উত্তম দেব
উন্নাসিকতা , অবহেলা আর গাজোয়ারির মাশুল দিচ্ছি আমরা । স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিপদঘন্টি বাজিয়েই চলেছিলেন । কিন্তু কারণ এবং অকারণ ব্যস্ততায় তাতে কর্ণপাত করি নি আমরা । সরকারের দিক থেকে দোলাচল এবং সিদ্ধান্তহীনতা তো আছেই কিন্তু সব দোষ সরকারের ঘাড়ে ঠেলে লাভ নেই দাদা । আমরা জাত ব্যাদড়া । এই একবছরে ফেসবুকে কত স্বঘোষিত জৈববিজ্ঞানী , অণুজীববিজ্ঞানী , ভবিষ্যতদ্রষ্টা দেখলাম । কারও মতে করোনা কোনও রোগই না । কারও যত বিদ্রোহ পৃথিবীর ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির বিরুদ্ধে । সবই নাকি বাজারে ভ্যাকসিন বেচার ফন্দি । কেউ বললেন , এ হল শীতের দেশের ব্যাধি , ভারতের চড়া রোদে ভাইরাস মাথাই তুলতে পারবে না । ফেসবুকের এক বোদ্ধাকে তো দেখতাম মানুষকে মাস্ক পরতে দেখলেই ক্ষেপে স্বীয় মস্তকের চুল ছিঁড়ে পুঁজিবাদীদের গাল পারত । তিনি মাস্ক না পরেই ট্রেনেবাসে চড়ে গ্লোবাল ফার্মা লবির করোনা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নিজের মহান বিপ্লবকে জানান দিতেন। মুশকিল হল ফেসবুক পড়ে নষ্ট করার মত সময় করোনা ভাইরাসের নেই । নইলে ফেসবুক বোদ্ধাদের হাতে এইভাবে খোঁটা-হ্যাটা খেয়ে পৃথিবীতে পড়ে থাকার চাইতে প্রাণত্যাগ করে ঝামেলা মিটিয়ে দেওয়াই শ্রেয় মনে করত কোভিড ভাইরাস ।
পরিসংখ্যান বলছে পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক । অবশ্য এখন খালি চোখেই করোনার মারণলীলা নজরে আসছে । শ্মশানের চিতা নিভছে না। গোরস্থানে স্থানাভাব । নাকে অক্সিজেন নল নিয়েই হাসপাতালের এক শয্যায় শুয়ে জীবনের জন্য যমের সঙ্গে যুদ্ধে রত দুই করোনা রোগী । রোগজীর্ণ ফুসফুসে একটু বাতাস ঢোকানোর জন্য হাহাকার । মাথা খুঁড়েও মিলছে না অক্সিজেনের সিলিন্ডার !
জনগণের দিক থেকে একটু সতর্কতা আর সরকারের দিক থেকে খানিকটা কড়া অনুশাসন থাকলে মনে হয় আজ পরিস্থিতি এতটা বিগড়াতো না । জনজীবন সচল রেখেও একটু নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করাই কি মানবজাতির জন্য গৌরব ও কল্যাণের হত না ? অতিমারি মোকাবিলায় লকডাউন কোনও স্থায়ী সমাধান নয় কিন্তু নিয়ম না মেনে গোষ্ঠীস্তরে সংক্রমণকে নিমন্ত্রণ দিয়ে ডেকে আনাটাই কি দায়িত্বশীল নাগরিকের কাজ ? অথচ লকডাউন উঠে যাওয়ার পর থেকে সকলে মিলে এই কাজটাই করলাম যত্ন সহকারে । আজকে পরিণাম কী দাঁড়াল ? আজকের দিনে এই মুহুর্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভারতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১ কোটি ৫৬ লক্ষ ১৬ হাজার ১৩০ জন । এটা দেশে কোভিড সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে হিসেব । আশঙ্কার জায়গাটা এই পরিসংখ্যান থেকেও বোঝা যাবে না । সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হল সংক্রমণের হার । মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ভারতে দৈনিক মোট অ্যাক্টিভ কোভিড কেস ছিল ১ লক্ষ ১৫ হাজার ৭৩৬ টি । আর গত ২৪ ঘন্টায় কোভিড পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ২ লক্ষ ৯৫ হাজার ৪১ জন । সংক্রমণের হারে বৃদ্ধি ১৫৫ শতাংশ ! দুই সপ্তাহ আগে একদিনে দেশে করোনায় মৃত্যু হয়েছিল ৬৩০ জনের । গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় মারা গেছেন ২ হাজার ২৩ জন । পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ আগে একদিনে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৮ জন । সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাজ্যে গত ২৪ ঘন্টায় কোভিড পজিটিভ ৯ হাজার ৮১৯ জন । বাংলায় সংক্রমণ বৃদ্ধির হার ৩৭৭ শতাংশ ! দুই সপ্তাহ আগে রাজ্যে একদিনে করোনায় মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ৭ জন রোগীর । আর গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে ৪৬ টি ।
পরিসংখ্যান নয় এখন খালি চোখেই করোনার মারণলীলা দৃশ্যমান । |
পরিসংখ্যান বলছে পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক । অবশ্য এখন খালি চোখেই করোনার মারণলীলা নজরে আসছে । শ্মশানের চিতা নিভছে না। গোরস্থানে স্থানাভাব । নাকে অক্সিজেন নল নিয়েই হাসপাতালের এক শয্যায় শুয়ে জীবনের জন্য যমের সঙ্গে যুদ্ধে রত দুই করোনা রোগী ! রোগজীর্ণ ফুসফুসে একটু বাতাস ঢোকানোর জন্য হাহাকার । মাথা খুঁড়েও মিলছে না অক্সিজেনের সিলিন্ডার । সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে ব্রাজিলকে ছাপিয়ে করোনায় ভারত এখন দুই নম্বরে । একদিনে সর্বোচ্চ কোভিড পজিটিভ কেস শনাক্তে আমেরিকাকে আজকেই হারিয়ে দিয়েছি আমরা । গত চব্বিশ ঘন্টায় ভারতে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২ লক্ষ ৯৫ হাজার ৪১ জনের । বিশ্বে একদিনে আক্রান্তের নিরিখে যা সর্বোচ্চ । এর আগে গত ৮ জানুয়ারি আমেরিকায় একদিনে কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২ লক্ষ ৮৯ হাজার ১৯৫ জন । পরিস্থিতি দেখে শঙ্কা হচ্ছে এখন থেকে রোজ নিজেদের রেকর্ড নিজেরাই না ভাঙি আমরা ।
করোনার গোষ্ঠী সংক্রমণেে রাশ টানতে ব্যর্থ হলে দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য কাঠামোটি হুড়মুরিয়ে ভেঙে পড়তে পারে । |