বসন্তে মুকুলের এমন মলিন ঝরে পড়া!

বসন্তে মুকুলের এমন মলিন ঝরে পড়া!


রবিবার গভীর রাতে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মুকুল রায় মারা গেলেন। বেশ কয়েক বছর ধরেই অসুখে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। সম্প্রতি শয্যাশায়ী ও রোগ যন্ত্রণায় কাতর মুকুল রায়ের একটি ছবি তুলে তাঁর নার্সিংস্টাফ বা  ঘনিষ্ঠমহলের কেউ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করেছিল। অনৈতিক, অশোভন কাজ করতে ইদানিং বাঙালির জুড়ি নেই। ছবির মানুষটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। বয়স বাহাত্তর ছোঁয়ার খানিক আগেই এই সময়ের বঙ্গ রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত ও বর্ণময় এক চরিত্রের জীবনাবসান হল।

বাহাত্তর তেমন কোনও বয়স নয়। কিন্তু দুরারোগ্য রোগ মুকুল রায়কে ধরাশায়ী করে ফেলেছিল। মৃত্যু তাঁকে মুক্তি দিল বলাই যায়। নিঃসন্দেহে রাজনীতি খুব সোজাসাপ্টা মানুষের বিচরণক্ষেত্র নয়। রাজনীতির জটিল কুটিল ময়দানে মুকুল রায় ছিলেন একজন দক্ষ খিলাড়ি। যে সমস্ত ভাল-মন্দ গুণাবলী থাকলে রাজনীতিতে তড়তড়িয়ে উপরে ওঠা যায়, তার অনেকগুলিই মুকলের আয়ত্তে ছিল। বাগ্মী কোন‌ও কালেই ছিলেন না। তাই জনপ্রিয় নেতা হ‌ওয়ার সুযোগ তাঁর হয়ে ওঠে নি। তবে খুব ভাল জানতেন পেছনে বসে কলকাঠি নাড়াতে। সংগঠন গড়া ও ভাঙা- দুটোতেই মুকুলের দক্ষতা ছিল সহজাত। লোক চিনতেন খুব ভাল। কাকে দিয়ে কোন কাজ হবে, দেখেই বুঝতে পারতেন।

ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বীজপুরের কাঁচরাপাড়ার ছেলে। মফস্‌সল শহরের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।‌ সাধারণ মেধা। কিন্তু বুদ্ধিতে সেয়ানা। মনে উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কলেজ জীবনে বাম ছাত্র সংগঠন করলেও কলেজ থেকে বেরিয়েই কংগ্রেসের সঙ্গে জুড়ে যান মুকুল। সোমেন মিত্রের শিবিরে ঘোরাঘুরি করতেন কিন্তু যতদিন কংগ্রেসে ছিলেন ততদিন নেতা বলতে যা বোঝায়, তা হয়ে উঠতে পারেন নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে মুকুল রায়ের ভাগ্যত্থান যেন নিয়তি নির্ধারিত। মমতার কংগ্রেস ত্যাগ ও পৃথক দল গঠনের সূচনালগ্ন থেকেই মুকুল রায় সক্রিয়ভাবে জড়িত। সেই কঠিন সময়ে মমতা যাঁদের উপর সবথেকে বেশি নির্ভর করতেন, মুকুল তাঁদের মধ্যে শুধু অন্যতম‌ই নন, বরং এক নম্বর।

মুকুল ও মমতা: তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর থেকে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মুকুল রায়কে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ফটো

তৃণমূল কংগ্রেসের নথিপত্র তৈরি, দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতরে তা জমা করা- সব কাজ প্রায় একার হাতে সামলেছেন মুকুল রায়। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মুকুল‌‌ই। এরপর থেকে যত দিন গড়িয়েছে, কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে মমতার টালির চালের ঘরে মুকুল রায়ের দাপট বেড়েছে। মমতা ক্ষমতায় আসার বহু আগে থেকেই তৃণমূলের সংগঠনের রাশ মুকুল রায়ের হাতে। দলের ব্যাক অফিস সামলাতেন ঠান্ডা মাথার মুকুল। ২০০৬ সালে সিঙ্গুর আন্দোলনের সৌজন্যে পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তনের শুরু। এরপর আসে নন্দীগ্রামের উত্তাল জমি বাঁচাও আন্দোলন। সিপিএমের পায়ের তলা থেকে মাটি সরতে শুরু করে। বাড়তে থাকে মমতার জনপ্রিয়তা। ২০০৭ থেকে তৃণমূলের সঙ্গে অন্যান্য দলের সম্পর্ক তৈরি, মমতাকে বিদ্বজ্জন ও সুশীল সমাজের কাছাকাছি আনার নেপথ্যে যিনি সফলভাবে কলকাঠি নেড়েছেন, তিনি মুকুল রায় ছাড়া আর কেউ নন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বেই মমতা জেনেছেন, আড়ালে বসে মুকুল কী পারেন আর কী না পারেন!

ভাষণ দিয়ে সভা জমানোর প্রতিভা মুকুল রায়ের ছিল না। কিন্তু কূটকৌশলে তিনি সিদ্ধহস্ত। কংগ্রেসকে তৃণমূলের কাছাকাছি না আনলে বাংলায় মমতার জন্য ক্ষমতা যে অধরাই থাকবে ধূরন্ধর মুকুলের তা বুঝতে অসুবিধা হয় নি। শুধু তাই নয় দলের জন্য টাকা জোগাড় থেকে প্রশাসনের ভেতরে দলের জাল বিস্তার- ২০০৮ থেকেই এ সব নিয়ে গোপনে কাজ শুরু করে দেন চাণক্য মুকুল রায়। নিজের মিশন সফল করতে গিয়ে মুকুল যে খুব ন্যায়-নীতির ধার ধারতেন, তা মোটেই নয়। মুকুল আর যাই ছিলেন, খুব নীতিবান ছিলেন না। ছলে ও কৌশলে কাজ হাসিল করতেন। প্রয়োজনে যে বল প্রয়োগ করতেন, ভয় দেখাতেন, হুমকি দিতেন, এই অভিজ্ঞতা মুকুলের পাল্লায় পড়ে যাঁরা অন্য দল ছেড়ে তৃণমূলে এসেছেন, তাঁদের আছে।

আমলা ও আইপিএসদের হাঁড়ির খবর রাখতেন মুকুল রায়। প্রশাসনযন্ত্রকে আঙুলের ডগায় নাচাতে ভালবাসতেন। কিন্তু তা পর্দার আড়ালে বসে। ক্ষমতাকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখতে চাইতেন কিন্তু মন্ত্রিত্ব ছিল ভীষণ অপছন্দের। দায়ে পড়ে একবার কেন্দ্রে জাহাজ দফতরের প্রতিমন্ত্রী, আরেকবার রেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের পূর্ণমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু এনজয় করেন নি। মুকুল রায় ভালবাসতেন দল ও সংগঠন করতে। ২০১১-তে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর দলীয় সংগঠনের শেষ কথা হয়ে উঠেছিলেন মুকুল। সরকার সামলাতেন মমতা, দল সামলাতেন মুকুল। মুকুল রায় যথার্থ‌ই হয়ে উঠেছিলেন তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড।

এই পর্বে ছলে-বলে-কৌশলে দলকে ভারী করেছেন চাণক্য। পদ-ক্ষমতা-অর্থের লোভ দেখিয়ে বিরোধী দল থেকে লোক ভাঙিয়েছেন। সাম-দামে কাজ না হলে দন্ড অর্থাৎ মামলার ভয় দেখিয়ে অন্য দল থেকে নেতাদের টেনেছেন নিজের দলে। ২০১২-১৩ সালেও কেউ ভাবে নি, মমতা-মুকুলে দূরত্ব তৈরি হবে এবং তৃণমূল থেকে মুকুলকে কার্যত ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবেন মমতা। কিন্তু নিয়তি বড় নির্মম। উত্থানের পরের পিঠেই লেখা থাকে পতন। সারদা কেলেঙ্কারি থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছেন। কীভাবে বাঁচিয়েছেন, তা অনুমান করতে মানুষের কষ্ট হয় না। দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দের অলিগলি খুব ভালোই চেনা ছিল কাঁচরাপাড়ার মুকুলের। অভিষেকের উত্থানে দলে যত গুরুত্ব কমেছে, তত‌ই দিল্লিতে বসে বিজেপির ঘনিষ্ঠ হয়েছেন মুকুল।

২০১৭ সালের নভেম্বরে বিজেপিতে যোগ দেন মুকুল রায়। ততদিনে মুকুলকে ছেঁটে ফেলেছে তৃণমূল। ফাইল ফটো

২০১৭ সালের শেষের দিকে মুকুল রায় বিজেপিতে আসেন। তার অনেক দিন আগে থেকেই তৃণমূলের অন্দরে মুকুল বাতিলের খাতায়। মুকুল রায়কে পেয়ে বাংলায় বিজেপির লাভ ছাড়া ক্ষতি হয় নি। মুকুল যখন বিজেপিতে, তখন‌ও তৃণমূল ও রাজ্য প্রশাসনের ভেতরে মুকুলের প্রভাব নষ্ট হয়ে যায় নি। সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন তৃণমূল ভাঙিয়ে লোক এনে বিজেপির জনবল বাড়াতে। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য ও ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ১৮ আসন জেতার পেছনে মুকুলের মেকানিজমের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বিজেপির মতো সংগঠিত ও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত জাতীয় দলে এসে মুকুল রায় স্বস্তিতে ছিলেন না।

পদ্ম শিবিরে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পান নি। তারপরেও বিজেপিতে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শিক্ষা দিতে। তিনিই যে আসলে বাংলার ‘কিং মেকার’, এই চাপা দম্ভ মুকুলের ছিল। একুশে বিজেপির মাধ্যমে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দিতে চেয়েছিলেন মুকুল। কিন্তু বঙ্গ বিজেপিতে যে জায়গাটা প্রত্যাশা করেছিলেন, অমিত শাহ তা পূরণ করেন নি। বিজেপির মতো অনুশাসিত দলে মুকুলের সেই সাধ পূরণ হ‌ওয়া সম্ভব‌ও ছিল না। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিজের মতো করে মুকুলকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির ভেতরে মুকুল অনেকটাই সাইডলাইন হয়ে পড়েন। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই দলের নির্দেশে কৃষ্ণনগর উত্তর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তিরিশ হাজার ভোটে বিজয়ী হন।

একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিপুল বিজয়ের মাত্র ৩৯ দিনের মাথায় পুত্র শুভ্রাংশুকে বগলদাবা করে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে গমন এবং সপুত্র তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন। ততদিনে মুকুল রায়ের পরিবার ও শরীরে বিপর্যয় নেমে এসেছে। করোনায় স্ত্রীকে হারিয়েছেন। আত্মসম্মান হারিয়ে পুত্রের চাপে পুরোনো দলে মাথা নিচু করে ফেরা! মন সায় দেয় নি। ডায়াবেটিসে জর্জরিত শরীর ক্রমেই ভেঙে পড়তে শুরু করে। স্নায়বিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে চাণক্য অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন। আর সেরে ওঠেন নি। দীর্ঘদিন ছিলেন বাড়িতে ও হাসপাতালে শয্যাশায়ী ও চৈতন্যরহিত হয়ে। অন্যদিকে রাজনীতিতে অপাঙ্ক্তেয়। তৃণমূল বলত, মুকুল রায় আমাদের কেউ নন। বিজেপি চাইত, দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁর বিধায়ক পদের খারিজ।

শুভেন্দু অধিকারীর করা মামলায় শেষ পর্যন্ত মুকুলের বিধায়ক পদ খারিজ করে দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেওয়ায় নামের আগে অন্তত বিধায়ক লাগিয়েই দুনিয়া থেকে শেষ বিদায় নিতে পারলেন বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য। মুকুল রায়ের মতো চৌকস রাজনীতিকের জীবনের এমন মলিন অবসান বোধহয় মুকুলের চরম শত্রুর‌ও কাম্য ছিল না।

Feature graphic designed by UKD.

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *