সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনিকে হাতের কাছে পেলে তাঁর পাছার হাড্ডি ভেঙে চৌচির করে দেবে ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতা। পারস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এখন এতটাই বীতশ্রদ্ধ শিয়া ধর্মগুরুদের চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসনের উপর। লিখলেন উত্তম দেব–
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনির ৮৬ বছর বয়স। বয়সের ভারে কাহিল খামেইনির শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক দিন ধরেই তেহরানের বাতাসে গুঞ্জন। খামেইনির মৃত্যুর পর ইরানের বিদ্যমান ‘থিয়োক্রেসি’ বা মোল্লাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে পড়বে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। কিন্তু গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে যে গণবিক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তাতে খামেইনি জিন্দা থাকতেই সেই দেশে ৪৭ বছরের ইসলামিক শাসনব্যবস্থার পতনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। খামেইনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে সেই আগুনে সিগারেট ধরিয়ে টানছেন এক ইরানি তরুণী, এমন ছবি দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশের ১০০-টির বেশি শহরে সংক্রমিত। ইরানের ৩১-টি প্রদেশের একটিও জনরোষের আঁচ থেকে বাঁচতে পারে নি।
বিক্ষোভ দমাতে ও বিক্ষোভের সংবাদ বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ইরানের কর্তৃত্ববাদী সরকার ইতিমধ্যেই ইন্টারনেট, টেলিযোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। জনগণের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন এই মুহূর্তে ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, বাইরে থেকে তা জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরান জুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকার বিরোধী আন্দোলনে কম করে ৬৫ জন নিহত বলে জানা গেছে। নিহতের মধ্যে শিশু ও নারীরা রয়েছে। বিক্ষোভের অগ্রভাগেই রয়েছেন ইরানের নারীরা। কাজেই তাদের কী পরিমাণ মূল্য দিতে হচ্ছে, তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।
বিক্ষোভের সূত্রপাত যদিও বাজারে জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে কিন্তু ইরানের জনগণ এখন চাইছেন মোল্লাতন্ত্রের অবসান। তেলসমৃদ্ধ ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা দীর্ঘকাল ধরেই টালমাটাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করার সক্ষমতা বহুলাংশে হারিয়েছে তেহরান। আঞ্চলিক প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে বছরের পর বছর ধরে সিরিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত বাশার আল আসাদের সরকার, লেবাননের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও গাজায় হামাসের পেছনে অকাতরে অর্থ ঢেলেছে ইরান। ইজরায়েলকে টক্কর দিতে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বিপুল বাড়াতে গিয়ে জনকল্যাণে ব্যয় সংকোচনে বাধ্য হয়েছে আর্থিক টানাটানিতে থাকা ইরান সরকার। শাসকগোষ্ঠীর লাগামছাড়া দুর্নীতিও ইরানের অর্থনীতিকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।
সাত মাস আগে ইজরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিণতি ইরানের শিয়াপন্থী শাসকগোষ্ঠীর জন্য ভাল হয় নি। ইজরায়েলের আক্রমণে ইরানের অনেক সামরিক-বেসামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। আমেরিকার বিমান হামলায় ইরানের উচ্চাভিলাসী পারমাণবিক প্রকল্পও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সাম্প্রতিকতম সময়ে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন দেশটির অর্থনীতির মাজা ভেঙে দিয়েছে বলা যায়। এক মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ইরানি রিয়ালের দাম দাঁড়িয়েছে ১৪ লক্ষ ৭০ হাজার! এক ইউরোর বিনিময়ে ১৭ লক্ষ ২০ হাজার রিয়াল গুণতে হচ্ছে। এক ব্রিটিশ পাউন্ড দাঁড়িয়েছে ১৯ লক্ষ ৯৪ হাজার রিয়ালে।
ইরানের বাজারে পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার মুখে। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বেলাগাম মুদ্রাস্ফীতি ইরানি কারেন্সিকে কাগজে পরিণত করেছে। কর্মসংস্থান নেই। বেকারত্ব ভয়াবহ। এই পরিস্থিতিতে ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের দোকানদারেরা প্রথম রাস্তায় নামেন। এখান থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। রাজধানীর ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ দেশ জুড়ে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় নি। মানুষ এখন সরকারের কাছে দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে বলছে না, বলছে সরকারটাই দূর হয়ে যাক।
হাজার হাজার ইরানি ভয় উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে এসেছেন। সরকারি টিভি চ্যানেল জ্বালিয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনির প্রতিকৃতিতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে মেয়েরা। এই মেয়েরা মোল্লা ও রাষ্ট্রের অনুশাসনের পরোয়া না করে মাথা থেকে হিজাব খুলে ফেলেছে। অনেক সরকারি ভবনের মাথা থেকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের জাতীয় পতাকা নামিয়ে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি জামানায় দেশটির যে জাতীয় পতাকা ছিল, তা উত্তোলন করেছে আন্দোলনকারীরা। রাজপথে হাজার হাজার ইরানি স্লোগান তুলছে, শাহ শাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। শিয়া মোল্লাদের শাসনে ইরানের জনগণ এতটাই তিতিবিরক্ত যে বিক্ষোভের আগুনে মসজিদ পর্যন্ত পুড়তে দেখা যাচ্ছে!
ফার্স প্রদেশে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের এলিট উইংস কুদস ফোর্সের প্রাক্তন প্রধান কাসেম সোলাইমানির স্ট্যাচু উপড়ে ফেলে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি বাগদাদে আমেরিকার করা ড্রোন হামলায় জেনারেল সোলাইমানি নিহত হয়েছিলেন। জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে বীর সেনানায়কের মর্যাদা দেয় ইসলামিক প্রজাতান্ত্রিক ইরান। কিন্তু ইরানের জনগণের চোখে ইজরায়েল ও আমেরিকার হাতে নিহত এই বীর জেনারেলরাও ভিলেন ছাড়া আর কিছু নয়।
তিন বছর আগে ২২ বছরের কুর্দ তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ইরান। মাশা ঠিকমতো হিজাব পরেন নি, এই অভিযোগে তাঁকে তেহরানের রাস্তা থেকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়েছিল ইরানের কুখ্যাত নীতি পুলিশ। ২০২২-এর ১৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে মাশার মৃত্যু হয়। মাশার মৃত্যুর জেরে ইরান তোলপাড় হয়ে যায়। হিজাব বিরোধী আন্দোলন সরকার হটানোর গণ অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ১৯৭৯-র ইসলামিক বিপ্লবের পর এত বড় গণ অসন্তোষের সামনে আর কখনও পড়তে হয় নি ধর্মতান্ত্রিক ইরানের শিয়া শাসকগোষ্ঠীকে। ঠিক কত নারী-পুরুষ এমনকি শিশুকে হত্যা করে তেহরানের ‘থিয়োক্রেটিক রেজিম’ ২২-এর গণবিদ্রোহকে দমন করেছিল তার সঠিক সংখ্যা বলা মুশকিল। তবে রেজিমের দমননীতি চরমে পৌঁছেছিল এবং ৫০০-র বেশি আন্দোলনকারীকে ইরানের পুলিশ-মিলিটারি ও মিলিশিয়া বাহিনী গুলি করে খুন করেছিল বলে আন্দোলনের উপর নজর রাখা একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে।
এবারের আন্দোলন ব্যাপকতায় বাইশের আন্দোলনকে ছাপিয়ে গিয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। জানুয়ারির তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়। জনগণ আগেরবারের থেকে অনেক বেশি বেপরোয়া। শাসনব্যবস্থা না পাল্টে তারা ঘরে ফিরতে চায় না। তুলনায় ছাব্বিশের জানুয়ারিতে ইরানের শাসকগোষ্ঠী ঘরে-বাইরে অনেক বেশি কোনঠাসা। তাদের মনোবল আর আগের মতো নেই। পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনবেন প্রশাসনের মাথারা তা বুঝে উঠতে পারছেন না। ইরান সরকার আন্দোলনের পেছনে ইজরায়েল ও আমেরিকার হাত দেখছে। আন্দোলন দমনে বাড়াবাড়ি করলে তিনি ইরানের ক্ষমতাসীনদের ছেড়ে কথা বলবেন না বলে ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সরকার বিরোধী আন্দোলন আরও তীব্রতর হলে তা ইরানে আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।
এ যাত্রায় যদি ইরানে মোল্লাতন্ত্রের পতন নাও ঘটে শিয়া মৌলবাদী শাসন ব্যবস্থা যে লাইফ সাপোর্টে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইরানের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বয়স ৩৯ বছরের নিচে। দেশটির চালিকাশক্তি ৩০-৩৫ বছরের ছেলেমেয়েরা। ধর্মান্ধ মোল্লাদের অত্যাচারে এরা অতিষ্ঠ। ধর্মের নামে উগ্রতা, বাড়াবাড়ি, ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ইরানের তরুণ প্রজন্ম আর বরদাস্ত করতে রাজি নয়। প্রয়োজনে ইসলাম ত্যাগেও প্রস্তুত ইরানি তরুণদের একটা বড় অংশ। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনিকে হাতের কাছে পেলে তাঁর পাছার হাড্ডি ভেঙে চৌচির করে দেবে ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতা।
Feature image: collected.