টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে বঙ্গোপসাগরে ডুবে মৃত্যু ২৫০ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীর

টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে বঙ্গোপসাগরে ডুবে মৃত্যু ২৫০ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীর


মঙ্গলবার মর্মান্তিক ঘটনাটির উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। যদিও আন্দামান সাগরে ট্রলার (মোটর চালিত নৌকা) ডুবির ঘটনাটা ঠিক কবে ঘটেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। গত ৯ এপ্রিল বাংলাদেশের উপকূলরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ট্রলারটিতে থাকা নয় যাত্রীকে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করেন। ডুবে যাওয়া ট্রলারের এক যাত্রী রফিকুল ইসলাম আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এ‌এফপি-কে জানিয়েছেন, ৩৬ ঘন্টা সমুদ্রে সাঁতার কেটেছেন তিনি। তারপর তাঁকে উদ্ধার করে বাংলাদেশের উপকূলরক্ষী বাহিনী।

জানা গেছে, কাজের সন্ধানে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ট্রলারে চেপে সাগর পাড়ি দিচ্ছিলেন আড়াইশোর বেশি পুরুষ-নারী ও শিশু। যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী। উপকূলরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে টেকনাফ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ট্রলারটি। আন্দামান সাগরে ঝোড়ো হাওয়া ও প্রবল ঢেউয়ের মুখে পড়ে ট্রলারটি ডুবে গেলে অল্প কয়েকজন যাত্রীই উত্তাল গভীর সমুদ্রে সাঁতরে ভেসে থেকে নিজেদের জীবন রক্ষা করতে পেরেছেন। বাকি সবাই ডুবে মরেছে বলে আশঙ্কা করছে ইউএনএইচসিআর।

বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে ১৩ লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রিত। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিব্রত বাংলাদেশ সরকার। সংগৃহীত ফটো

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় ১৩ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টির‌ও বেশি ক্যাম্পে এদের স্থান দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা নারীদের সন্তান জন্মদানের হার অত্যাধিক বেশি হ‌ওয়ায় বাংলাদেশ সরকার রীতিমতো উদ্বিগ্ন। মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে উৎখাত হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। রোহিঙ্গাদের অনেকে ভারতেও বেআইনিভাবে অনুপ্রবেশ করেছে। ভারতে এই মুহূর্তে ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে বলে জানা গেছে।

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী নয়। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে বাংলাদেশের সঙ্গে মায়ানমারের একাধিক আলোচনা ভেস্তে গেছে। রোহিঙ্গারাও মায়ানমারে ফিরতে আগ্রহী নয়। এদের অনেকেই বাংলাদেশের মূলস্রোতে মিশে গেছে। ভারত সরকার‌ও রোহিঙ্গাদের গলার কাঁটা মনে করে। বেশ কিছু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীকে ভারত থেকে ইতিমধ্যেই অপসারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ভেসে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এইভাবে যাত্রা বেআইনি ও বিপজ্জনক। এর আগেও বঙ্গোপসাগরে নৌকা ডুবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৃত্যুর অনেক ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলিতে সক্রিয় পাচারচক্র শরণার্থীদের সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকে। উন্নত জীবন ও ভাল মজুরির আশায় রোহিঙ্গারা পাচারকারীদের ফাঁদে পা দিয়ে এইভাবে মৃত্যুকে ডেকে আনে।

আন্দামান সাগরে নৌকা ডুবে ২৫০-এর বেশি রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী নাগরিকের নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধি বলেছেন, মর্মান্তিক ঘটনাটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি ও তাঁদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি।” ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এক বিবৃতিতে বলেছে, “বাংলাদেশ যখন নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছে, তখন এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মায়ানমারে বাস্তুচ্যুত হ‌ওয়ার মূল কারণগুলির দ্রুত সমাধান করা জরুরি। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, নির্ভয়ে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে।”

যদিও মায়ানমার সরকার ইসলাম ধর্মাবলম্বী এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশের বৈধ নাগরিক বলেই মানতে নারাজ। রোহিঙ্গারা তাদের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে মনে করেন মায়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী একাধিক জনগোষ্ঠী।

Feature graphic is representational and AI generated.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *