঁটের কোনে সিগারেট আর চোখের ভাষাতেই পাগল ছিল বাঙালি।

মায়ের হাতের রান্নার ভক্ত ছিলেন

বাঙালির ম্যাটিনি আইডল গড় বাঙালির মতোই ভোজনবিলাসি ও খাদ্যরসিক ছিলেন। ছেলে পেটভরে খেলে তবে বাঙালি মায়েদের শান্তি! উত্তমকুমারের মা চপলাদেবী ব্যতিক্রম হবেন কেন। আর পাঁচজন বাঙালি ছেলের মতো উত্তমকুমার‌‌ও মায়ের হাতের রান্নার ভক্ত ছিলেন। সন্তানদের ‘টেস্ট বাড’ বোধহয় মায়েরাই তৈরি করে দেন। চপলাদেবী রন্ধনপটিয়সী ছিলেন। অভাবের সংসারেও‌ বাঙালি মায়েরা যে কত সামান্য সামগ্রী দিয়ে কী অমৃত রেঁধে দিতে পারেন, তা জানে কেবল তাঁদের ছেলেমেয়েরা। মেট্রো সিনেমার প্রোজেক্টর অপারেটর ভবানীপুরের সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে অরুণ উত্তমকুমার হয়েছেন মায়ের হাতের ভেটকির কাঁটা চচ্চড়ি খেয়ে।‌

মা ও ছেলে: মা চপলাদেবীর হাতের ভেটকির কাঁটা-চচ্চড়ির পাগল ছিলেন উত্তমকুমার। ফটো: সংগৃহীত এবং এআই দ্বারা উৎকর্ষিত।

পোর্ট ট্রাস্টের তিরিশ টাকা বেতনের কেরানি থেকে একদিন বাংলা সিনেমার শেষ কথা হয়েছেন ভবানীপুরের যে ছেলেটি, তাঁর সবথেকে পছন্দের খাবার ছিল ভেটকির কাঁটা চচ্চড়ি— এবং সেটা মায়ের হাতের। সাতকড়িবাবুর টানাটানির সংসার। চপলাদেবী প্রায় রোজ‌ই রাঁধতেন দুটি কমন পদ— কলাইয়ের ডাল আর আলু-পোস্ত। মায়ের হাতের এই দুই পদের‌ও পরম ভক্ত ছিলেন আমাদের মহানায়ক। মায়ের হেঁসেলে পাক হ‌ওয়া থোড়ের ছেঁচকি, বড়ি-নারকোল সহযোগে পালংয়ের ঘন্ট, ডুমুরের তরকারি এবং হাঁসের ডিমের রসাও ভারী পছন্দ‌ করতেন উত্তমকুমার। আর মায়ের হাতে বানানো মিষ্টির মধ্যে ‘রসকরা’ উত্তমের রসনাকে তৃপ্ত করত।

গৌরীদেবীর লঙ্কা-মুরগি, সুপ্রিয়ার কাজু-চিকেনে জিভ সঁপেছিলেন

বাঙালি পুরুষ শুধু মায়ের হাতের রান্নার‌ই ভক্ত নয়, স্ত্রীর হাতের রান্নার‌ও দিওয়ানা হতে চায় তারা। উত্তমকুমারের সহধর্মিনী গৌরীদেবীও দুর্দান্ত রাঁধতেন। গৌরীদেবীর হাতের কাতলার ঝাল, বাগদা চিংড়ির মালাইকারি, পাঁঠার ঝোল, লঙ্কা-মুরগি এবং দ‌ই-ইলিশ বিশেষ পছন্দ করতেন মহানায়ক।

বিশেষ করে গৌরীদেবীর হাতের লঙ্কা-মুরগি খেতে ভীষণ ভালবাসতেন উত্তমকুমার। লঙ্কা-মুরগি বা কাঁচালঙ্কা-মুরগির রেসিপিটা আসলে ছিল অভিনেত্রী কাজরী গুহর। কাজরীর হাতের লঙ্কা-মুরগি খুব তৃপ্তি করে খেতেন উত্তমকুমার। বাড়িতে সস্ত্রীক উত্তমকুমারকে নিমন্ত্রণ করে এই পদটি খাইয়েছিলেন অভিনেত্রী। খেয়ে গৌরীদেবী রেসিপি জানতে চাইলে কাজরীদেবী বলেন, এই স্পেশাল রেসিপি কাউকে জানাবেন না তিনি। রন্ধনে নিপুণা গৌরীদেবী যদিও খেয়েই আন্দাজ করে নিয়েছিলেন লঙ্কা-মুরগি রাঁধতে কী কী উপকরণ প্রয়োজন। এরপর বাড়িতেই চমৎকার লঙ্কা-মুরগি রেঁধে স্বামীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন গৌরীদেবী।

একটা সময় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায় উত্তমকুমারের জীবন। ভবানীপুরের পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে সুপ্রিয়ার ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন মহানায়ক। শুধু অভিনয়েই নয় রন্ধনেও অসাধারণ পারদর্শিনী ছিলেন সুপ্রিয়াদেবী!

