ক্রিকেটার সৌরভকে ক্রিকেটার সৌরভই থাকতে দেওয়া উচিত। এবং সৌরভের নিজেরও এই পরিচয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। সফতলম বাঙালি ক্রিকেটারের জন্মদিনে লিখলেন উত্তম দেব-
ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের সবথেকে সফলতম বাঙালি ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। এখনও পর্যন্ত। ভবিষ্যতে আর কোনও বাঙালি ক্রিকেটার সৌরভের কীর্তিকে ছাপিয়ে যাবেন কিনা, তা ভবিষ্যতই বলবে। ভারতের জাতীয় ক্রিকেটের যে ইতিহাস, সেখানেও সৌরভের জায়গা পাকা। আজ থেকে একশ বছর পরে ভারতবর্ষের সামগ্রিক ইতিহাসের যে অংশটিতে কেবল ক্রিকেটের কথাই লেখা থাকবে, সেখানে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্য একটা ‘প্যারা’ বরাদ্দ হয়ে গেছে। যে সৌরভ গেঞ্জি-জাঙ্গিয়ার বিজ্ঞাপন করেছেন, সেই সৌরভ হারিয়ে যাবেন। যে সৌরভ টিভিতে দাদাগিরি করে দিদিদের কাছে হিরো হয়েছেন, সেই সৌরভকেও ইতিহাস মনে রাখবে না। ইতিহাস মনে রাখবে শুধু ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে। কারণ, এখানেই সৌরভ সফল এবং কৃতবিদ্য।

ক্রিকেটার সৌরভকে ক্রিকেটার সৌরভই থাকতে দেওয়া উচিত। এবং সৌরভের নিজেরও এই পরিচয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। একটা মানুষের একটা জীবনে শুধুমাত্র একটা ক্ষেত্রে সাফল্যের শীর্ষে ওঠাটাই যথেষ্ট। ক’জন মানুষ নিজের কেরিয়ারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লাভ করে? আমরা বাঙালি বা ভারতীয়দের একটা বাজে বাতিক হল, বৃহত্তর সামাজিক দায়, দেশোদ্ধারের দায় নিজের ছোট কাঁধে তুলে নিয়ে ‘শহিদ’ হওয়ার আত্মসুখ লাভ করা এবং অন্যকেও শহিদ হতে বাধ্য করা। সমাজে যাঁরা সৌরভের মতো কৃতী, তাঁদের দশচক্রে সর্ব বিষয়েই মহান হওয়ার একটা ঝুঁকি থাকে। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, পাঁচজনের তোষামোদ-খোশামোদে, মিডিয়ার গ্যাস খেয়ে নিজের আওকাদের বাইরে গিয়ে আরও অনেক কিছু হয়ে ওঠার চেষ্টাটাই শেষ পর্যন্ত কোনও সফল ব্যক্তির জীবনে অযথা বিড়ম্বনা ডেকে আনে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও তার ব্যতিক্রম নন।
যে খুব সফল, এমনিতেই তাঁর কাছে বাঙালির মেলা ‘ডিমান্ড’। তদুপরি যে সফল তাঁকে মাথায় তুলে আছাড় মারতেও আমাদের সময় লাগে না। অকারণ সমালোচনার বিষ দংশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো জিনিয়াসকেও নীল করে তুলতে বাঙালি ছাড়ে নি। ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কোন ছাড়। সৌরভ বরং নিজের দোষেই নিজের দিকে স্বজাতির অনেক কটাক্ষ ডেকে এনেছেন। নিজের উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবসায় লগ্নি করা অন্যায় নয়। অনেক সফল খেলোয়াড়ই তা করে থাকেন। কিন্তু তা বলে সৌরভ একজন সফল বিনিয়োগকারী বা শিল্পপতি নন। বাংলাকে শিল্পোন্নত করার না সৌরভের কোনও দায় আছে, না আছে কোনও যোগ্যতা।
আর রাজনীতি! সৌরভের মাথা থেকে যদি রাজনীতির ভূত নেমে গিয়ে থাকে সৌরভ বেঁচে গেছেন। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় রাজনীতিতে এলে তাঁর কপালেও অমিতাভ বচ্চনের মতো দুর্ভোগ ছিল অনিবার্য। রাজনীতির পিচে রান তোলা ক্রিকেটের পিচ থেকে অনেক বেশি কঠিন। এবং পলিটিক্সের মতো ভয়ঙ্কর গেম দুনিয়াতে আর একটিও নেই। আনাড়িদের তা থেকে দূরে থাকাই উচিত।
শেষ পর্যন্ত সার কথা একটাই- শ্রেষ্ঠ বাঙালি ক্রিকেটারের নাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।