ঢাকা থেকে ওয়াশিকুর রহমান শুভ্র: বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট নিয়ে নানা মহলে অনেক আশঙ্কা ও সংশয় ছিল। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, এ কথা মানতেই হবে। সব আশঙ্কা ও সংশয় উড়িয়ে দিয়ে বিক্ষিপ্ত কিছু গোলমাল ছাড়া ২৯৯ আসনে (প্রার্থীর মৃত্যুতে একটি আসনে ভোট স্থগিত) ভোটদান নির্বিঘ্নেই শেষ হয়েছে। ভোট ঘিরে নিরাপত্তায় কোনও ঘাটতি রাখে নি ইউনূস প্রশাসন। দিনভর কঠোর অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং দুষ্কৃতীদের দমনে কোনও পক্ষপাতিত্ব দেখান নি সেনাসদস্যরা।
এই নির্বাচনে আওয়ামি লিগকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় নি। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম আওয়ামি লিগকে বাইরে রেখে কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। বর্তমানে আওয়ামি লিগের সমস্ত ধরণের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ নির্বাচন বয়কটের ডাক দিলেও গোপালগঞ্জ উপজেলা ছাড়া কোথাও বয়কটের প্রভাব পড়ে নি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে কত শতাংশ ভোট পড়েছে, তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট করে জানাতে পারে নি নির্বাচন কমিশন। এদিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটগ্রহণ চলে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। দুপুর দুটো নাগাদ নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়, ৩৬ হাজার ৩১টি কেন্দ্রে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়েছে। ভোটের হার ৬১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন কমিশনের অনুমান। যদি ৬০ শতাংশের উপরে ভোট পড়ে থাকে, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে তা নতুন নজির তৈরি করবে। ভোটের হার যাই হোক, মানুষ যে উৎসবের মেজাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন, সারাদিনের ছবিতেই তা পরিষ্কার।
ভোটগ্রহণ পর্ব মিটতেই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ভোটগণনার পালা শুরু হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামি লিগ ভোটের ময়দানে নেই। সরাসরি লড়াই হচ্ছে বিএনপি বনাম জামায়াতে ইসলামির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। এবং লড়াইটা হচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি। ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রেই ভোটগণনা চলছে। বাংলাদেশের জনগণ কার হাতে শাসনভার তুলে দিচ্ছে, তা স্পষ্ট হতে শুক্রবার ভোর হয়ে যাবে। তবে এখনও পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ফলের যা গতিবিধি, তাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনায়াসেই পেয়ে যেতে পারে বিএনপি। ১২৯টি আসনের বেসরকারি ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে, বিএনপি ৯৬টি, জামাত জোট ৩১টি, স্বতন্ত্র ১টি আসনে বিজয়ী।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাত্র ৫-৬ শতাংশ ভোট নিয়ে যে জামাত ছিল প্রান্তিক শক্তি, সেই জামাত এই নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ইসলামিক মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশে ক্ষমতায় না আসলে তা হবে দেশটির নারী সমাজ, উদার, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল শক্তি এবং সংখ্যালঘুদের জন্য স্বস্তির। জামাত ক্ষমতা থেকে দূরে থাকলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে ভারতও। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামাতের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। কিন্তু শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনে জামাতের শক্তিক্ষয় তো দূরের কথা, তলে তলে জামাত যে বিপুল শক্তি অর্জন করেছে, শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে জামাতের বিস্ময়কর উত্থান তার প্রমাণ।
জামাতের অভূতপূর্ব এই উত্থানের জন্য শেখ হাসিনার ভ্রান্ত নীতিকেই দায়ী করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল। বিএনপিকে ধ্বংস করতে গিয়ে ইসলামপন্থী জামাতকে জায়গা করে দিয়েছেন হাসিনা। আজকে আওয়ামি লিগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি জামাতকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে মধ্যপন্থী বিএনপিকেই
Feature image is representational.