ইরানের পাশে ভারত নেই কিন্তু ইরানের পাশে আছেটা কে?

ইরানের পাশে ভারত নেই কিন্তু ইরানের পাশে আছেটা কে?


ইরান ইস্যুতে ভারত কেন আগ বাড়িয়ে আমেরিকার শত্রু হতে যাবে? লিখলেন উত্তম দেব-

ইরানের পাশে ইরানের মুসলিম প্রতিবেশীরাই নেই। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ভারতকে ইরানের পাশে থেকে আমেরিকার বিরাগভাজন হতে হবে! ফিলিস্তিনিদের পাশে ইজিপ্ট, সৌদি আরব, জর্ডন সহ আরব বিশ্বের কোনও দেশ নেই। কিন্তু ভারতকে ফিলিস্তিনিদের পাশে থেকে ইজরায়েলের বিরাগভাজন হতে হবে! কেন ভাই?

যুদ্ধ নিঃসন্দেহে খুব খারাপ একটা ব্যাপার। মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা লম্বা সময় ধরে চললে বিশ্ব অর্থনীতির উপর গুরুতর প্রভাব পড়বেই। যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়াই যেত, কিন্তু বজ্জাত ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই রাস্তায় যায় নি। এখন প্রশ্ন একটাই, চুপচাপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া ভারতের কী করার আছে?

মানছি শিয়া থিয়োক্রেটিক রাষ্ট্র ইরান ভারতের শত্রু নয়। ইরানের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভাল। আমেরিকার জারি করা অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয়। কোনও দেশ ইরানের সঙ্গে সোজা রাস্তায় ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে না। আমেরিকার শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে ইরান তার খনিজ তেলের খুব সামান্য অংশই আন্তর্জাতিক বাজারে বেচতে পারে। ভারত নানা রকম চ্যানেলে ইরানের সঙ্গে লেনদেন জারি রেখেছিল এতদিন। এতে ভারতের লাভ ছিল অবশ্য‌ই কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ইরানের গরজ ছিল তার চেয়ে বেশি।

আমেরিকা-ইজরায়েলের বোমায় খামেনেই নিহত হ‌ওয়ার পাঁচ দিন পর শোকপ্রকাশ করল ভারত। দিল্লিতে ইরানের দূতাবাসে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি ও ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতালি। সংগৃহীত ফটো

ভারতের থেকে চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তেহরানের। এই দুই দেশ ইরানের কাছে অস্ত্র-শস্ত্র বেচে। চিন‌ও ঘুপেচুপে ইরানের কাছ থেকে সস্তায় তেল কেনে। ইরান তার ড্রোন প্রযুক্তি রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছে। রাশিয়া সেই ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করছে। কিন্তু এখন ইরানের এই ঘোর বিপদে চিন-রাশিয়া কোথায়? বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কোন কাজটি এই দুই দেশ করেছে, যাতে ইরান হাঁফ ছেড়ে বাঁচে? মুসলিম বিশ্বের অনেকেই তো এখন এরদোগানের মধ্যে খলিফার ছায়া দেখতে পান। তা ইরানের এই বিপদের দিনে আধুনিক খলিফাটি কোথায়?

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই এক মেরু বিশ্বে আমেরিকা পৃথিবীর একমাত্র মোড়ল। সবাই জানে। গত ৩৫ বছরে আমেরিকার রোষানল থেকে কোন দেশকে রক্ষা করতে পেরেছে চিন-রাশিয়া? অন্যায় যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনকে গদি থেকে টেনে নামিয়ে বিনাশ করেছে আমেরিকা ও তার মিত্ররা। পুতিন বাঁচিয়েছেন সাদ্দামকে? লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে বাঁচিয়েছে? সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের রেজিম টিকেছিল রাশিয়ার ভরসায়। শেষ পর্যন্ত আসাদের তখত রক্ষা করতে পেরেছেন পুতিন? ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে গিয়ে কয়েদ করল ট্রাম্প। এখন ভেনেজুয়েলা আমেরিকার কুক্ষিগত। বন্ধু চিন-রাশিয়া মাদুরোর ইজ্জত বাঁচাতে পারল?

কোনও চতুর রাষ্ট্র নিজের আওকাদের বাইরে গিয়ে ফাল পারে না। চিন ভারতের থেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে। চিনের প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ভারতের থেকে বহুগুণ বেশি। কিন্তু চিন শেষ কবে যুদ্ধে জড়িয়েছে? ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর চিন আর কোনও যুদ্ধে জড়ায় নি। দেখবেন, শি জিনপিংয়ের চিন তাইওয়ান নিয়ে অনেক হম্বিতম্বি করে, মনে হয় এই বুঝি তাই‌‌ওয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ল চিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেইজিং নিজেকে গুটিয়ে নেয়। চিন বুঝেছে, খামোখা সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে নিজের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনও মানে হয় না। আধুনিক যুদ্ধ শুধু লোকক্ষয়কারীই নয়, অর্থনাশকারীও। যুদ্ধ করতে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করতে হয়। কোনও চালাক রাষ্ট্র, যার বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় জায়গা দখল করার উচ্চাশা আছে, সব সময় যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ভারতের উপর শুল্কের পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছিল, ভারত সঙ্গতকারণেই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। ভারতের রফতানিকারকেরা চোখে সর্ষেফুল দেখছিলেন। কেন দেখবে না? এই মুহূর্তে আমেরিকার সঙ্গে ভারত বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছে। ভারতের রফতানি বাণিজ্যের একটা বড় অংশ আমেরিকার সঙ্গে। ভারত প্রত্যেক বছর আমেরিকায় গড়ে ৮০-৮৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে। ভারতীয় মেধা শিল্প আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক বছর গড়ে দেড় লক্ষ ভারতীয় H-1B ভিসায় স্টেটসে পাড়ি জমান। আমেরিকা ২০২৪ সালে যত H-1B ভিসা ইস্যু করেছিল, তার ৬৮.৬ শতাংশ পেয়েছে ভারতের মেধাবীরা। এতে ভারতের লাভ না ক্ষতি? যে আগুনখোর বামপন্থী নেতা রোজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শ্রাদ্ধ না করে মুখে অন্ন তোলেন না, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তাঁর ছেলেমেয়েও সিলিকন ভ্যালিতে চাকরি করে!

বিশ্ব এখন অর্থনীতি কেন্দ্রিক। যে দেশের হাতে শক্তিশালী অর্থনীতি, দেশে দেশে বাজার দখল করার মতো পুঁজি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা নেই, সেই দেশের ভবিষ্যৎ নেই। ভারত ১৪৫ কোটি মানুষের দেশ। ভারত সরকারকে ১৪৫ কোটি নাগরিকের রুটি-রুজির কথা চিন্তা করে পা ফেলতে হয়। ভারত পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি কিন্তু জ্বালানি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অনেক অঙ্ক কষে ভারতকে তার জ্বালানি সংক্রান্ত নীতি তৈরি করতে হয়। পৃথিবীতে আদর্শবাদের যুগ বহু আগেই অস্তমিত। এখন লাভ-ক্ষতির চুলচেরা বিচার না করে কোনও দেশ পা ফেলে না। ভারত কেন ফেলতে যাবে? ইরান ইস্যুতে ভারত কেন আগ বাড়িয়ে আমেরিকার শত্রু হতে যাবে?

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।

Feature graphic is representational and designed by NNDC.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *