উত্তরবঙ্গের শতাব্দী প্রাচীন কালীপুজোগুলির কাহিনি জেনে নিন


রাজপরম্পরা থেকে চা-বাগানের শ্রমজীবী সমাজ, বনাঞ্চলের লোকবিশ্বাস থেকে প্রাচীন জনপদের মেলবন্ধন; উত্তরবঙ্গের কালী আরাধনার কাহিনি তুলে ধরলেন অরুণ কুমার—

আলোর উৎসব দীপাবলি। আর সেই আলোর উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মা কালীর আরাধনা। পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের মতো উত্তরবঙ্গেও কালীপুজোর রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তবে উত্তরবঙ্গের কালীপুজোর বৈশিষ্ট্য শুধু মণ্ডপসজ্জা কিংবা প্রতিমার আড়ম্বরে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজ আমলের ইতিহাস, জমিদারবাড়ির ঐতিহ্য, চা-বাগানের সাহেবদের সময়কার সামাজিক প্রেক্ষাপট, বনবস্তির মানুষের বিশ্বাস এবং শতাব্দী প্রাচীন মেলার সংস্কৃতি।

কোচবিহার থেকে মালদহ, দার্জিলিং থেকে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার থেকে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর—বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে রয়েছে এমন বহু কালীপুজো, যেগুলি আজও মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু।

কোচবিহারে রাজপরম্পরা ও প্রাচীন শ্মশানকালীর পুজো

কোচবিহারের কালীপুজোর ইতিহাসে রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কোচবিহার রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দেবীপুজোর পাশাপাশি মদনমোহন মন্দির চত্বরে বড় তারা বা বড় কালীর পুজো বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই পুজো প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন। দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের তত্ত্বাবধানে আজও এই আরাধনা অনুষ্ঠিত হয়।

কোচবিহার রাজ পরিবারের বড় তারা দেবীর পুজো দুশো বছরের প্রাচীন। ছবি: সংগৃহীত।

এছাড়া কোচবিহারের হাজরাপাড়ার পুরনো শ্মশানকালীর পুজো প্রায় পাঁচশো বছরের ঐতিহ্য বহন করছে বলে স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি থেকে জানা যায়। কথিত আছে, মহারাজা গোপালকৃষ্ণ নারায়ণের আমলে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ভয়াবহ বন্যায় তোর্সা নদীর ভাঙনে পুরনো মন্দিরটি বিলীন হয়ে গেলেও দেবীর আরাধনা বন্ধ হয়নি।

আলিপুরদুয়ার জেলার প্রাচীন কালীপুজো

ডুয়ার্সের কালীপুজোর ইতিহাসে কালচিনি ব্লকের হ্যামিল্টনগঞ্জ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯১৭ সালে ইউরোপীয় চা-বাগানের সাহেবদের উদ্যোগে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। সেই সময় ছোটনাগপুর, রাঁচি-সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিকদের চা-বাগানে কাজ করতে আনা হয়েছিল। কালীপুজোর ছুটিতে শ্রমিকরা যাতে নিজেদের বাড়িতে ফিরে না যান, তাঁদের বিনোদন ও উৎসবের ব্যবস্থা হিসেবেই এই পুজোর সূচনা হয়েছিল বলে প্রচলিত ইতিহাস থেকে জানা যায়।

কালচিনির হ্যামিল্টনগঞ্জের চা বাগানে সাহেবদের উদ্যোগে চালু কালীপুজো। ছবি: এন‌এনডিসি।

পরবর্তী সময়ে স্থানীয় মানুষ ও চা-শ্রমিকদের উদ্যোগে পুজোটি সর্বজনীন ঐতিহ্যে পরিণত হয়। পুজোকে কেন্দ্র করে শুরু হয় মেলা, যা আজও ডুয়ার্সের অন্যতম আকর্ষণ।

এছাড়াও কুমারগ্রাম, কালচিনি, বিভিন্ন চা-বাগান এবং বনবস্তি অঞ্চলে রয়েছে বহু পুরনো কালীপুজো। এই পুজোগুলির মধ্যে দিয়ে ডুয়ার্সের আদিবাসী, রাজবংশী এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের পরিচয় পাওয়া যায়।

পাহাড় ও শিলিগুড়ির প্রাচীন কালীপুজো

দার্জিলিং পাহাড়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে কালীপুজোর সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। শিলিগুড়ি সংলগ্ন সেবকেশ্বরী কালীমন্দির এই অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় স্থান। পাহাড় ও সমতলের মানুষের কাছে এই মন্দিরের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। এটিও শতবর্ষ প্রাচীন পুজো যদিও মন্দিরের বয়স বেশি নয়।

সেবকেশ্বরী কালীমন্দিরের দেবী বিগ্রহ। ছবি: এন‌এনডিসি।

অন্যদিকে, মংপুর কালীপুজোর রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এখানে নিরামিষ পদ্ধতিতে দেবীর আরাধনা করা হয়। প্রচলিত বলিপ্রথার পরিবর্তে ভক্তি ও সাত্ত্বিক উপাচারে পুজোর আয়োজন এই পুজোকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

শিলিগুড়ি শহরেও রয়েছে শতবর্ষ প্রাচীন কালীপুজোর ঐতিহ্য। আনন্দময়ী কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠা ১৯২৬ সালে। শহরের ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসে এই মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শহরের পরিধি বেড়েছে, কিন্তু পুরনো কালীমন্দিরগুলিকে ঘিরে মানুষের আবেগ আজও অটুট।

জলপাইগুড়ি জেলার ঐতিহ্যবাহী কালীপুজো

জলপাইগুড়ির কালীপুজোর ইতিহাসে বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি, দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠকের স্মৃতি বিশেষভাবে আলোচিত। জলপাইগুড়ির গোশালা মোড় সংলগ্ন দেবী চৌধুরানীর মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক কাহিনি ও লোকবিশ্বাস।

জলপাইগুড়ি গোশালা মোড়ের দেবী চৌধুরানী কালীমন্দির। ছবি: এন‌এনডিসি।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর সঙ্গে এই অঞ্চলের গভীর সম্পর্ক ছিল। মন্দিরে কালীপুজোর সময় বিশেষ আরাধনার আয়োজন হয়। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী রাজ্য ও প্রতিবেশী দেশ থেকেও ভক্তরা আসেন।

এছাড়া ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি ও পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো কালীপুজো। কোথাও জমিদারি আমলের ঐতিহ্য, কোথাও আবার গ্রামবাংলার লোকবিশ্বাস ও পারিবারিক পরম্পরার মধ্য দিয়ে এই পুজোগুলি আজও টিকে রয়েছে।

মালদহের গোবরজনা কালীর কয়েকশো বছরের ঐতিহ্য

মালদহ জেলার কালীপুজোর ইতিহাসও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই জেলার বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদে বহু প্রাচীন কালীমন্দির রয়েছে। তার মধ্যে গোবরজনা কালীপুজো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পুজো প্রায় চারশো বছরেরও বেশি প্রাচীন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।

চারশো বছরের প্রাচীন মালদহের গোবরজনা কালীপুজো। ছবি: সংগৃহীত।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় ডাকাতদের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়। কালীপুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। মালদহ ছাড়াও উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলা এবং প্রতিবেশী অঞ্চল থেকে ভক্তরা আসেন।

রায়গঞ্জের দেবীনগর কালীবাড়ির বিস্ময়কর রীতি

উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ শহরের দেবীনগর কালীবাড়ির কালীপুজো এক বিশেষ ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এই পুজো প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো।

রায়গঞ্জ শহরের দেবীনগর কালীবাড়ির মাতৃ বিগ্রহ। পাঁচশো বছরের প্রাচীন কালীপুজো। ছবি: এন‌এনডিসি।

এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল, দীপাবলির রাতে সূর্যাস্তের পর প্রতিমা তৈরি করা হয়। রাতেই পুজো সম্পন্ন হয় এবং ভোরের আলো ফোটার আগেই বিসর্জন দেওয়া হয়। অর্থাৎ, দেবীর প্রতিমা সূর্যের আলো দেখেন না। কয়েকশো বছরের এই ব্যতিক্রমী রীতি আজও মানুষের কৌতূহল ও ভক্তির অন্যতম কেন্দ্র।

দক্ষিণ দিনাজপুরে বোল্লা কালীর মেলা ও চঞ্চলা কালীর ঐতিহ্য

দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট সংলগ্ন বোল্লা গ্রামের বোল্লা কালীর পুজো উত্তরবঙ্গের অন্যতম বিখ্যাত ধর্মীয় উৎসব। বালুরঘাট থেকে প্রায় ২০-২৬ কিলোমিটার দূরের এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের একটি জনশ্রুতি।

দক্ষিণ দিনাজপুরের বোল্লা গ্রামের বিখ্যাত বোল্লা কালীপুজো। ছবি: সংগৃহীত।

কথিত আছে, এক জমিদার ব্রিটিশ সরকারের কাছে খাজনা দিতে না পারায় বন্দি হয়েছিলেন। দেবী কালীর কৃপায় পরদিন তিনি মুক্তি পান। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি মন্দির নির্মাণ করে দেবীর পুজো শুরু করেন। রাসপূর্ণিমার পরবর্তী শুক্রবার এখানে বিশেষ কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। পুজোকে কেন্দ্র করে তিন দিনের বিশাল মেলার আয়োজন হয়। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে।

এছাড়া বালুরঘাটের চঞ্চলা কালীপুজোরও রয়েছে প্রায় তিনশো বছরের ঐতিহ্য। দোলপূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত এই পুজোর প্রতিমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দেবীর পায়ের নীচে শিবের পরিবর্তে অসুর ও সিংহের অবস্থান দেখা যায়।

ফিচার ইমেজ: প্রতীকি।

লেখক পরিচিতি: অরুণ কুমার। প্রবীণ সাংবাদিক। সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত। ইকো ট্যুরিজম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্সের আনাচকানাচে নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com