কলকাতা: ‘পশ্চিমবঙ্গে পাত্থরবাজি আর বরদাস্ত নয়।’ সোমবার কলকাতার পার্ক সার্কাসে দাঁড়িয়ে এই হুঙ্কার ছাড়লেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার এই পার্ক সার্কাস চত্বরই বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বেআইনি বাড়ি ভাঙা, ধর্মীয় স্থানে লাউড স্পিকার নিয়ন্ত্রণ ও পশুবলি সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ- রাজ্যের নতুন সরকারের এইসব পদক্ষেপে অসন্তুষ্ট একটি সম্প্রদায়ের একাংশ। সবকিছুই আগের মতো চলবে, এমন দাবিতে পার্ক সার্কাসে বিক্ষোভ শুরু হলে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ঘরে ফিরে যেতে বললে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে শুরু করে জনতা।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর একটি বাসে হামলা হয়।বিক্ষোভকারীদের ছোঁড়া পাথরে কয়েকজন পুলিশকর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান আহত হন। তবে আগের জামানা তো আর নেই। বিক্ষোভের মুখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে না গিয়ে বেদম লাঠিচার্জ ও প্রহার শুরু করে পুলিশ। পুলিশের এই রণংদেহী মেজাজ দেখতে অনেক দিন হল অভ্যস্ত নয় পার্ক সার্কাস অঞ্চলের মানুষ। পুলিশের মার দেখে জনতা হকচকিয়ে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বুঝতে পারে, ভালোয় ভালোয় রাজপথ থেকে সটকে না পরলে পেছনের হাড্ডি অক্ষত না থাকার প্রবল আশঙ্কা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্ক সার্কাস ফাঁকা হয়ে যায় এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে বিশাল পুলিশ বাহিনী। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে ৪০জনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ।
পার্ক সার্কাসের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে গোলমাল নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এমন দ্রুত তৎপরতা, শেষ কবে দেখা গিয়েছিল, কলকাতার মানুষ মনে করতে পারছেন না। সোমবার নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠক সেরেই সোজা পার্ক সার্কাসে ডিসির দফতরে চলে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পুলিশকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে রবিবারের ঘটনার বিস্তৃত রিপোর্ট নেন এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন মুখ্যমন্ত্রী। আহত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সম্পর্কেও খোঁজখবর করেন তিনি। রবিবার পার্ক সার্কাস এলাকায় অশান্তি দমনে পুলিশের ভূমিকাতে খুশি শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে কর্তব্য পালনে আপোষ না করায় পুলিশের প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
পার্ক সার্কাসে কী বললেন শুভেন্দু?
বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “তাঁর সরকারের আমলে এটাই পুলিশের উপর প্রথম আক্রমণ এবং এটাই শেষ। আমি রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী। এর পর কোনও পুলিশের গায়ে হাত পড়লে আইন অনুযায়ী যত দূর যেতে হয়, পুলিশমন্ত্রী হিসেবে আমি যাব।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “যে কোনও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন পুলিশকে জানিয়ে তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারবে। কিন্তু মানুষ জড়ো করে উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়া, পাথর ছোঁড়া এইসব চলবে না। কাশ্মীরে, শ্রীনগরে পুলিশের উপর পাথর ছোঁড়া বন্ধ হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতাতেও এবার বন্ধ হবে।”
পার্ক সার্কাসে দাঁড়িয়ে পুলিশবাহিনীর উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ- “কে শাসক, কে বিরোধী, কে কোন রাজনৈতিক দল করে, তা দেখার দরকার নেই। কে কোন ধর্মের, কোন সম্প্রদায়ের লোক, তাও দেখার দরকার নেই। আইন মেনে যথাযথ পদক্ষেপ করুন। অ্যাকশন নেওয়ার আগে পাঁচবার ভাববেন না।” পার্ক সার্কাসে রবিবারের অশান্তির জন্য যারা অভিযুক্ত, তাদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর সতর্কবার্তা, “আপনারাও কান খুলে শুনে নিন, এটাই শেষ ঘটনা। এর পর এমন ঘটনা ঘটতে দেব না। এর পর এমন ঘটনা যদি ঘটান, আমার থেকে খারাপ কোনও পুলিশমন্ত্রী হবে না!”
আগের সরকার পুলিশের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল বলে মনে করেন শুভেন্দু। পূর্বতন সরকারকে কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আগে পুলিশের হাত-পা বাঁধা ছিল। এখন তারা স্বাধীন। আইনের রক্ষক আইন মেনে কাজ করবে।” অন্যদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে, লিখিতভাবে জানালেই প্রতিবিধান মিলবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ওসি-আইসিকে জানান। ওসি-আইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ডিসি-র সঙ্গে দেখা করেন। ডিসির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে লালবাজারে যান। না হলে মেল করুন। সিপির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে নবান্নে চিঠি পাঠান। আমি দেখব। কিন্তু পাত্থরবাজি আর বরদাস্ত করব না।”
Feature graphic is representational and designed by NNDC.