দুর্লভ চিত্র! পঙক্তি ভোজনে উত্তমকুমার, কিশোর কুমার সহ অন্যান্যরা। তদারকি করছেন সুপ্রিয়াদেবী। ফটো: সংগৃহীত এবং এআই দ্বারা উৎকর্ষিত।

সুপ্রিয়াদেবীর হাতের কাজু চিকেন খেতে খুব ভালবাসতেন উত্তমকুমার। কাজুবাদাম ও টকদ‌ই দিয়ে এই পদটি রাঁধতেন সুপ্রিয়া। মহানায়ককে তাঁর ফেভারিট ভেটকির কাঁটাচচ্চড়িও‌ রেঁধে খাওয়াতেন সুপ্রিয়াদেবী। সুপ্রিয়া মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন চিকেন কোর্মা রান্না। এই পদটিও নাকি খুব তারিফ করে‌ খেতেন মহানায়ক। সুপ্রিয়াদেবীর হাতের মাটন দোপেঁয়াজা, কাতলা মাছের ঝাল এবং কীমা মোগলাই পরোটার‌ও ভক্ত ছিলেন উত্তমকুমার।

বিনা তেল-মশলায় চিকেন রান্নার একটা স্পেশাল রেসিপি জানতেন সুপ্রিয়াদেবী। ১৯৬৭ সালে প্রথমবার হার্ট অ্যাটাকের পর খাবারে তেল-মসলা কমিয়ে দিয়েছিলেন উত্তমকুমার। এরপর থেকে সুপ্রিয়ার হাতের এই পদটিকে ভালবেসে ফেলেছিলেন মহানায়ক।

মিষ্টিতেও মুগ্ধ ছিলেন মহানায়ক

আপন স্বাস্থ্য তো দূরের কথা সৃষ্টি রসাতলে গেলেও বাঙালি মিষ্টি ছাড়তে নারাজ।‌ উত্তমকুমার আদ্যপান্ত বাঙালি ছিলেন।‌ ক্যালরির কথা ভেবে মিষ্টিকে জীবন থেকে দূর করে দেন নি। যথারীতি রসগোল্লা খেতে ভালবাসতেন। যৌবনের শুরুতে নাকি এক পাতে তিরিশ-বত্রিশটা রসগোল্লা খেয়ে নিতে পারতেন মানুষটা! পরের দিকে রসগোল্লায় নুন ছিটিয়ে খেতেন উত্তমকুমার। ভীমনাগের সন্দেশ পেলে ছেড়ে কথা বলতেন না। অমানুষের শ্যুটিং করতে গিয়ে বসিরহাটের কাঁচাগোল্লায় মজেছিলেন। ভালবাসতেন সিউড়ির মোরব্বাও। ক্ষীর ও ছানা দিয়ে তৈরি বিশেষ মিষ্টি কুমকুম, বর্ধমান থেকে আসা ক্ষীরের পান্তুয়া এবং মিষ্টি ও নোনতা স্বাদের সাগর দ‌ই মহানায়কের পছন্দের তালিকায় স্থান পেয়েছিল।

ভবানীপুরের অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একমেবেঅদ্বিতীয়ম স্টারডম হ‌ওয়ার‌ পরেও দিন শেষে কলকাতার আদি ও অকৃত্রিম বাঙালিই ছিলেন। মাটির ভাঁড়ে চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তি পেতেন। কাগজে মুড়ি মেখে খেতে কিম্বা তেলেভাজায় কামড় দিতেও আর পাঁচজন বাঙালির মতোই ভালবাসতেন মহানায়ক।

ফিচার ইমেজ: প্রাতরাশের টেবিলে উত্তমকুমার। বেড়ে দিচ্ছেন স্ত্রী গৌরীদেবী। সাথে পুত্র গৌতম। সংগৃহীত ফটোটি এআই দ্বারা রঙিন ও উৎকর্ষিত।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com