বাংলা রঙ্গমঞ্চের অসাধারণ অভিনেত্রী ছিলেন কেয়া চক্রবর্তী। ৪৯ বছর আগে সিনেমার শ্যুটিং করতে গিয়ে গঙ্গায় তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু। কম বিতর্ক হয় নি সে’দিনও। পড়ুন কেয়া কাহিনি-
অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের যেমন ওড়িশার তালসারিতে সিরিয়ালের শ্যুটিং চলাকালে সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয়েছে, আজ থেকে ৪৯ বছর আগে হাওড়ার সাঁকরাইলেও সিনেমার শ্যুটিং করার সময় গঙ্গায় ডুবে মারা গিয়েছিলেন এক বাঙালি অভিনেত্রী। নাম তাঁর কেয়া চক্রবর্তী। ৪২ বছরের রাহুল ২৯ মার্চ বিকেলে সমুদ্রে নেমে তলিয়ে যান। এই মার্চেই গঙ্গায় ডুবে মৃত্যু কেয়ার। ১৯৭৭ সালের ১২ মার্চ ছিল দিনটি। রাহুলের মৃত্যু যেমন আজ অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, ৩৫ বছরের কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যুও সেদিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সমাজে অনেক বিতর্ক উস্কে দিয়েছিল।
কেয়া চক্রবর্তী ছিলেন সত্তরের দশকে বাংলা থিয়েটারের অসামান্য এক অভিনেত্রী। বিদুষী ও রূপবতী- দুই-ই ছিলেন কিংবদন্তি কেয়া। ১৯৪২ সালের ৫ অগাস্ট উত্তর কলকাতার বাগবাজারে কেয়া চক্রবর্তীর জন্ম। নাটক অন্তপ্রাণ কেয়ার নিজের জীবনটাই ছিল নাটকীয়তার মোড়া। মা-বাবার মধ্যে বনিবনা ছিল না। মায়ের কাছেই মানুষ হয়েছেন কেয়া। ছোটবেলা থেকেই মেধাবিনী। কৈশোর থেকেই থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ইংরেজিতে সাম্মানিক স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ। ১৯৫৮-৫৯-৬০, পর পর তিন বছর আন্তঃকলেজ নাট্য প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন কেয়া। এমএ পাশ করার পর স্কটিশ চার্চ কলেজেই ইংরেজির অধ্যাপিকার চাকরি পান তিনি। কলেজের পড়ুয়া মহলে শিক্ষক হিসেবে কেয়া চক্রবর্তী ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়।
১৯৬৫ থেকে আমৃত্যু নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কেয়া চক্রবর্তী। যদিও ১৯৬১-তে নান্দীকারের হয়ে কেয়ার প্রথম অভিনয় ‘চার অধ্যায়’ নাটকে। ‘তিন পয়সার পালা’, ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র’, ‘শের আফগান’, ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’, ‘নটি বিনোদিনী’, ‘আন্তিগোনে’ ও ‘ভালোমানুষ’ নাটকে কেয়া চক্রবর্তীর দুরন্ত অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। কেয়া একাধারে ছিলেন মেধাবী ছাত্রী, অসাধারণ অধ্যাপক, তুখোড় অনুবাদক ও অবিস্মরণীয় অভিনেত্রী। গানের গলাও দুর্দান্ত। তবে সব ছাপিয়ে তিনি ছিলেন থিয়েটার অন্তপ্রাণ। ১৯৭৪ সালে অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে নান্দীকারের পূর্ণ সময়ের কর্মী হয়েছিলেন কেয়া। থিয়েটারের প্রতি কতটা ভালবাসা থাকলে স্থায়ী চাকরি ও নিশ্চিত রোজগারের পথ ছেড়ে সর্বক্ষণের নাট্যকর্মীর অনিশ্চিত জীবন বেছে নেওয়া যায়!
কেয়া চক্রবর্তী ছিলেন সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ। একদিকে কাজ পাগল, অন্যদিকে সমাজের ব্রাত্যজনদের প্রতি সংবেদনশীল। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একরোখা, জেদি, পরিশ্রমী ও স্পষ্টভাষী। ভালোবেসে নাট্যকার রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে বিয়ে। কিন্তু ঘর বেঁধে কেয়া সুখী ছিলেন, এ কথা বলা যাবে না। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে কখনও দ্বিধা করতেন না কেয়া। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর আর্থিক কষ্টে ভুগেছেন। নিজের খরচ মেটাতে বাটা কোম্পানির বিজ্ঞাপন লেখার কাজ করেছেন। বেতার নাটকে অভিনয় ও অনুবাদ করেও কিছু আয় করতেন। আবার অজিতেশ-রুদ্রপ্রসাদের ‘নান্দীকার’-এর দৈন্যদশা কাটাতে নিজের গয়না পর্যন্ত বেচে দিয়েছেন। কেয়ার জীবনচরিত যেন নাটকের চরিত্রকেও হার মানায়।
মা লাবণ্য দেবীর হৃদযন্ত্রে গোলযোগ দেখা দিলে ডাক্তার পেস-মেকার বসাতে বলেন। মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতেই চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নেন কেয়া চক্রবর্তী। সিনেমার নাম “জীবন যে রকম”। অন্ধ মায়ের চরিত্রে অভিনয় করতে বলা হয়েছিল তাঁকে। ১৯৭৭-এর ১২ মার্চ দুপুরে হাওড়ার সাঁকরাইলে মাঝ গঙ্গায় একটি লঞ্চের উপর সিনেমাটির শ্যুটিং চলছিল। যে দৃশ্যের টেক নিচ্ছিলেন পরিচালক স্বদেশ সরকার, সেটি ছিল মা ও ছেলে লঞ্চে করে যাচ্ছেন। ছেলে হঠাৎ করে লঞ্চ থেকে নদীতে পড়ে যাবে। অন্ধ মা ছেলেকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দেবেন। কেয়া চক্রবর্তী সাঁতার জানতেন না। কিন্তু দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করার সময় তিনি গঙ্গায় ঝাঁপ দেন এবং তলিয়ে যান। পরদিন সকালে সাঁকরাইল থেকে পাঁচ মাইল দূরে হীরাপুরে কেয়ার দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। কেয়ার শাড়ির আঁচল লঞ্চের প্রপেলারের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছিল বলে পুলিশ সন্দেহ করে।
কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যু ঘিরে তুমুল শোরগোল পড়ে গিয়েছিল রাজ্যে। মাঝ গঙ্গায় শ্যুটিং ঘিরে অনেক প্রশ্ন তুলেছিলেন সাধারণ মানুষ থেকে শিল্পীমহল সকলেই। সিনেমায় সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যের শট নেওয়ার সময় দক্ষ ডামিকে ব্যবহার করা হয়। কেয়া সাঁতার জানতেন না। কেন নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্যে ডামি ব্যবহার করেন নি পরিচালক? কেয়া কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝাঁপ দিয়েছিলেন নাকি পরিচালকের নির্দেশে তিনি ঝাঁপ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন? মাঝ গঙ্গায় শ্যুটিং। অথচ শ্যুটিং স্পটে কেন লাইফ জ্যাকেট, লাইফবোটের মতো কোনও সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না? এমনকি জলের তলায় কেন পাতা ছিল না সুরক্ষা জাল ও শ্যুটিং স্পটে কেন রাখা হয় নি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল? এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে নি সেদিন।
সিনেমার শ্যুটিং করতে গিয়ে কেয়া চক্রবর্তীর ডুবে মৃত্যুতে ক্ষোভ উগরে দিয়ে নাট্যকার উৎপল দত্ত লিখেছিলেন, “চলচ্চিত্রের কিছু ক্রিমিনালের গাফিলতিতে বাংলা নাটকের কত বড়ো ক্ষতি হয়ে গেল, সেটা কি চলচ্চিত্রের অভিনেতৃবৃন্দ কোনও দিন বুঝবেন? এ যেন নাট্যকর্মীদের বৃহত্তর আত্মহত্যার প্রতীক।” কেয়ার শেষযাত্রায় মানুষের ঢল নেমেছিল। চোখে জল নিয়ে হেঁটেছিলেন কেয়ার নান্দীকারের সহকর্মীরা। তাঁদের হাতে ধরা পোস্টারে লেখা ছিল-“কেয়াদি তুমি কাজ করতে করতে চলে গেলে। আমরা কাজ করতে করতে তোমাকে মনে রাখব।”
Feature image is representational and AI generated.