বিশেষ প্রতিবেদন: দেশের মাটি থেকে সশস্ত্র মাওবাদীদের নির্মূল করতে ২০২৬-এর ৩১ মার্চ সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এখন দেখা যাচ্ছে, ২৬-এর ৩১ মার্চের আগেই সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে সম্পূর্ণ চুরমার হয়ে যাওয়ার পথে। দলটির সাধারণ সম্পাদক তিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে দেবুজি তেলেঙ্গানা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। ২০২৫-এর মে মাসে ছত্তীশগঢ়ের নারায়ণপুরের জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজ নিহত হওয়ার পর মাওবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক তথা সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পেয়েছিলেন ৬২ বছরের দেবুজি।
মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে যা আগে ঘটে নি!
রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) তেলেঙ্গানা পুলিশের এক শীর্ষ পদাধিকারিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে তিপ্পিরি তিরুপতি তথা দেবুজির আত্মসমর্পণের খবরটি জানিয়েছেন। দেবুজির সঙ্গেই আত্মসমর্পণ করেছেন মাল্লা রাজি রেড্ডি ওরফে সংগ্রাম নামে আরও এক মোস্ট ওয়ান্টেড মাওবাদী, যাঁকে এই মুহূর্তে মাওবাদী সংগঠনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা বলে মনে করা হচ্ছে। মাওবাদী ও নকশালপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাসে অনেক বড় মাপের নেতা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও সর্বোচ্চ নেতার আত্মসমর্পণের ঘটনা এই প্রথম! সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর সর্বোচ্চ নেতা দেবুজির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে কয়েক দশক ধরে চলা নকশালপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনে যবনিকা পড়ল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
মাওবাদী জঙ্গিদের নির্মূল করতে ছত্তীশগঢ়, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা ও ঝাড়খণ্ড সহ দেশের মাওবাদী অধ্যুষিত রাজ্যগুলিতে অল-আউট অপারেশনে নেমেছে যৌথবাহিনী। এই অভিযানের পোশাকি নাম ‘অপারেশন কাগার’। রাজ্যে রাজ্যে ‘অপারেশন কাগার’-এ সরাসরি নজরদারি চালাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযানে নামার আগে তাদের অস্ত্র ত্যাগ করে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসার আবেদন জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। মাওবাদীরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছে কেন্দ্র। কিন্তু হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে গেলে মাওবাদীদের নির্মূল করতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নীতি নিয়েছে মোদী সরকার।
মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটি এক সদস্যে এসে দাঁড়িয়েছে!
রাজ্যে রাজ্যে যৌথবাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের মুখে মাওবাদীরা হয় দলে দলে আত্মসমর্পণ করছে নয় সংঘর্ষে নিহত হচ্ছে। তিপ্পিরি তিরুপতি (দেবুজি) ও মাল্লা রাজি রেড্ডি ( সংগ্রাম)-র আত্মসমর্পণের পর সিপিআই (মাওয়িস্ট) প্রায় নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়েছে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়খাড়। ২০২৫-এর জানুয়ারি মাসেও সশস্ত্র মাওবাদী সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ১৭ জন সদস্য ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক দেবুজি ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা সংগ্রামের আত্মসমর্পণের পর মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অবশিষ্ট সদস্যের সংখ্যা মাত্র ১-এ এসে ঠেকেছে।
মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটির একমাত্র সক্রিয় সদস্যটির নাম মিসির বেসরা। নিরাপত্তা বাহিনীর নজর থেকে বাঁচতে মিসির ঝাড়খণ্ড-ওড়িশার সীমান্তবর্তী সারণ্ডার জঙ্গলে গাঢাকা দিয়ে আছেন বলে মনে করছেন পুলিশের গোয়েন্দারা। কেন্দ্রীয় কমিটির আরেক সদস্য মুপ্পালা লক্ষ্মণ রাও ওরফে ‘গণপতি’ বার্ধক্য জনিত কারণে ২০১৮- নভেম্বরে সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি নেন। গণপতি জীবিত না মৃত, সে ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত নয়। বেঁচে থাকলেও বর্তমানে তিনি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দলের ভেতরে তিপ্পিরি তিরুপতি ছিলেন আত্মসমর্পণ বিরোধী
মাওবাদী সংগঠনে গণপতির স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজ বা গগন্না। ২০২৫-এর ২১ মে ছত্তীসগঢ়ের নারায়ণপুরে যৌথবাহিনীর অভিযানে বাসবরাজ সহ ২৯ মাওবাদীর মৃত্যু হয়। কেশব রাও ওরফে বাসবরাজের মাথার দাম ছিল ১ কোটি টাকা। দলের সাধারণ সম্পাদক নিহত হতেই মাওবাদীদের সাংগঠনিক বুনিয়াদ টালমাটাল হয়ে পড়ে। সংগঠনের শীর্ষ স্তরে নেতৃত্বের শূন্যতার পাশাপাশি নেতাদের মধ্যে মতভেদ প্রকট হয়ে ওঠে। নেতৃত্বের একাংশ সশস্ত্র প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে থাকলেও অপরাংশ অস্ত্রত্যাগ ও আত্মসমর্পণের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। বাসবরাজের মৃত্যুর পর সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে দেবুজিই সাধারণ সম্পাদকের পদে আসীন হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। মাওবাদীদের নেতৃত্বের ভেতরে দেবুজি অস্ত্রত্যাগ বা আত্মসমর্পণের তীব্র বিরোধী ছিলেন।
২০২৫-এর মে মাসে দলের দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে আত্মসমর্পণ- দেবুজির ঘটনা প্রমাণ করে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের সামনে মাওবাদীদের সংগঠন কীভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই মাওবাদীদের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের প্রধানের পদে দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা দেবুজি। তাঁর মাথার দামও সরকার ধার্য করেছিল ১ কোটি টাকা। দলের মধ্যে সশস্ত্র বিপ্লবের কট্টর সমর্থক দেবুজি স্বয়ং আড়াইশোরও বেশি নিরাপত্তাকর্মীর হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত বলে তেলেঙ্গানা পুলিশের দাবি। তাঁর নেতৃত্বে এক হাজারেরও বেশি অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে তিনশোরও বেশি মাওবাদীকে জেলখানা ও পুলিশ থানা থেকে পালানোর অভিযানে মূল পরিকল্পনাকারীর ভূমিকায় ছিলেন ৬২ বছরের তিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে দেবুজি।
পিএলজিএ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পথে
তেলেঙ্গানার জাগতিয়ালের ভূমিপুত্র দেবুজি কোরুতলার সরকারি জুনিয়র কলেজে ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে পড়তে পড়তেই নকশালপন্থী রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। র্যাডিক্যাল স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সদস্যতা লাভের পর জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর সশস্ত্র লড়াইয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন তিনি। যৌবন শুরু হওয়ার আগেই জঙ্গলের গেরিলা জীবনের সঙ্গে পরিচয়। তাই তিপ্পিরি তিরুপতি হয়ে উঠেছিলেন এক দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা। সিপিআই (মাওবাদী)-র মিলিটারি উইংস পিপল’স লিবারেশন গেরিলা আর্মি (PLGA) গঠনের নেপথ্যে যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তাঁদের মধ্যে দেবুজি অন্যতম বলে মনে করা হয়।
রবিবার দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাল্লা রাজি রেড্ডি ওরফে সংগ্রাম সহ বেশ কয়েকজন সশস্ত্র ক্যাডারকে সঙ্গে নিয়ে তেলেঙ্গানা পুলিশের সামনে আত্মসমর্পণ করেন এই মুহূর্তে মাওবাদীদের শীর্ষতম নেতা দেবুজি। শনিবার দেবা নামে মাওবাদীদের আরও একজন শীর্ষনেতা ১৮ জন সদস্য সহ তেলেঙ্গানা পুলিশের ডিজি বি. শিবাধর রেড্ডির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দেবা সংঘর্ষে নিহত শীর্ষ মাওবাদী কমান্ডার মাদভি হিদমার অন্যতম সহযোগী ছিলেন বলে জানা গেছে। দেবুজি, সংগ্রাম ও দেবার আত্মসমর্পণের পর পিপল’স গেরিলা আর্মির বিলুপ্তি নিশ্চিত বলে মনে করছে তেলেঙ্গানা পুলিশ।
Feature image: collected.