পুলিশ নয় খুনে অভিযুক্ত রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও ফেরার প্রশান্ত বর্মনকে খুঁজে পেল সাধারণ মানুষের চোখ! লাইভ
ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ায় প্রশান্তকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হল পুলিশ। কোন রহস্যে প্রশান্ত এত প্রভাবশালী? একটি বিশেষ প্রতিবেদন–
নিঃসন্দেহে প্রশান্ত বর্মন নামটাই একটা রহস্য। এই রহস্য প্রশান্ত মহাসাগরের থেকেও গভীর। জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মনের হ্যাডাম দেখে রাজ্যশুদ্ধ সাধারণ মানুষ বিস্ময়ে ব্যোমকে গেছেন। তৃণমূলের জামানায় যাঁরা সাদা খাতা জমা দিয়েও ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে বিডিও ইত্যাদি হয়েছেন, প্রশান্ত তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য- অভিযোগ এমনই। সল্টলেক দত্তাবাদের স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যাকে খুনের ঘটনায় বিডিও প্রশান্ত বর্মনের নাম জড়িয়েছে। ২০২৫-এর ২৯ অক্টোবর নিউটাউনের যাত্রাগাছি এলাকায় একটি খালপাড় থেকে স্বপন কামিল্যার ক্ষত-বিক্ষত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত স্বর্ণব্যবসায়ীর বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মোহনপুর থানার দিলমাটিয়া গ্রামে। সল্টলেকের দত্তাবাদে তাঁর সোনার দোকান ছিল। স্বপনকে দত্তাবাদের সোনার দোকান থেকে যে ছয়জনের দল জোর করে তুলে নিয়ে যায়, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন বিডিও প্রশান্ত বর্মন। নিহতের পরিবারের তরফে দায়ের হওয়া এফআইআর-এ একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে প্রশান্তরই নাম আছে। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ একে একে পাঁচজনকে গ্রেফতার করলেও প্রশান্ত বর্মন রয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে! ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরেও প্রশান্ত বর্মন দাপটের সঙ্গে রাজগঞ্জে নিজের দফতরে বসেছেন। সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে থ্রেট করেছেন। স্বপন কামিল্যাকে অপহরণ এবং খুনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এফআইআর হয়ে যাওয়ার পরেও দিনের পর দিন স্বপদে বহাল থেকে বহাল তবিয়তে অফিস করেছেন প্রশান্ত!

ব্যাপার স্যাপার দেখে তখন থেকেই মিডিয়ার সাংবাদিক থেকে সাধারণ মানুষ, বিস্ময়ে সকলের চক্ষু চড়কগাছ হতে শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে- একজন সামান্য বিডিও-র এত দাপট! এত প্রভাব! মামলার তদন্তে নেমে দত্তাবাদে স্বপন কামিল্যার সোনার দোকান সংলগ্ন স্থান থেকে সিসি ক্যামেরার যে ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ, তাতে প্রশান্ত বর্মনের ছবি স্পষ্ট ধরা পড়েছে বলে শোনা গেছে। শুধু তাই নয়, প্রশান্ত ও তার দলের অন্যরা স্বর্ণব্যবসায়ীকে ফেলে মারধর করছে, এমন ভিডিয়োও তদন্তকারীদের হাতে আছে বলে মিডিয়ার কর্মীরা সূত্র মারফত জেনেছেন। এর পরেও প্রশান্তকে গ্রেফতার তো দূরের কথা, একবার ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর্যন্ত উদ্যোগ নেয় নি বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশ!

অপহরণ করে খুনের মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগে প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন তাঁকে ‘সাসপেন্ড’ করা তো দূরের কথা, ‘কম্পালসারি ওয়েটিং’-এও এমনকি ছুটিতে পর্যন্ত পাঠায় নি নবান্ন। অনেক পরে প্রশান্তর জায়গায় জয়েন্ট বিডিওকে রাজগঞ্জ ব্লকের বিডিও-র দায়িত্ব দেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার নয়, বিভাগীয় স্তরে প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে ঠিক কী কী পদক্ষেপ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, স্বপন কামিল্যাকে খুনের ঘটনার প্রায় এক মাস পর গত ২৬ নভেম্বর অপহরণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রশান্ত বর্মনকে আগাম জামিন দেন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা আদালতের জেলা জজ শান্তনু ঝা, তখনও প্রশান্ত রাজগঞ্জের বিডিও পদে বহাল।
নিম্ন আদালত প্রশান্ত বর্মনকে আগাম জামিন দিলেও অনেক গড়িমসির পর নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যায় বিধাননগর পুলিশ। গত ২২ ডিসেম্বর প্রশান্তর আগাম জামিনের নির্দেশ খারিজ করে দিয়ে তাঁকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে বিধাননগর আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা আদালতের বিচারক কীসের ভিত্তিতে খুনে অভিযুক্ত একজনকে আগাম জামিন দিলেন, এই প্রশ্নও তোলে হাইকোর্ট। ইতিমধ্যে পুলিশ বিধাননগর আদালতে প্রশান্ত বর্মণের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করে। যদিও ঘটনা হল, যে কোনও অজ্ঞাত কারণেই হোক প্রশান্তকে গ্রেফতার করতে আজ পর্যন্ত সদিচ্ছা দেখায় নি পুলিশ।
এরপর হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন প্রশান্ত বর্মন। প্রায় একমাস পর গত ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি উঠলে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে বিচারপতি রাজেশ বিন্দল এবং বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, ২৩ জানুয়ারির মধ্যে প্রশান্ত বর্মনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। শীর্ষ আদালত এও জানিয়েছিল, আত্মসমর্পণের পর অভিযুক্ত চাইলে বিচারকের কাছে জামিনের আবেদন জানাতে পারবেন। সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট এও নির্দেশ দিয়েছিল, পুলিশ নিম্ন আদালতে প্রশান্তের জামিনের বিরোধিতা এবং প্রয়োজনে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করার আবেদনও জানাতে পারবে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন নি প্রশান্ত বর্মন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিধাননগর এসিজিএম আদালতে স্বপন কামিল্যা খুন ও অপহরণ মামলার চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। চার্জশিটে ধৃত পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। কিন্তু প্রশান্ত বর্মনকে পলাতক হিসেবে দেখানো হলেও অভিযুক্তের তালিকায় তাকে রাখে নি পুলিশ।
এরপর তিস্তা-গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। প্রশান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে আত্মসমর্পণ করেন নি তো করেন নি। পুলিশের খাতায় তিনি ফেরার। পুলিশ প্রশান্ত বর্মনকে খুঁজেই পায় না। অথচ তাঁকে বাজার করতে দেখেন সাধারণ মানুষ। গাড়ি নিয়ে ঘুরতে দেখেছেন কেউ কেউ। এমনকি যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলছে, তখন সন্ধ্যার পর রাজগঞ্জ বিডিও অফিসেও প্রশান্তকে দেখতে পেয়েছেন অনেকে। জনশ্রুতি আছে, প্রশান্ত বর্মনের মাথায় দিদির হাত ছিল। ৪ মে রাজ্যে পালাবদল। নির্বাচনে তৃণমূলের শোচনীয় পরাজয় হয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়লাভ করে বিজেপি। ৯ মে থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্যে বিজেপির সরকার। এর ঠিক ১৬ দিন পর সোমবার (২৫ মে) রাত এগারোটা নাগাদ নিউটাউনের ইকো পার্ক থানা এলাকার সারচী সিগন্যালের কাছে প্রশান্ত বর্মনকে দেখা গেল মত্ত অবস্থায়। পুলিশ নয় ফেরার প্রশান্তকে খুঁজে পেল সাধারণ মানুষের চোখ।

পুলিশ প্রশান্ত বর্মনকে খুঁজে পায় না। অথচ তিনি কলকাতার নিউটাউনে এসইউভি হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়ান! মদ খেয়ে মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন খুন ও অপহরণে অভিযুক্ত রাজগঞ্জের অপসারিত ‘দাবাং’ বিডিও। এক পথচারীকে ধাক্কা মারে প্রশান্ত বর্মনের গাড়ি। পথচারী ছিটকে পড়েন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্কুটারের সামনে। স্কুটার আরোহীর গায়ে এসে পড়েন মানুষটি। স্কুটার আরোহী যুবক গাড়ির চালককে দেখেই চিনতে পারেন, ইনি আর কেউ নন, রাজগঞ্জ ব্লকের অপসারিত বিডিও কুখ্যাত প্রশান্ত বর্মন। প্রশান্তর গাড়ি আটকে ফেসবুকে লাইভ শুরু করেন যুবকটি। মুহূর্তে লাইভ ভিডিও ভাইরাল। রাস্তার উপর মত্ত প্রশান্তর বাওয়াল দেখতে থাকেন রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষ।
পশ্চিমবঙ্গের দশ কোটি মানুষ এতক্ষণে পুরো ঘটনা জেনে গেছেন। ঘটনাস্থল থেকে প্রশান্ত বর্মনকে আটক করে ইকোপার্ক থানায় নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। সোমবার রাতে আটক হয়েছিলেন, মঙ্গলবার সকালের আগে প্রশান্তকে গ্রেফতার দেখানো হয় নি। অবশেষে পথসুরক্ষা বিধি ভাঙার অভিযোগে ‘মোটর ভেহিকলস অ্যাক্ট’-এ প্রশান্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যাকে খুন ও অপহরণের মামলাতেও পুলিশ প্রশান্তকে হেফাজতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘মোটর ভেহিকলস’-এর মামলায় ধৃত প্রশান্তকে বারাসত আদালতে তোলা হবে। আগের মামলায় তদন্তের স্বার্থে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করার আবেদন বিচারকের কাছে জানাবে পুলিশ।
লোকে বলত দাবাং বিডিও প্রশান্ত বর্মনের বিরাট জ্যাক। নবান্নের খাস লোক তিনি। তৃণমূলের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে প্রশান্তর ওঠাবসা। মমতার আশীর্বাদ প্রশান্ত বর্মনের মাথায়। তাই ধরাকে সরা জ্ঞান করেন ডব্লিউবিসিএসে শূন্য পাওয়া বিডিও। শোনা যায়, জেলাশাসককে পর্যন্ত চোখ রাঙিয়ে কথা বলতেন রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও। প্রশান্ত বর্মনের যে বড় জায়গায় হাত, স্বপন কামিল্যাকে খুন-অপহরণের মামলাতেই তা প্রমাণিত। তবে সবার সঙ্গে সেটিং করা গেলেও নিয়তি ও উপরওয়ালার সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব নয়। বিধির বিধান বলে একটা কথা আছে না। সেই বিধিই প্রশান্ত বর্মনকে ধরিয়ে দিল সোমবার রাতে।
নিউটাউনের রাস্তায় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে পথচারীকে ধাক্কা না দিলে খুন-অপহরণে অভিযুক্ত প্রশান্তকে পুলিশ আরও বহুদিন খুঁজেই পেত না। যে স্কুটার আরোহী ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে লাইভ ভিডিয়ো করেছেন, তাঁকে ধন্যবাদ ও কুর্নিশ। তিনি লাইভ করাতেই পালানোর সুযোগ পান নি প্রশান্ত। নিহত স্বপন কামিল্যার পরিবারকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে তিনি বোধহয় বিধি দ্বারা প্রেরিত হয়েই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
Feature graphic is representational and AI generated.