বিশেষ প্রতিবেদন: টাকা সঙ্গে নেওয়া যায় না। যাওয়ার আগে বিলিয়ে গেলে ক্ষতি নেই। বিল গেটস বিলিয়ে যাবেন বলে স্থির করেছেন। মাইক্রোসফটের অন্যতম কর্ণধার বিল গেটস দুনিয়ার ধনকুবেরদের মধ্যে একজন। সেই ১৯৯৫ সালেই বিশ্বের এক নম্বর ধনীর তালিকায় নাম উঠেছিল তাঁর। টানা ১৮ বছর পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তির খেতাব ধরে রাখা বিল গেটসের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার। যার মাত্র ১ শতাংশ তিন সন্তানের জন্য রেখে বাকি ৯৯ শতাংশই মানুষের কল্যাণে দান করে যাবেন বিল।
আমেরিকান ধনকুবেরদের মধ্যে সম্পদ সমাজের হিতে দান করার নজির আছে। ফোর্ড ও রকফেলারের মতো কিংবদন্তি উদ্যোগপতি মার্কিন সমাজে এই দান-ধ্যানের সংস্কৃতি চালু করেছিলেন। আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির তহবিলের একটা বড় উৎস এই ধরণের দান থেকে প্রাপ্ত। তবে পরোপকারে অন্যদের ছাপিয়ে গেছেন গেটস। শুধু আমেরিকার মধ্যে নয় বিশ্বজুড়েই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে মোটা অংকের ডলার ব্যয় করে থাকে ‘গেটস ফাউন্ডেশন’। ২০২৪ সালে আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য-শিক্ষার উন্নতি ও লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার মতো প্রকল্পে মোট ৮.০১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে ‘গেটস ফাউন্ডেশন’।

বিল গেটসের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে। সফটওয়্যারের বিশ্বে বিল গেটস একটা মিথ। বিলের মাথায় ছোট থেকেই কিলবিল করত নতুন কিছু উদ্ভাবনের পোকা। এমআইটি-র মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েও মাঝপথে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে খুলে বসেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘মাইক্রোসফ্ট’। সালটা ১৯৭৫, কম্পিউটার সায়েন্সের অগ্রযাত্রার ইতিহাসে যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সঙ্গী শৈশবের বন্ধু পল অ্যালেন। ভারতীয় মুদ্রায় ধরলে মাত্র দেড় লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে সফ্টওয়্যারের উৎপাদন ও বিপণনে নেমেছিলেন গেটস ও অ্যালেন। ২০২৪ সালে মাইক্রোসফ্টের মোট মুনাফা ৮৮.১৪ বিলিয়ন ডলার।

১৯৯৪ সালে মাইক্রোসফ্টের প্রোডাক্ট ম্যানেজার মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চকে বিয়ে করেন বিল গেটস। ধনকুবের এই দম্পতিকে সুখী দম্পতি বলেই জানত সবাই। ২০২১-এ বিল ও মেলিন্ডার বিচ্ছেদের ঘোষণায় তাই খানিকটা অবাকই হয়েছিল বিশ্ববাসী। বিবাহ বিচ্ছেদের পরপরই ২.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শেয়ার মিলিন্ডার নামে হস্তান্তর করে দেন বিল। পরের কয়েক মাসে আরও ৩.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ প্রাক্তন স্ত্রীর হাতে তুলে দেন এই ধনকুবের।

পরোপকারের লক্ষ্য নিয়ে ২০০০ সালে ‘বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছিলেন গেটস দম্পতি। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরেও গেটস ফাউন্ডেশনের কাজ যৌথভাবে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হন দু’জন। তাঁদের তিন সন্তান- জেনিফার, ররি ও ফোবি। বড়মেয়ে জেনিফার পেশায় চিকিৎসক। মধ্যমপুত্র ররি পিএইচডি করছে। ছোটমেয়ে ফোবি সবে স্নাতক হয়েছে। গেটস ফাউন্ডেশন পঁচিশে পা দিল এ বছর। অক্টোবরে সত্তরের ঘরে পা দেবেন বিল গেটস। এখন বিলের সময়ের একটা বড় অংশ কাটে ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন প্রকল্পের দেখভালের পেছনে।
গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা দিবসে বিল গেটস জানিয়ে দিয়েছেন, পরবর্তী বিশ বছরে তাঁর অর্জিত সম্পদের ৯৯ ভাগ ব্যয় হবে গেটস ফাউন্ডেশনের কাজে। বেশিরভাগটাই আফ্রিকার দরিদ্র মানুষের কল্যাণে খরচ করতে চান এই মার্কিন ধনকুবের। নিজের পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে বিল গেটস বলেছেন, “আশা করি আরও ২০ বছর বাঁচব। কিন্তু হ্যামবার্গার কেনার জন্য যতটুকু নিজের কাছে রাখা দরকার, ততটুকু টাকা রেখে বাকিটা বিলিয়ে দেবো আফ্রিকার মানুষের জন্য।”
চেটে নয় খেটে বড়লোক হয়েছেন বিল গেটস। কিন্তু যক্ষের মতো ধনসম্পদ আগলে রাখতে চান না। বিলের নিজের ভাষায়, “সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার চেয়ে পৃথিবীর জরুরি সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য ব্যয় করে যাওয়াই ভাল।”
Feature image: collected.