ডেস্ক রিপোর্ট: আইনের লম্বা হাত থেকে আর পালিয়ে বাঁচা সম্ভব নয় জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের বিডিও প্রশান্ত বর্মণের। সল্টলেকের দত্তাবাদে স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যাকে অপহরণ ও খুনের মামলায় প্রধান অভিযুক্ত প্রশান্ত। তারপরেও কোনও এক অদৃশ্য শক্তির বলে ঘটনার প্রায় তিনমাস পরেও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাজগঞ্জের এই তথাকথিত দাবাং বিডিও! সোমবার তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। আগামী শুক্রবারের (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) মধ্যে প্রশান্ত বর্মণকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
গত ২৯ অক্টোবর নিউটাউনের যাত্রাগাছি থেকে স্বপন কামিল্যার দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বপনের বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের মোহনপুর থানার দিলমাটিয়া গ্রামে। কিন্তু তিনি ব্যবসা করতেন সল্টলেকের দত্তাবাদে। দত্তাবাদে নিজের জুয়েলারি দোকান থেকে স্বপন কামিল্যাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে যারা খুন করেছে, খোদ বিডিও প্রশান্ত বর্মণ তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। নিহতের পরিবারের তরফে করা এফআইআরে অভিযুক্ত হিসেবে একমাত্র প্রশান্তরই নাম আছে। ঘটনার তদন্তে নেমে প্রশান্ত বর্মণের গাড়ির চালক রাজু ঢালি ও কোচবিহার ২ নম্বর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি সজল সরকার সহ মোট পাঁচজনকে এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার করেছে বিধাননগর থানার পুলিশ।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর গত ২৬ নভেম্বর অপহরণ ও খুনে অভিযুক্ত রাজগঞ্জের বিডিওকে আগাম জামিন দেন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা আদালতের জেলা জজ শান্তনু ঝা। এই সময়ের মধ্যে প্রশান্ত বর্মণকে একবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও ডাকে নি পুলিশ। অথচ খুনের অভিযোগ মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন রাজগঞ্জ ব্লক অফিসে নিজের দফতরে সদম্ভে হাজির ছিলেন প্রশান্ত বর্মণ। সাংবাদিকদের হুমকি পর্যন্ত দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। নিম্ন আদালত প্রশান্তর আগাম জামিন মঞ্জুর করায় জনমনে বিস্ময় তৈরি হয়। আদালতে পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
খুনে অভিযুক্ত বিডিওর বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও বিভাগীয় পদক্ষেপ করে নি নবান্ন! প্রশান্তর পিছনে খুঁটি কে? ফাইল ফটো
নিম্ন আদালত প্রশান্ত বর্মণকে আগাম জামিন দিলেও এর বিরোধিতা করে হাইকোর্টে যায় বিধাননগর পুলিশ। গত ২২ ডিসেম্বর প্রশান্তর আগাম জামিনের নির্দেশ খারিজ করে দিয়ে তাঁকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা আদালতের বিচারক কীসের ভিত্তিতে খুনে অভিযুক্ত একজনকে আগাম জামিন দিলেন, এই প্রশ্ন তোলে হাইকোর্ট। সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও আদালতে আত্মসমর্পণ করেন নি রাজগঞ্জের বিডিও। পুলিশ বিধাননগর আদালতে প্রশান্ত বর্মণের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করে। যদিও প্রশান্তকে গ্রেফতারে পুলিশের সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।
হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন রাজগঞ্জের বিডিও। এদিকে হাইকোর্ট আগাম জামিন খারিজ করে দেওয়ার পর থেকেই গাঢাকা দেন প্রশান্ত বর্মণ। নিজের দফতরে গরহাজির থাকায় রাজগঞ্জ বিডিও অফিসের কাজকর্ম লাটে উঠেছে বলে ব্লকের বাসিন্দাদের অভিযোগ। খুনে অভিযুক্ত পলাতক প্রশান্তর বিরুদ্ধে রাজ্য প্রশাসন এখনও পর্যন্ত কোনও বিভাগীয় পদক্ষেপ করেছে বলে জানা যায় নি। তবে সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের রায়ের পর অবশেষে দাবাং বিডিওর পিঠ দেওয়ালে ঠেকেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রাজেশ বিন্দল এবং বিচারপতি বিজয় বিশ্নোইয়ের বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়কেই বহাল রেখে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ২৩ জানুয়ারির মধ্যে নিম্ন আদালতে প্রশান্তকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, আত্মসমর্পণের পর অভিযুক্ত চাইলে জামিনের বিচারকের কাছে জামিনের আবেদন জানাতেই পারেন। সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট এও নির্দেশ দিয়েছে, পুলিশ নিম্ন আদালতে প্রশান্তের জামিনের বিরোধিতা করতে পারবে ও প্রয়োজনে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করার আবেদনও জানাতে পারবে।
আইনজীবী মহল বলছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর পরিস্থিতি যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের পর বিডিও প্রশান্ত বর্মণের গ্রেফতার নিশ্চিত। প্রশ্ন একটাই, প্রশান্ত পুলিশ হেফাজতে ঢুকবে না জেল হেফাজতে যাবে? তদন্তের স্বার্থে পুলিশ স্বর্ণব্যবসায়ী খুনে মূল অভিযুক্ত প্রশান্তকে হেফাজতে নেওয়ার আবেদন আদালতের সামনে না রাখলে পুলিশের যে মুখ পুড়বে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।