চাকরিহারাদের জন্য বন্ধ হল আইনের দরজা! কীভাবে দায় এড়াবে রাজ্য?

চাকরিহারাদের জন্য বন্ধ হল আইনের দরজা! কীভাবে দায় এড়াবে রাজ্য?


এস‌এসসি-র নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ২৫ হাজার ৭৩৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের যে রায় গত ৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ দিয়েছিল, মঙ্গলবার তা পুনর্বিবেচনার আর্জি খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। ৩ এপ্রিলের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দায়ের করেছিল রাজ্য সরকার, স্কুল সার্ভিস কমিশন, মধ্য শিক্ষা পর্ষদ ও চাকরিহারাদের একাংশ সহ একাধিক পক্ষ। এদিন সবপক্ষের রিভিউ পিটিশন‌ই খারিজ করে দিয়েছে বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা ও বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ।
দেশের শীর্ষ আদালত কোনও মামলার রায় একবার দিয়ে দিলে তা পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা যায় বটে কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে রায় পুনর্বিবেচনার নজির অতি বিরল। এস‌এসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় চাকরি বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি খারিজ করে দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে দুর্নীতি হয়েছে তা সিবিআই ও বাগ কমিটির তদন্তে প্রমাণিত। ৩ এপ্রিলের রায় বাতিল বা সংশোধন তো দূরের কথা, রিভিউ পিটিশনের উপর শুনানিতে পর্যন্ত রাজি নয় বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা ও বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে সবগুলো রিভিউ পিটিশন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর চাকরিহারা ও রাজ্য সরকারের জন্য আইনের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। আইনজীবী মহল ও আইন বিশেষজ্ঞরা আগেই বলেছিলেন, রিভিউ পিটিশনে রায় উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, সরকার ও চাকরিহারাদের খালি হাতে ফিরতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হল। আসলে গত ৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেই ২৫ হাজার ৭৩৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর ভাগ্য স্থির হয়ে গিয়েছিল। স্রেফ মুখ বাঁচাতে ও কালক্ষেপ করতে রিভিউ পিটিশন করেছিল রাজ্য সরকার।
এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে নতুন করে পরীক্ষাগ্রহণ সহ নিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় প্রক্রিয়া আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে এস‌এসসি-কে। চাকরিহারাদের মধ্যে যারা দাগি, বেতনের টাকা ফেরত দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। শীর্ষ আদালত তাদের নতুন পরীক্ষায় বসতেও নিষেধ করে দিয়েছে। ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার পরিণতি কী ভয়ঙ্কর, এরা এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাবে। যোগ্যতা থাকার পরেও যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের জন্য সত্যিই খারাপ লাগছে। রিভিউ পিটিশন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে পরীক্ষায় বসা ছাড়া তাঁদের সামনে দ্বিতীয় কোনও পথ খোলা র‌ইল না।
মধ্য শিক্ষা পর্ষদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ এপ্রিল আগের দেওয়া রায়ে খানিকটা সংশোধনী আনে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০১৬-র প্যানেলের যোগ্যরা চাকরি করতে পারবেন। ওই সময়ের মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। চাকরিহারাদের মধ্যে যাঁরা যোগ্য, তাঁরা সঙ্গত কারণেই নতুন করে পরীক্ষায় বসে চাকরি পাওয়া ব্যাপারে শঙ্কিত। যোগ্য ও অযোগ্য পৃথকীকরণ করা গেলে পুরো প্যানেল বাতিল হত না, হাজার হাজার যোগ্যদের‌ও চাকরি যেত না। এর দায় রাজ্য সরকারকে নিতে হবে। প্রায় ২৬ হাজার মানুষের চাকরি বাতিল! পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটে নি। এটা একটা সামাজিক বিপর্যয়।
রাজ্যে বছরের পর বছর ধরে সরকারি চাকরিতে নতুন নিয়োগ নেই। ঘরে ঘরে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা বেকার বসে আছে। চাকরি প্রত্যাশী যুবক-যুবতীরা চাকরি পাচ্ছেন না। যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁদের চাকরিও চলে গেল। হাজার হাজার পরিবারে অন্ধকার নেমে এসেছে। ইতিমধ্যেই একজন চাকরিচ্যুত শিক্ষক স্ট্রোক করে মারা গেছেন। যে যোগ্য শিক্ষকেরা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের মনের অবস্থা সংবেদনশীল মানুষ মাত্রেই উপলব্ধি করতে পারবেন। ভয় হয়, অনেকেই না হতাশায় চরম কোনও সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, কোন মুখে দায় এড়াবেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *