ক্রাইম রিপোর্ট: ছেলেমেয়েরা কর্মসূত্রে বাইরে। বৃদ্ধ বাবা-মা বাড়িতে একা। দু’জনের একজন গত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। একাই কাটাতে হয় বাবা কিম্বা মাকে। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের ঘরে ঘরে এখন এই ছবি। ভরসা কাজের মাসি-আয়ারা। তারা বেঈমানি করলে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের কী পরিণতি হয়, কলকাতার নিউ গড়িয়ার ঘটনা তার প্রমাণ। নিউ গড়িয়ার পঞ্চসায়রের এস-৩২ ভিলার বাসিন্দা ৭৯ বছরের বিজয়া দাসকে খুন করার অভিযোগে বাড়ির আয়া আশালতা সর্দারকে (৩৬) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দুষ্কর্মে আশালতার সঙ্গী ছিল ৪১ বছরের মহম্মদ জালাল মীর। তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
নিহত বিজয়া দাসের স্বামী ৮২ বছরের প্রশান্ত দাস ব্রেন স্ট্রোকে শয্যাশায়ী। অসুস্থ স্বামীর দেখাশোনা, পরিচর্যা ৭৯ বছরের স্ত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। শয্যাশায়ী প্রশান্তবাবুর দেখাশোনার জন্যই আশালতাকে আয়া হিসেবে রাখা হয়েছিল। মাত্র ছয়দিন আগে প্রশান্তবাবুর বাড়িতে কাজে যোগ দেয় আশালতা। দাস দম্পতির ছেলে মুম্বাইয়ে থাকেন, মেয়ে জার্মানিতে। ধৃত আশালতা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ঢোলাহাটের বাসিন্দা। যদিও ভাড়া থাকত নরেন্দ্রপুরের একটি বাসায়। মহম্মদ জালাল মীরের বাড়িও ঢোলাহাট গ্রামে।
শুক্রবার সকাল ৭ টার খানিক পরে প্রশান্ত দাসের বাড়িতে ঢোকে আশালতা। বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে মীরকে। অসুস্থ ও প্রায় বাকশক্তিহীন গৃহকর্তাকে বিছানা থেকে টেনে নামিয়ে তাঁর হাত-পা বেঁধে দেয় আয়া। বিজয়া দেবী কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশের ঘরে গিয়ে তাঁর মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলে আশালতা। এরপর তিন হাত লম্বা একটি কাঠের বাটাম দিয়ে বৃদ্ধাকে ক্রমাগত আঘাত করে চলে এই পিশাচিনী। গৃহকর্ত্রীর গলাও সে চেপে ধরেছিল বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে আশালতা। প্রহারে ৭৯ বছরের বৃদ্ধার প্রাণ যেতে সময় লাগে নি। বৃদ্ধার নিথর দেহ থেকে গয়না খুলে নিতে আর অসুবিধা হয় নি আয়ার।

ঘর থেকে দ্রুত আরও জিনিসপত্র লুট করে ঘড়ির কাঁটা আটটা বাজার আগেই এস-৩২ ভিলা থেকে বেরিয়ে আসে আশালতা। সঙ্গী মহম্মদ জালাল মীর বাড়িটি থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ছাড়ে আয়া। পঞ্চসায়রের আবাসন চত্বরে লাগানো সিসি ক্যামেরায় ফুটেজ পুলিশকে তদন্তে সাহায্য করে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেই আশালতা ও মীরের গতিবিধি শনাক্ত করা তদন্তকারীদের পক্ষে সম্ভব হয়। শুক্রবার গভীর রাতে ঢোলাহাটের বাড়ি থেকে মহম্মদ জালাল মীরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিট নাগাদ নরেন্দ্রপুরের ভাড়াবাড়ি থেকে আশালতা সর্দারকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিরা থাকে দূরে। পরিচারিকা বা আয়াদের উপর নির্ভর করেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের চলতে হয়। অসৎ পরিচারিকারা পরিস্থিতির সুযোগ নিলে এই ধরণের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর। কখনও কখনও বাড়িতে কাজ করতে আসা প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, রাজমিস্ত্রিদের হাতেও খুন হতে হয় তাঁদের। মূলত লুটপাটের লোভেই খুন করা হয় একলা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। টাকা-পয়সা, অলঙ্কার হাতানো প্রধান উদ্দেশ্য হলেও প্রমাণ লোপাটের জন্য অসহায় গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীকে খুন করতেও দ্বিধা করে না দুষ্কৃতীরা। কীভাবে বাড়িতে বা ফ্ল্যাটে একলা থাকা বৃদ্ধ দম্পতি কিম্বা প্রবীণ-প্রবীণাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
Feature image is representational and designed by NNDC.