ভারতের বিরুদ্ধে শুল্ক যুদ্ধে ট্রাম্প! দিল্লির অস্ত্র ধৈর্য, রফায় আসতেই হবে ওয়াশিংটনকে

ভারতের বিরুদ্ধে শুল্ক যুদ্ধে ট্রাম্প! দিল্লির অস্ত্র ধৈর্য, রফায় আসতেই হবে ওয়াশিংটনকে


আমেরিকার দিক থেকে আসা শুল্ক সংক্রান্ত যাবতীয় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ভারত ধৈর্য ধরবে। এবং তাতেই শুল্ক যুদ্ধে ভারত জিতবে। লিখলেন উত্তম দেব-

অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ভারতের বৈদেশিক নীতি বদলাতে চায় আমেরিকা! বুধবার ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পর ভারতের বিরুদ্ধে যে ভাষায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। এমনকি একাত্তরে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন‌ও ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এত কঠোর বাক্য উচ্চারণ করেন নি। ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে দর কষাকষিতে নামতে হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশকেই। আলোচনার মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্র‌ই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ট্যারিফ ইস্যুর মীমাংসা করে নিয়েছে।

ভারতের বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন মোদীবন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুল্ক যুদ্ধ! এআই-এর সাহায্যে তৈরি কার্টুন

শুল্কনীতি নিয়ে ভারত ও আমেরিকার বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত পাঁচ দফা বৈঠক হয়েছে। কিন্তু সমাধানসূত্র বেরোয় নি। আমেরিকা ভারতের কাছ থেকে ঠিক কী প্রত্যাশা করে, তা খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন পণ্যের উপর ভারত চড়া হারে শুল্ক বসায়, এই অভিযোগ করতে করতে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নিঃসন্দেহে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক ঘাটতি বিরাট। ২০২৪ সালে আমেরিকার বাজারে ভারত পণ্য রফতানি করেছে প্রায় ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের। পক্ষান্তরে ভারতের বাজারে আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য ৪১.৮ বিলিয়ন ডলার। ভারতের সঙ্গে লেনদেনে ৪৫.৭ বিলিয়ন ডলারের এই ঘাটতি ব্যবসায়ী ট্রাম্পের গাত্রদাহের কারণ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ, ভারত বন্ধুরাষ্ট্র হলেও আমেরিকার পণ্যের উপর অত্যন্ত চড়া হারে শুল্ক চাপায় এবং এর ফলেই ভারতের বাজারে পণ্য রফতানিতে উৎসাহী নন মার্কিন উৎপাদকেরা। দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর থেকেই শুল্ক নিয়ে পৃথিবীর সব দেশের সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত করতে চান ট্রাম্প। ট্রাম্প মনে করেন, কমবেশি সব রাষ্ট্র‌ই আমেরিকার পণ্যের উপর বাড়াবাড়ি রকমের শুল্ক চাপিয়ে দিয়ে আমেরিকার অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছে। এই ব্যাপারে চিনের পরে ভারতের উপরেই যে তিনি সবথেকে বেশি রুষ্ট, তা বারেবারে বুঝিয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাচাল ট্রাম্প কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ধার ধারেন না। দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হ‌ওয়ার পর থেকেই চাঁচাছোলা ভাষায় ভারতের বাণিজ্য নীতিকে আক্রমণ চালিয়ে আসছেন ট্রাম্প। বাণিজ্য ছাড়িয়ে এখন যে তা রাজনীতিতে গিয়ে পৌঁছেছে, ট্রাম্পের বুধবারের বক্তব্যে তা স্পষ্ট।

ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েও ক্ষান্ত নন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করার কারণে ভারতের উপর জরিমানাও চাপালেন ট্রাম্প! ফাইল ফটো

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, পয়লা অগাস্ট থেকেই ভারতের পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জিইয়ে রাখার কারণে ভারতের উপর একটি ‘জরিমানা’ চাপানো হবে বলেও হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। প্রশ্ন হল, আমেরিকা ও ভারতের বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদলের মধ্যে পাঁচ-পাঁচবার বৈঠকের পরেও কেন সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হল দুটি দেশ? ভারতের দিক থেকে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু আমেরিকা ভারতের কাছ থেকে এমন কিছু চেয়ে বসেছে, যা পূরণ করা সাউথ ব্লকের পক্ষে সম্ভব নয়। দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনটা শুধু বাণিজ্যিক হলে, ভারতের দিক থেকে রফায় পৌঁছানো খুব একটা কঠিন হত না।

ভারতের পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের যা বলেছেন এবং তারপর থেকে বাচাল ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে যা বলে আসছেন, তা থেকে স্পষ্ট হোয়াইট হাউস ভারতের বাণিজ্য ও বিদেশনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ভারতের উপর শুল্ক ধার্য করার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নাতিদীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “ভারত যদিও আমাদের বন্ধু, তবে বিগত বছরগুলোতে তাদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম বাণিজ্য করেছি আমরা। কারণ, তাদের শুল্ক অনেক বেশি, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। তারা বিশ্বের যে কোনও রাষ্ট্রের তুলনায় সবচেয়ে কঠোর ও বিরক্তিকর অর্থনৈতিক নয় এমন বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।” এরপরেই থলে থেকে বিড়াল বের করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি লিখেছেন, “তারা (ভারত) সবসময় সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ রাশিয়ার কাছ থেকে কিনে থাকে। সবাই যখন চায়, রাশিয়া যেন ইউক্রেনে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে, ঠিক সে সময়ে  চিনের মতোই রাশিয়ার জ্বালানির সবথেকে বড় ক্রেতা ভারত। এইসব ভাল লক্ষণ নয়!”

একটি সময় ছিল ভারত যত সমরাস্ত্র আমদানি করত, তার ৮০ শতাংশের যোগানদার ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এখন রুশ অস্ত্রের উপরে নির্ভরতা অনেক কমিয়ে দিয়েছে ভারত। তারপরেও বর্তমানে ভারত বাইরে থেকে যত সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা করে, তার প্রায় চল্লিশ শতাংশ রাশিয়ান। প্রতিরক্ষা ব্যয়ে ভারত বিশ্বে চতুর্থ। ৮৫-৮৬ বিলিয়ন ডলারের এই বাজারের দিকে আমেরিকার লোভ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ভারত কার কাছ থেকে কী কিনবে, কতটুকু কিনবে, তা ঠিক করে দেবে হোয়াইট হাউস?

জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভারত স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনতে প্রত্যেক বছর ভারতকে প্রচুর টাকা ব্যয় করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ২২০.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি করেছে ভারত। জ্বালানি বাবদ ভারত সরকারকে প্রচুর টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। যার কাছ থেকে দামে সস্তায় পড়বে, তার কাছ থেকেই জ্বালানি কিনবে দিল্লি। ইউক্রেনে যুদ্ধ বাঁধিয়ে বিপদে পড়েছেন পুতিন। আমেরিকা-ন্যাটো রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুদ্ধের খরচ জোগাতে রাশিয়ার টাকা দরকার। তেল বেচে সেই টাকা তুলছে মস্কো। সস্তায় কিনছে চিন ও ভারত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে দেখা যাচ্ছে, ভারত যত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার প্রায় চল্লিশ শতাংশ‌ই আসছে রাশিয়া থেকে।

ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। ভারতকে চাপ দিয়ে রাশিয়ার তেল কেনা থেকে বিরত রাখতে চায় ওয়াশিংটন। কিন্তু ভারত নত হয় নি। পাকিস্তান, সৌদিআরব, ইজিপ্ট, তুরস্ক নয় ভারত। উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই শেষে ভারত স্বাধীন হয়েছে। উপনিবেশিক শক্তি ভারতকে বিভক্ত করেছে। আমেরিকার সঙ্গে স্বাধীন-সার্বভৌম ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাস মোটেই মসৃণ নয়। ভারত সরকারকে ১৫০ কোটি নাগরিকের মুখের দিকে চেয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। কেন্দ্রে যে দলের সরকার‌ই থাকুক, সরকার চাইলেও আমেরিকার কথায় নাচতে পারবে না। ভারতীয় গণতন্ত্র চরিত্রগতভাবেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী।

ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার বন্ধ নেই ভারতবন্ধু ট্রাম্পের। ‘ভারত ও রাশিয়ার অর্থনীতি মৃত’, সামাজিক মাধ্যমে লিখলেন ট্রাম্প। সংগৃহীত ফটো

ভারতের উপরে ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুপা বন্ধ নেই। ভারত ও রাশিয়াকে কটাক্ষ করে ট্রাম্প এবার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, “ভারত ও রাশিয়ার অর্থনীতি মৃত! চাইলে উভয়েই আরও অর্থনৈতিক অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।” বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। চলতি বছরে ভারতের নমিনাল জিডিপি ৪.১৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে ‘আইএম‌এফ’-এর অনুমান। যা বিশ্বে চতুর্থ। বুনিয়াদি জিডিপি বা ক্রয়ক্ষমতার সমতুল্যতার বিচারে ২০২৩-২৪ সালে ভারতের অর্থনীতি ছিল প্রায় ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের। বিশ্বে ভারতের অবস্থান তিন নম্বরে।

আজ থেকে মাত্র চার বছর পরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবেই শূন্যে পরিণত হবে। কিন্তু ভারতবর্ষ থাকবে। ভারতবর্ষের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় বাজার থাকবে। ছোটখাটো হোঁচটে এই বাজার মুখ থুবড়ে পড়বে না। আমেরিকার দিক থেকে আসা শুল্ক সংক্রান্ত যাবতীয় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ভারত ধৈর্য ধরবে। এবং তাতেই শুল্ক যুদ্ধে ভারত জিতবে। ইতিহাস নিঃসন্দেহে দুই বিবদমান প্রতিবেশী চিন ও ভারতের পক্ষে। 

Feature graphic is representational and designed by NNDC.




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *