নয়াদিল্লির অপছন্দের কাউকেই মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেন না তারেক রহমান

নয়াদিল্লির অপছন্দের কাউকেই মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেন না তারেক রহমান


শপথ শেষে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে করমর্দন করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভূমিধস বিজয় ছিনিয়ে আনে বিএনপি। ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে ভোটগ্রহণ হয়েছে ২৯৯টি আসনে। দুটি আসনের ফল ঘোষণার উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি একাই জিতেছে ২০৯টি, শরিকেরা জয়লাভ করেছে ৩টি আসনে। যে দুটি আসনের ফল ঘোষণা আদালতের নির্দেশে স্থগিত, সেই দুই আসনেও বিএনপি এগিয়ে।

আওয়ামি লিগ বিহীন নির্বাচনে নজরকাড়া ফল ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামির‌ও। ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধীদলের আসনে জামাত। আসন জেতাতেও রেকর্ড করেছে জামায়াতে ইসলামি। ১৯৯১-এর সংসদ নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮টি আসন জিতেছিল জামাত। ২০০১-এর নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোট করে জামাত জয়লাভ করেছিল ১৭টি আসনে। ২০২৬-এর নির্বাচনে একলাফে জামাতের আসন আটষট্টিতে! জামাতের জোটসঙ্গী এনসিপি ৬টি আসনে জয়লাভ করেছে, জোটের অন্যান্যরা জিতেছে ৩টি আসনে।

রেকর্ড সংখ্যক আসনে জয়লাভ করার পরেও জামাতের নেতাদের মন ভাল নেই। নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের আশায় ছিলেন জামাত-এনসিপির নেতারা। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় প্রথমবারের মতো ঢেলে ভোট দিয়েছে ধানের শীষে। আওয়ামি লিগ সমর্থকদের সিংহভাগের ভোট গিয়েছে বিএনপির ঘরে। সমাজের নারীরাও গৃহবন্দি হ‌ওয়ার আতঙ্কে মৌলবাদী জামাতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। জামাতের যদিও অভিযোগ, ডিপস্টেট ও ভারতের ষড়যন্ত্রে নির্বাচনের ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং হ‌ওয়ায় পরাস্ত হয়েছে তারা।

ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে বাংলাদেশের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাধিক্যে জয়লাভ করায় ভারত যে খুশি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফল ঘোষণার সাথে সাথেই তারেক রহমান ও বিএনপিকে জয়ের অভিনন্দন জানিয়ে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরে তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনেও কথা বলেন মোদী। তারেকের চাপে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে মোদীকে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। যদিও ভারত সফররত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর সঙ্গে মুম্বাইয়ে পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক থাকায় বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারেন নি নরেন্দ্র মোদী। তারেকের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের হয়ে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। বাংলাদেশের সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মোদী। মোদীর আমন্ত্রণপত্র এদিন তারেকের হাতে তুলে দেন ওম বিড়লা।

তারকের মন্ত্রিসভার দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ছবি: এন‌এনডিসি

ভারতীয় কূটনীতিকরা অপছন্দ করেন, দলের এমন কাউকে তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেন নি। গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ঘটনাচক্রে সালাহউদ্দিন আহমেদকে দীর্ঘ ৯ বছর মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে কাটাতে হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা আমীর খসরু। দলের মধ্যে খসরু ভারতপন্থী বলেই পরিচিত। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সঙ্গেও ভারতীয় কূটনীতিকদের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। তারেক রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন ড. খলিলুর রহমানকে। ইউনূসের সরকারে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন খলিলুর। তারেকের মন্ত্রিসভায় দু’জন সংখ্যালঘু মুখ। বিএনপির প্রবীণ নেতা নিতাই রায় চৌধুরীকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী করা হয়েছে দীপক দেওয়ানকে।

মঙ্গলবার সকালে সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি জোটের ২১২ জনকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান এ এম এম নাসির উদ্দিন। যদিও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করেন বিএনপি জোটের সংসদ সদস্যরা। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আগেই এ ব্যাপারে দলের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, “আমরা কেউই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হ‌ই নি। সংবিধানে এখনও এটা ধারণ করা হয় নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা আগে সংবিধানে ধারণ করতে হবে। এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে।’

বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করায় গণভোট ও জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ল বলে মনে করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল।

Feature image: collected

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *